‘জীবন বদলে দিয়েছে মনোজিৎদের অত্যাচার’। বলেছেন এক নির্যাতিতা। পড়াশুনো ছেড়ে তিনি এখন ঘরসংসার করছেন।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 6 July 2025 16:22
‘জীবন বদলে দিয়েছে মনোজিৎদের অত্যাচার’। বলেছেন এক নির্যাতিতা। পড়াশুনো ছেড়ে তিনি এখন ঘরসংসার করছেন। কসবা ল কলেজের অভিজ্ঞতা দুর্বিষহ করে তুলেছিল তাঁর জীবন। পরিস্থিতি এতটাই দমবন্ধকার হয়ে উঠেছিল যে কলকাতা ছেড়ে গুজরাতে আত্মীয়ের বাড়ি চলে যেতে হয়। তিনি অভিযোগ করেছেন, ইউনিয়নের দাদারা তাঁকে তিনদিনের জন্য মনোজিতের সঙ্গে মন্দারমনিতে রাত কাটাতে চাপ দিয়েছিল। রাজি না হওয়াতে এমন পরিণতির মুখোমুখি হতে হয় তাঁকে।
সেই নারী আরও জানিয়েছেন, ঘটনার দিনই থানায় গেলে পুলিশ প্রথমে অভিযোগ কানে তুলতে চায়নি। কলেজের পরিচালন সমিতির পরামর্শ ছিল, ‘মিটমাট করে নাও, মনোজিৎ উপকারী ছেলে।’
ওই কলেজেরই এক প্রাক্তন ছাত্র আইন ছেড়ে এখন ডাক্তারি পড়ছেন। মনোজিতদের অত্যাচারে কলেজ এবং বিষয় বদল করে নিতে বাধ্য হয়েছেন। তার আগের ঘটনাবলী আরও ভয়ঙ্কর। থানায়, কলেজের পরিচালন সমিতির কাছে অভিযোগ করায় ক্যাম্পাসে, রাস্তায় ব্যাপক মারধর করা হয় বাবা-ছেলেকে। মানসিক অবসাদে পড়াশুনোয় ছেদ পড়েছে বহু পড়ুয়ার।
কসবার কলেজটিতে ধর্ষণের ঘটনার সূত্রে জানা যাচ্ছে, মনোজিৎ মিশ্র মানে এমএম ছিলেন শহরের ল কলেজগুলির ক্ষমতার ‘ছোট দাদা’। টিম এমএম-ই ছিল ভর্তি হতে কাকে কত দিতে হবে, কোন শিক্ষক কখন ক্লাস নেবেন, পরিচালন সমিতির বৈঠক কবে কখন হবে, ইত্যাদি সব ব্যাপারে শেষ কথা।
আরজি কর কাণ্ডে সাজাপ্রাপ্ত সঞ্জয় রায়ের মানসিক বিকারের বহু ঘটনা জানা গিয়েছিল তার মোবাইল থেকে। কসবার ঘটনায় অভিযুক্ত মনোজিৎ সম্পর্কে এখনও পর্যন্ত যা জানা গিয়েছে বিকৃত যৌনতা, যৌন হিংস্রতায় সে সঞ্জয়ের চেয়েও ভয়ঙ্কর। ঘনিষ্ঠ বান্ধবীর সঙ্গে সঙ্গমের ভিডিও বাকিদের দেখিয়ে বেড়াত ওই তরুণ।

কসবার ওই কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রয়াত দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় পাঁচ-পাঁচবার সাসপেন্ড করেছিলেন মনোজিৎকে। তাঁর করা অভিযোগে পুলিশ একবার গ্রেফতার করে ওই তরুণকে। জামিনে মুক্ত হয়ে আবার স্বমূর্তি ধারণ করে। সেই তরুণ কীভাবে কলেজে অস্থায়ী কর্মীর চাকরি পেল সেও এক রহস্য।
