ভোটার কার্ড বা আধার কার্ডকে মান্যতা দিচ্ছে না কমিশন, কিন্তু এই দুই কার্ডের মাধ্যমে বানানো নথিকে মান্যতা দিচ্ছে। এর চেয়ে হাস্যকর আর কোনও পদক্ষেপ হতে পারে কি?

নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন।
শেষ আপডেট: 31 July 2025 13:42
নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজের তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে পশ্চিমবাংলায়। তৃণমূল কংগ্রেস সর্বতোভাবে বিরোধিতা করছে এই সংশোধনের। এ প্রসঙ্গে তৃণমূলের সমালোচনা করলেও যেভাবে এই সংশোধন হচ্ছে, সেই প্রক্রিয়া নিয়ে সুর চড়িয়েছে বাম দলগুলিও। প্রশ্ন হল, নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে এতখানি আতঙ্কের সত্যিই কোনো কারণ আছে কি?
বিহারে নির্বাচনের ঠিক আগে এই নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে যা হয়েছে, আতঙ্ক ছড়িয়েছে সেই বাস্তবতা থেকেই। ১ আগস্ট যে-সংশোধিত তালিকা প্রকাশ পেতে চলেছে, সেই তালিকায় ৮% মানে প্রায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও এই তালিকা প্রকাশের পরেও একটি মাস সময় দেওয়া হবে উপযুক্ত নথি দাখিল করে নাম নথিভুক্ত করার।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে যা জানা গেছে, এখনও পর্যন্ত তালিকা থেকে বাদ যাওয়া নামগুলির অধিকাংশই মৃত ভোটারের, একই জায়গায় নাম থাকা একাধিক ভোটারের, বা যাদের খোঁজই পাওয়া যায়নি সেরকম ভোটারের। যে-প্রক্রিয়াতে এই নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে, তা নিয়ে একটি মামলাও চলছে সুপ্রিম কোর্টে।আজ অর্থাৎ ২৯ জুলাই আর একটি হিয়ারিং এর সম্ভাবনা আছে এই মামলার।নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের ওপর স্থগিতাদেশ না দিলেও ইতিমধ্যেই এই মামলা নিয়ে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকে কিছু পরামর্শও দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এই পরামর্শগুলি একেবারে ফেলে দেওয়ার নয়।
কী বলেছে সুপ্রিম কোর্ট? প্রথমে সুপ্রিম কোর্ট পরামর্শ দিয়েছিল যে, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড এবং রেশন কার্ডকে যেন ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্তকরনের প্রামাণ্য নথি হিসেবে স্বীকার করা হয়। এই নথিগুলিকে কেন কমিশন ভোটারের পরিচয়ের প্রামাণ্য নথি হিসেবে গ্রহণ করবে না, তা জানিয়ে সুপ্রিমকোর্টে একটি হলফনামা জমা দেয় নির্বাচন কমিশন। এই হলফনামা জমা পড়ার পরেও কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বলেছে আধার কার্ড এবং ভোটার কার্ডকে কমিশন যেন ভোটারের নাম নথিভুক্ত করার ক্ষেত্রে স্বীকৃতি দেয়। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে যে, রেশন কার্ড নকল করা সহজ হলেও, ভোটার কার্ড এবং আধার কার্ডের আমাদের দেশে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কাজেই কমিশন কেন এই দু’টি পরিচয় পত্রকে স্বীকৃতি দেবে না?
খুব সঙ্গত কারণেই সুপ্রিম কোর্ট এই প্রশ্ন তুলেছে। প্রথম কথা, ভোটার কার্ড যদি নকল হয়ে থাকে তার প্রাথমিক দায় বর্তায় নির্বাচন কমিশনের উপরেই। যে-পরিচয়পত্র নির্বাচন কমিশনই ভোটারের হাতে তুলে দিয়েছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা কমিশন যদি নিজেই প্রশ্ন করে, তাহলে আসলে কমিশনের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। এর মানে কিন্তু এই নয় যে, ভোটার কার্ড নকল করা সম্ভব নয়। কিন্তু একটি ভোটার কার্ড নকল কি না তা বিচার করার দায়িত্ব কমিশনকেই নিতে হবে। কিছু ভোটার কার্ড নকল হয়েছে বলে সমস্ত ভোটার কার্ডকেই বাতিল করে দেওয়া কোনো যুক্তিতেই মেনে নেওয়া যায় না।
সুপ্রিম কোর্ট তার পরামর্শে বলেনি, কিন্তু এই প্রসঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন উঠে যায়। আধার কার্ড, ভোটার কার্ডকে বাতিল করলেও কমিশন ভোটার তালিকায় নাম তোলার প্রামাণ্য নথি হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে ব্যাঙ্কের পাস বই এবং এলআইসির নথিকে।ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট খুলতে গেলে একজন ভারতীয় নাগরিকের কী কী নথি জমা করতে হয়? ভোটার কার্ড, আধার কার্ড এবং প্যান কার্ড। এলআইসির ক্ষেত্রেও নিয়মটা একই। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাঁড়াল এই যে, ভোটার কার্ড বা আধার কার্ডকে মান্যতা দিচ্ছে না কমিশন, কিন্তু এই দুই কার্ডের মাধ্যমে বানানো নথিকে মান্যতা দিচ্ছে। এর চেয়ে হাস্যকর আর কোনো পদক্ষেপ হতে পারে কি?
