প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিদের অবমাননা করা যে কারও রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে পারে তা এরাজ্যের মানুষ প্রথম টের পেয়েছিল বছর পঞ্চাশেক আগে। সাতের দশকের শুরুতে নকশালরা বিদ্যাসাগর, রামমোহন প্রমুখ রেনেসাঁ পুরুষদের মূর্তি ভাঙত। পরবর্তীকালে অবশ্য তাদের অনেকে ভুল স্বীকার করেছে। তাছাড়া সত্তরে মূর্তিভাঙার রোগ কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল।
আট ও ন'য়ের দশকে মাঝে মাঝে দেশের নানা প্রান্ত থেকে মূর্তি ভাঙার কথা শোনা যেত। দুষ্কৃতীদের টার্গেট ছিল মূলত ভীমরাও আম্বেদকর, রামস্বামী পেরিয়ার এবং বাপুজির মূর্তি। তবে এমনটা ঘন ঘন হত না। ফলে দু'-একজায়গায় মূর্তি ভাঙা বা মূর্তিতে কালি লাগানোর কথা শুনলে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে এড়িয়ে যাওয়া যেত।
মূর্তি ভাঙা নিয়ে দেশ জুড়ে হইচই শুরু হল গত বছর থেকে। ২০১৮ সালে ত্রিপুরায় দীর্ঘ ২৫ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসে বিজেপি। তার কিছুদিন বাদে শোনা যায়, সেরাজ্যের বিলোনিয়া ও সাবরুম নামে দুই শহরে কারা যেন লেনিন মূর্তি ভাঙচুর করেছে। তারপর ত্রিপুরা জুড়ে বাম ও বিজেপির মধ্যে একদফা সংঘর্ষ বাধে।
এই ঘটনার রেশ মেলাতে না মেলাতে কলকাতায় কয়েকজন ছাত্রছাত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মূর্তি ভাঙতে চেষ্টা করে। ত্রিপুরায় লেনিন মূর্তি ভাঙার প্রতিশোধ। পুলিশ তাদের গ্রেফতার করে।
তারপর শোনা যায়, উত্তরপ্রদেশের মেরঠ ও আজমগড়ে একদল লোক বাবাসাহেব আম্বেদকরের মূর্তি ভাঙচুর করেছে। প্রতিবাদে দলিতরা বিক্ষোভ দেখান। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ আশ্বাস দেন, এমন যাতে আর কোথাও না ঘটে তিনি দেখবেন।
উত্তরপ্রদেশের পরে দক্ষিণে তামিলনাড়ু। রাজ্যের বিজেপি নেতা এইচ রাজা ত্রিপুরায় লেনিন মূর্তি ভাঙা নিয়ে বিতর্কিত টুইট করেছিলেন। পরে সেখানে দলিত সংস্কারক রামস্বামী পেরিয়ারের মূর্তি ভাঙা হয়। প্রতিবাদে দলিতরা ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখান। পরপর এতগুলো ঘটনার পর বোঝা যায়, মূর্তিভাঙার রোগ দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত জুন মাসে কলকাতায় অমিত শাহের রোড শোয়ের সময় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙচুর হয়। মূর্তিটি ছিল ওই মহাপুরুষের নামাঙ্কিত কলেজের ভিতরে। শাসক দল তৃণমূল অভিযোগ করে, বিজেপির কর্মীরা এই কুকর্মের পিছনে আছে। অন্যদিকে বিজেপির পালটা অভিযোগ, তৃণমূলের কর্মীরা মূর্তি ভেঙে তাদের ওপরে দোষ চাপাচ্ছে।
গত সপ্তাহে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কে বা কারা স্বামী বিবেকানন্দের মূর্তির নীচে আপত্তিকর কিছু কথা লিখে রাখে। কিছুদিন ধরে জেএনইউতে ছাত্রছাত্রীরা ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিল। তার মধ্যেই স্বামীজির মূর্তির অবমাননা ঘটল। সঙ্গে সঙ্গে রে রে করে নেমে পড়ল বিজেপি। তাদের দাবি, এর পিছনে আছে বামপন্থীরা। বিপরীতে বামেদের বক্তব্য, ফি বৃদ্ধির আন্দোলনে কোণঠাসা হয়ে বিজেপিই এই কাণ্ড ঘটিয়েছে। উদ্দেশ্য, আন্দোলনকারীদের বদনাম করা।
একটা কথা পরিষ্কার বুজে নেওয়া দরকার। মূর্তি মানে একটা মতাদর্শ। কোনও ব্যক্তি জীবদ্দশায় যে আদর্শ নিয়ে কাজ করে গিয়েছেন, তাঁর মূর্তি গড়ে সেই আদর্শকেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
গত কয়েক বছরে যাঁদের মূর্তিতে হাত পড়ছে, তাঁরা আমাদের দেশকে মধ্যযুগীয় অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখিয়েছেন। আধুনিক ভারত রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছেন। স্বামীজি, বিদ্যাসাগর, গান্ধীজি, আম্বেদকর এবং পেরিয়ার, সকলের সম্পর্কেই একথা বলা যায়।
আমাদের দেশে যে কেউ তার পছন্দমতো মতাদর্শে বিশ্বাসী হতে পারে। সংবিধান তাকে সেই অধিকার দিয়েছে। কিন্তু অন্য মতাদর্শকে ঘৃণা করার অধিকার দেয়নি। আমাদের রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে বহুত্ববাদী সংস্কৃতির বনিয়াদের ওপরে।
যারা তাঁদের মূর্তি ভাঙে বা মূর্তিতে কালি লাগায় তারা নিঃসন্দেহে দেশদ্রোহী। তাদের রাজনৈতিক কর্মী ভাবার কারণ নেই। দেশদ্রোহীদের জন্য যেসব আইন আছে, সেই অনুযায়ী তাদের বিচার হওয়া উচিত। না হলে যুগপুরুষদের অবমাননা করার প্রবণতা দিন দিন বাড়তেই থাকবে।