আসলে ওই তরুণকে সামনে রেখে সংঘঠিত চক্র গড়ে উঠেছিল, সেটা এখন স্পষ্ট। টাকা, আরও টাকা উপার্জনই ছিল সেই চক্রের উদ্দেশ্য। তাই দিনের পর দিন কলেজে ছাত্রীদের উপর যৌন নিপীড়নের ঘটনাগুলি নিয়ে মনোজিতের অপকর্মের মেন্টরেরা মাথা ঘামাননি। আরজি করের ইন্টান ছাত্রীকে ধর্ষণের পর প্রমাণ লোপাটের উদ্দেশে খুন করা হয়েছে। কসবার ছাত্রীটির তেমন মর্মান্তিক পরিণতি হয়নি। কারণ, মনোজিৎ ও তাঁর দলবল নিশ্চিত ছিল আর পাঁচটা অনাচারের মতো এটাই বড় দাদারা সামলে দেবেন। তাছাড়া আইনের ছাত্র হিসাবে সে নিশ্চয় জানে ধর্ষণ-খুনের ন্যূনতম সাজা যাবজ্জীবন, সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড।
আরজি করের ঘটনায় রাত পাহারার আন্দোলনে কসবা কলেজের অংশ নেওয়া ছাত্রছাত্রীদেরও টিম এমএম ছাড়েনি। ফেসবুক এবং অন্যান্য সূত্র থেকে তাদের চিহ্নিত করে মারধর করা হয়।
আরজি করের ঘটনায় প্রতিবাদে শামিল হয়েছিল গোটা দেশ। সেই ঘটনার বর্ষপূর্তির মুখে জানাজানি হয়েছে কসবার ল কলেজের কেলেঙ্কারির নানা দিক। আরজি করের ঘটনায় ধর্ষণ-খুনের শিকার ইন্টার্নের বাবা-মা’কে দীর্ঘ সময় মিডিয়ার মুখোমুখি হতে দেওয়া হয়নি। কসবার ঘটনায় সাহস করে যে তরুণী টিম এমএম-এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল, থানায় ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করল, ঘটনার পর থেকে তিনি মিসিং। মিডিয়াকে তাঁর ত্রিসীমানায় যেতে দেওয়া হচ্ছে না।

আরজি করের সেই মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রে জানা গিয়েছিল তৎকালীন প্রিন্সিপ্যাল এবং শাসক দলের কতিপয় চিকিৎসক নেতার ক্ষমতা ভোগের তীর্থক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল হাসপাতালটি। সামনে আসে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি, অনিয়মের কাহিনি। ধর্ষণ-খুনে অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়ের হাসপাতালে অবাধ যাতায়াত, দাপট ইত্যাদির খুঁটিনাটি জানা গিয়েছিল।
কলকাতার যে সাংবাদিক সহকর্মীরা এই সব ঘটনা খুঁড়ে বের করেছেন, তাঁদের অবশ্যই প্রশংসা প্রাপ্য। যে সিনিয়র সাংবাদিকেরা অনুজ সহকর্মীদের গাইড করছেন, কৃতিত্ব তাঁদেরও। তাঁরাও নিশ্চয়ই মানবেন, কিঞ্চিৎ তদন্তধর্মী আলোচিত, প্রশংসীত খবরগুলি সবই পাস্ট টেন্স।
কসবার ঘটনাটিই ধরা যাক। কসবা ল কলেজ কোনও প্রত্যন্ত দ্বীপ বা ফরেস্ট ভিলেজে অবস্থিত নয়। কসবার মতো দক্ষিণ কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে, গড়িয়াহাট রোডের মতো ব্যস্ততম একটি রাস্তার ধারে অবস্থিত ল কলেজটিকে ছাত্র ইউনিয়নের দাদাগিরি, অস্থায়ী কর্মীর মাফিয়ারাজ, ছাত্রীদের ধরে ধরে যৌন নিপীড়িন এবং আমোদ-প্রমোদের পীঠস্থান হয়ে উঠল কোনও সূত্র থেকে তা মিডিয়ার কাছে পৌঁছাল না কেন? যদি সেটাই কারণ হয়, তাহলে বলতে হয় সংবাদমাধ্যমের এই জনবিচ্ছিন্নতা ভয়ঙ্কর। আরও ভয়ঙ্কর এবং দুর্ভাগ্যের হবে যদি সব জেনে, শুনেও মিডিয়া মুখ ফিরিয়ে থেকে থাকে।