আপাতদৃষ্টিতে হাস্যকর মনে হলেও এইরকম একটি সিদ্ধান্তের পেছনে একটি গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করে থাকতে পারে।এই আশঙ্কা যদি সত্যি না হয় তাহলেই খুশি হব।কিন্তু, কমিশনের কাজকর্ম দেখে এই আশঙ্কা হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট এই প্রশ্নও তুলেছে কিন্তু যে, কীভাবে কমিশন নিশ্চিত হচ্ছে যে আধার এবং ভোটার কার্ড নকল করা হলে অন্য ১১টি নথিও নকল করা সম্ভব নয়?
যেমন, ইতিমধ্যেই জানা গিয়েছে যে, বিহারে ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়তে চলেছে কিন্তু সে-রাজ্যে ডোমিসাইল সার্টিফিকেট ইস্যু করা হয়ে গিয়েছে একটি কুকুরের নামে! কমিশনের কাজকর্মে নানা অসঙ্গতির কারণেই মনে হচ্ছে যে, নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে আসলে গরিব মানুষ, পরিযায়ী শ্রমিকদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে না তো? এ দেশে এমন গরিব মানুষের সংখ্যা এখনও কয়েক কোটি যাদের আজও একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা এলআইসির পলিসি নেই, কিন্তু একটি ভোটার কার্ড বা আধার কার্ড আছে।এই মানুষগুলির ভোটার কার্ড বা আধার কার্ডকে কমিশন প্রামাণ্য নথি হিসেবে গ্রহণ না-করলে, এই সমস্ত মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া অনিবার্য।
একইভাবে, যে-সমস্ত পরিযায়ী শ্রমিকেরা নিজের রাজ্য ছেড়ে অন্য রাজ্যে কাজ করতে গেছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় তাদের নিজেদের বাড়িতে না পাওয়ার সম্ভাবনাই শতকরা ১০০%। বাড়িতে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের না পাওয়া গেলেই তাদের দাগিয়ে দেওয়া সম্ভব নিখোঁজ ভোটার হিসেবে। বলা হচ্ছে যে, একজন ব্যক্তিকে তার বাড়িতে পাওয়া না গেলে প্রতিবেশীদের জানিয়ে দেওয়া হবে যে, তিনি যেন কমিশনের প্রতিনিধির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের পক্ষে এত সহজে দূর রাজ্য থেকে ছুটি পেয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিজের গ্রাম বা শহরে ফিরে আসা আদৌ সম্ভব কি?
সমস্ত প্রক্রিয়াটি প্রেক্ষিতে আরও একটি প্রশ্নও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ প্রতিবছরই নিয়মমাফিক কমিশন করে থাকে। এত এত ভুয়া ভোটার, মৃত ভোটারের নাম কমিশনের তালিকায় থেকে গেল কী করে, যদি নিয়মিত ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের কাজ সঠিকভাবেই করা হয়ে থাকে? ভোটার তালিকায় এত এত ত্রুটি থাকার দায় কি আদতে নির্বাচন কমিশনেরই নয়? ধারাবাহিকভাবে যে-প্রক্রিয়াটি জারি রেখে তালিকাকে শুদ্ধ করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের, সেই কাজ তড়িঘড়ি করে অতি দ্রুত সম্পন্ন করতে চাইলে এই প্রশ্ন উঠবেই যে, নির্বাচন কমিশন আদৌ একটি স্বায়ত্তশাসিত, নিরপেক্ষ সংস্থা হিসেবে কাজ করছে তো?
এরপরেও বলতেই হয় যে, ভারতবর্ষের একজন নাগরিক হিসেবে অবশ্যই চাইব ভোটার তালিকার সংশোধন হোক। ভোটার তালিকায় থাকা বহু নাম ব্যবহার করে ছাপ্পা ভোট দেওয়া বন্ধ হোক। কিন্তু নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতিটি নির্বাচন কমিশনের পুনর্বিবেচনা করা অবশ্য কর্তব্য। আশা করা যায় যে, সুপ্রিম কোর্ট এই বিষয়ে যথাযথ নির্দেশিকা জারি করবে।