
শেষ আপডেট: 17 October 2023 14:42
কলকাতায় দুর্গাপুজোর উৎসব ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গিয়েছে। রাস্তায় নেমে পড়েছে জনতা। তারা আগেভাগে প্রতিমা ও মণ্ডপ সজ্জা দেখা নিতে চায়।
গত কয়েক বছর দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে দু'টি খারাপ প্রবণতা মাথা চাড়া দিচ্ছে যা অবশ্যই উদ্বেগজনক। প্রথমত, উৎসবের দিনগুলিতে উচ্ছৃঙ্খলতা বাড়ছে।
দ্বিতীয়ত এই সময় কিছু স্বার্থান্বেষী মহল সাম্প্রদায়িক প্রচার করছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ উস্কে দিতে সম্প্রীতি বিনষ্টের চেষ্টা করছে। অনেকের মনে থাকবে, গত বছরই একটি পুজোমণ্ডপে গান্ধীজিকে অসুর রূপে দেখানো হয়েছিল।
পুজোয় উচ্ছৃঙ্খলতা যে আগে ছিল না তা নয়। তবে বিগত কয়েক বছর এটি বেড়েছে। এর সঙ্গে রাজনীতির যোগ কতটা তা নিয়ে বিস্তর রাজনীতি করা যায়। তাতে নাগরিক কর্তব্য কিন্তু বিন্দুমাত্র লঘু করা চলে না।
অনেকে মনে করে, উৎসবের সময় যা খুশি তাই করার লাইসেন্স আছে। এই সময় প্রকাশ্যে নেশাভাং করা চলে। অকারণে, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে পাঁচজনের জীবন ওষ্ঠাগত করে তোলা যায়। রাস্তা আটকে প্যান্ডেল অথবা খাবারের স্টল করলেই বা বাধা দিচ্ছে কে?
আসলে প্রত্যেক নাগরিকের কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিক হিসাবে প্রত্যেকে কিছু অধিকার ভোগ করে থাকেন। কিন্তু অধিকারের সঙ্গে আসে কর্তব্য। তা সবসময়ই পালন করতে হয়। উৎসবের সময়ও ব্যতিক্রম নয়।
নাগরিকের অন্যতম কর্তব্য হল সহনাগরিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। তাঁদের যথাসম্ভব সাহায্য করা। পুজোর সময় মূলত এই কর্তব্যটিই অনেকে ভুলে যায়। প্রতিটি পাড়ায়, শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা থাকেন, অসুস্থরা থাকেন। জোরে মাইক বাজালে তাঁদের সমস্যা হতে পারে।
অনেকের পুজোর পরে পরীক্ষা থাকে। জোরে মাইক চালালে তাদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। বেশি শব্দ হলে শিশুদেরও ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। কিন্তু পুজোর সময় অনেকেই এই কথা বিবেচনা করে না। বেশিরভাগ পাড়ায় উৎসবের নাম করে একপ্রকার শব্দসন্ত্রাস চলে। যত দিন যাচ্ছে, এই সন্ত্রাস বাড়ছে।
উৎসবের সঙ্গে প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। দুর্গা পুজোও ব্যতিক্রম নয়। এই সময় শয্যাশায়ী অসুস্থ মানুষটি প্রত্যাশা করে পুজোর দিনগুলি একটু ভাল থাকতে। কারও আনন্দ একান্তে, নিরিবিলিতে সময় কাটাতে। কারও আবার নানা কারণে উৎসব থেকে দূরে থাকাটাই সিদ্ধান্ত। উৎসব সকলের সব প্রত্যাশা পূরণের সময়। দুর্ভাগ্যের হল এই সত্যটি দিন দিন আমরা ভুলে যাচ্ছি।
আগে শুধুমাত্র কালীপুজোয় বাজি ফাটানো হত। এখন দুর্গাপুজোতেও দেদার বাজি ফাটে। বৃদ্ধ ও অসুস্থদের বাড়ির সামনেও রাতে বাজি ফাটে প্রচণ্ড শব্দে।
অনেক ক্লাব আবার পুজোর ভিড়ে নিজেরাই ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট করতে যায়। আনাড়ি হাতে যানশাসন করতে গিয়ে আরও যানজট পাকিয়ে দেয় তারা। পুজোর সময় কারও অ্যাম্বুলেন্স প্রয়োজন হতে পারে। দমকলও প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু প্যান্ডেল বা খাবারের স্টলের জন্য বহু জায়গায় রাস্তা হয়ে পড়ে সংকীর্ণ। সেখানে দমকল বা অ্যাম্বুলেন্স আটকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
পুজোয় সাম্প্রদায়িক প্রচার সবসময় প্রকাশ্যে হয় না। শারদোৎসবে সাধারণত সব ধর্মের মানুষ অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু সেখানে কৌশলে ধর্মীয় সংকীর্ণতাবাদ আমদানির চেষ্টা হচ্ছে। এটা আগে এখনকার মতো বিপজ্জনক ছিল না। তাতে রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীর ভূমিকা গোপন থাকছে না। গত কয়েক বছর যাবত এই প্রবণতা বেড়েছে।
শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষজন নিশ্চয় এই প্রচারে কান দেবেন না। কিন্তু অনেকে অজ্ঞতার বশে এই প্রোপাগান্ডা বিশ্বাস করে বসে।
শারদোৎসবে যাতে কোনও সংকীর্ণতা প্রশ্রয় না পায়, তা দেখাও নাগরিকদের কর্তব্য। কোথাও সেরকম প্রচার হচ্ছে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে আইন হাতে তুলে না নিয়ে নাগরিক কর্তব্য পালন করতে হবে। বিভেদকামীদের কোনওভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। তবেই শারদোৎসব অনন্য সুন্দর হয়ে উঠবে।