যতদূর জানতে পারছি, কসবার ঘটনায় এখনও অনেক কিছু প্রকাশ্যে আসা বাকি। অপ্রকাশিত অধ্যায়ে আসতে পারে কতিপয় মিডিয়ার ভূমিকাও। নির্যাতিতরা কেউ কেউ প্রকাশ্যে, কেউ পরিচয় গোপন রেখে অতীত নিয়ে মুখ খোলা শুরু করেছেন। সেই সব ঘটনায় সেই সব মিডিয়ার ভূমিকা কী ছিল সমাজ ও সংবাদমাধ্যমের স্বার্থে সেটাও প্রকাশ্যে আসা জরুরি। বিষয়টি নিয়ে আমি গত কয়েকদিন যাবত বহু সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁদের মধ্যে কর্তব্যরত এবং সক্রিয়ভাবে সাংবাদিকতায় নেই, দু ধরনের সাংবাদিক সহকর্মীরাই আছেন। তাঁরা সকলেই মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে বিচলিত।
বছর কয়েক আগেও আরজি কর ছিল রোগী সংখ্যায় ভারত তথা এশিয়ার বৃহত্তম হাসপাতাল। এমন একটি হাসপাতালে পড়ুয়া চিকিৎসককে ধর্ষণ-হত্যা একই অপরাধের আর পাঁচটা ঘটনার সঙ্গে এক করে দেখা চলে না। সেই মর্মান্তিক ঘটনার পর হাসপাতালের যে অন্ধকারময় দিকগুলি মিডিয়া তুলে ধরে, খুন-ধর্ষণের আগে তা কেন সংবাদমাধ্যমের নজর এড়িয়ে গিয়েছিল সে প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান জরুরি। কাজটা সাংবাদিকদেরই সর্বাগ্রে করতে হবে।
সংবাদমাধ্যমের এমন ভূমিকা নতুন, তা কিন্তু বলছি না। অতীতেও একাধিক ঘটনায় দেখা গিয়েছে, সংবাদমাধ্যমে অপরাধীর অভাবনীয়, ঘৃণ্য অপকর্মের লম্বা তালিকা প্রকাশিত হয়েছে। কবে, কোন থানায় কী অপরাধে আইনের কত নম্বর ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে, তার বিশদ বর্ণনা খুঁড়ে বের করেছেন সাংবাদিক বন্ধুরা। অথচ ঘটনার আগে সেই অপরাধীর সাম্রাজ্য বিস্তার, নেতা-পুলিশের সঙ্গে ওঠাবসা, ধরাকে সরা জ্ঞান করার খবর মিডিয়ায় আসেনি।

বছর দুই হল বউবাজার বিস্ফোরণের তিন দশক পেরিয়েছে। সেই ঘটনায় মূল অভিযুক্ত রশিদ খান এখনও জেলে। ঘটনার পর কাগজে খবর হয়, রশিদ ছিল কলকাতার সাট্টা ডন। সিপিএমের সদর দফতর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে ছিল তার নিত্য যাতায়াত। বহু নেতাকে মাসোহারা দিত। পাটি-প্রশাসনের ক্ষমতার দীর্ঘ হাত কাজ লাগিয়ে যে একদিনে রেঁস্তরার ট্রেড লাইসেন্স, একমাসে পিস্তলের লাইসেন্স পেয়েছিল। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে ফরওয়ার্ড ব্লকের রাজ্য দফতরের সাংবাদিক বৈঠকে যে সাংবাদিকরা দিনের পর দিন ভালমন্দ খেয়েছেন, বউবাজার বিস্ফোরণে ৬৯ জনের মৃত্যুর আগে তাঁরা জানতে পারেননি সেগুলি আসত ওই ঘটনার মূল অপরাধী তথা ষড়যন্ত্রী রশিদের রেঁস্তরা থেকে। এভাবেই কিছু প্রভাবশালী সাংবাদিকের সঙ্গেও ওঠাবসা ছিল সাট্টা ডনের। কিন্তু বিস্ফোরণের আগে তাঁর এই অপরাধের কানাকড়ি, এমনকী শহরের সাট্টা ব্যবসার মুকুটহীন সম্রাট হয়ে ওঠার কথা ছাপা হয়নি।
তারপরও বলব তিন দশক পরবর্তী আজকের মিডিয়ার চরিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। রশিদের সঙ্গে শাসক দলের হরিহর-আত্মা সম্পর্ক মিডিয়া যতটা ফাঁস করেছিল তার কানাকড়িও এখন অনুপস্থিত। বিগত জমানায় বহু প্যানেল বাতিল হয়েছে খবরের কাগজের অনিয়ম ফাঁস হওয়ায়। মিডিয়ার সক্রিয়তায় অনিয়ম চাকরি পাওয়া পর্যন্ত গড়ায়নি।
অথচ, রাজ্য-রাজনীতিতে তোলপাড় ফেলে দেওয়া শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারি ফাঁসে মিডিয়ার কোনও ভূমিকা নেই। সারদা-সহ নানা কেলেঙ্কারিতেও সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা শূন্য। আদালতে জনস্বার্থের মামলায় সিবিআই তদন্তের নির্দেশ জারি না হলে হয়তো অজানাই থেকে যেত চাকরি চক্রের অজানা কাহিনি। অথচ, সারদা-সহ চিটফান্ডে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যার কোটির উপরে। আবেদনকারীদের সংখ্যা ধরলে শিক্ষা দুর্নীতিতে ক্ষতিগ্রস্থরাও লাখ পঞ্চাশেক হবেন। বছর পাঁচ-ছয় আগে বিক্ষিপ্তভাবে সেগুলিতে অনিয়মের খবর ফাঁস হতে শুরু করেছিল। প্রমাণের অভাবের কথা বলে সংবাদমাধ্যম গুরুত্ব দেয়নি। প্রমাণ সংগ্রহ করাটাও যে সাংবাদিকতার দায় তা ভুলতে বসেছেন সাংবাদিক সহকর্মীরা।
আগেই উল্লেখ করেছি, এই পরিস্থিতি ধারাবাহিকতার পরিণতি, কোনও বিশেষ জমানার অবদান নয়। তবে বিগত কয়েক বছরে তা বেড়েছে সন্দেহ নেই। এক সাংবাদিক বন্ধুর কথায় আগের তুলনায় অনেক বেশি ইক্যুয়েশন মেনে পা ফেলতে হচ্ছে।
সংবাদমাধ্যমের নিজেকে আজ তাই আয়নার সামনে দাঁড় করানো সময়ের দাবি। জরুরি চলমান জনবিচ্ছিন্ন সাংবাদিকতার কারণ অনুসন্ধান। সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। একটা কারণ অবশ্যই রাজনীতি, সাংবাদিকতাকে রাজনীতির পাশাপাশি হাঁটতে হয়। পরাধীন ভারত থেকে স্বাধীন ভারত এই দীর্ঘ সময়রাজনৈতিক ও গণ আন্দোলন বহু গুণি, ত্যাগী, নীতিনিষ্ঠ সাংবাদিকের জন্ম দিয়েছে। একদা বামপন্থীদের আন্দোলনগুলিও তাই। বিগত বহু দশক নীতি নিষ্ঠ রাজনীতি উধাও। সাংবাদিকতাও বুঝি সেই নীতিহীনতার জুতোয় পা গলিয়েছে। সাংবাদিক সহকর্মীরা আসুন আমরা আয়নায় মুখ দেখি।