
প্রতীকী চিত্র
শেষ আপডেট: 5 May 2024 14:52
অমল সরকার
ফুটবল, ক্রিকেট, হকি কিংবা ডাংগুলি, হাডুডু, খেলা যাই হোক না কেন, মাঠে নেমে নরেন্দ্র মোদী রাগবি খেলতে শুরু করবেন, যে খেলায় তাঁর বিরোধীরা তেমন পারদর্শী নয়। মোদীর বিজেপির এই কৌশল এখন আর কারও বুঝতে বাকি নেই। স্বয়ং মোদীর মুখে ‘মোদীর গ্যারান্টি’র কথা শুনে মনে হচ্ছিল উন্নয়নের বুলি দিয়েই ভোট বৈতরণী পেরিয়ে যাবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী এখন বোধহয় বুঝতে পেরেছেন পাবলিক ‘মোদীর গ্যারান্টি’ গব গব করে গিলছে না। ফলে রাজনীতির রাগবি খেলা, অর্থাৎ সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিমদের ‘জুজু’ সাজিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভয় দেখানো শুরু করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে দেশের সম্পদ মুসলিমদের মধ্যে বিলিয়ে দেবে। মুসলিমদের সন্তান সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির দায় একপ্রকার এই ধর্মীয় গোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দিতে চেয়েছেন। হিন্দু নারীর মঙ্গলসূত্র কেড়ে নেওয়ার কথা বলে একেবারে পাড়ার গলিতে বিভাজন উসকে দিয়েছেন। এর সূদূর প্রসারী প্রতিক্রিয়া আধা সেনার ঘেরাটোপে হওয়া ভোটের সময় অনুধাবন করা কঠিন। ভোট মিটতে জওয়ানেরা ব্যারাকে ফিরে যাওয়ার পর অমঙ্গলের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
ভোটের ময়দানে নরেন্দ্র মোদীকে জনবিচ্ছিন্ন পাকিস্তানি রাজনীতিকদের থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না, নির্বাচন এলেই যারা কাশ্মীর নিয়ে সুর চড়ান। মোদী বা বিজেপির পাকিস্তানকে হাতিয়ার করা নতুন কিছু নয়। ‘বিজেপি হেরে গেলে পাকিস্তানে হোলি খেলা হবে’—এমন কথা অনেকবার অমিত শাহের মুখে শোনা গিয়েছে। নরেন্দ্র মোদী ক’দিন আগে অভিযোগ করেছেন, পাকিস্তান কংগ্রেসের শাহজাদাকে (পড়ুন রাহুল গান্ধী) প্রধানমন্ত্রী করতে চায়।
কংগ্রেসের ইস্তাহার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অভিযোগ যে কষ্টকল্পিত তাতে চোখ বোলালেই তা বোঝা যায়। তারপরও ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’ এবং মুসলিমরাই বিপদ, এই ধারণা বদ্ধমূল করা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের চেনা কৌশল। প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এসওয়াই কুরেশি তাঁর ‘দ্য পপুলেশন মিথ’ বইয়ে সরকারি তথ্য-পরিসংখ্যান তুলে ধরে দেখিয়েছেন, মুসলিমদের সন্তান সংখ্যা, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি অবলম্বনে মোটেও পিছিয়ে নেই এবং জনসংখ্যায় হিন্দুদের ছাপিয়ে যাওয়া নিছকই কষ্ট কল্পনা, অপপ্রচার।
তাতে বিজেপির কিছু এসে যায় না। সব ভোটেই মোদী-সম্প্রদায় এই অস্ত্র ব্যবহার করে নিজেদের দেশপ্রেমী এবং বিরোধীদের দেশ বিরোধী দেগে দিয়ে থাকে। প্রধানমন্ত্রী এবার সেই তালিকায় দেশের গোটা মুসলিম সমাজকে জুড়ে নিয়েছেন, তাদের অনুপ্রবেশকারী বলে ইঙ্গিত করে।
এ সব ছাড়াও প্রধানমন্ত্রী তাঁর দশ বছরের কাজের ফিরিস্তি দিতে গিয়ে বারে বারে বলছেন, ‘এ তো সিরফ ট্রেলার হ্যায়, ট্রেলার।’ দিল্লির কুর্সি দখলে রাখতে পারলে মোদীর ছবির চিত্রনাট্য স্পষ্ট হবে। যদিও তাঁর দশ বছরের কার্যকলাপ থেকে এটা অনুমান করা কঠিন নয় প্রধানমন্ত্রীর ঝুলিতে কী থাকতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী যে ভাষায় কংগ্রেসকে আক্রমণ করতে গিয়ে গোটা মুসলিম সমাজকে নিশানা করেছেন, তাতে স্পষ্ট ‘সবকা সাথ’ স্লোগান দেওয়া নরেন্দ্র মোদী ওই ধর্মীয় গোষ্ঠীর ভোট চান না। দু-বছর আগে বিধানসভা ভোটে যা আরও খোলাখুলি বলেছিলেন যোগী আদিত্যনাথ। ধর্মীয় মেরুকরণের এমন মরিয়া চেষ্টার নজির নেই, বিশেষ করে কথাগুলি যখন প্রধানমন্ত্রী বলছেন।
ভোটের ময়দানে মুসলিমদের অবজ্ঞা, উপেক্ষা এবং সংখ্যালঘু প্রশ্নে পদ্ম শিবিরের বিগত কয়েক বছরের পদক্ষেপ থেকে অনুমান করা যায় দেশের প্রধান সংখ্যালঘু সমাজের জন্য কী দুর্দিন অপেক্ষা করছে। তার একটি হল, তাদের সংখ্যালঘুর মর্যাদা কেড়ে নেওয়া অথবা, জায়গা বিশেষে হিন্দুদেরও একই মর্যাদা প্রদান।
মুসলিম তোষণের ইস্যুতে কংগ্রেসকে আক্রমণ করতে গিয়ে বিজেপি সভাপতি জগৎপ্রসাদ নাড্ডা অভিযোগ করেছেন, মুসলিমদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা নিয়ে সাচার কমিটির তৈরি রিপোর্ট সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তাতে মুসলিমদের দুরবস্থা, দারিদ্র ইত্যাদি অতিরঞ্জন করা হয়েছে। বাস্তবে তারা অতটা পিছিয়ে নেই।
সাচার কমিটি গঠন করেছিল মনমোহন সিং সরকার। ২০০৬ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, প্রথম তো নয়ই, এমনকী দ্বিতীয়ও নয়, ভারতে মুসলিমরা কার্যত তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে আছে। সেই রিপোর্ট প্রকাশের আগেই শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলিমদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ করে মনমোহন সরকার। ২০০৪ সালে তারা ন্যাশনাল কমিশন ফর মাইনোরিটি এডুকেশন ইনস্টিটিউশন অ্যাক্ট চালু করে। তার আগে, ১৯৯২ সালে কংগ্রেসের নরসিংহ রাও সরকার চালু করে ন্যাশনাল কমিশন ফর মাইনোরিটিস অ্যাক্ট। ওই আইনে জাতীয় ও রাজ্য স্তরে সংখ্যালঘু কমিশন গঠিত হয়েছে। তারও আগে কংগ্রেস সরকার সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন করে মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টানদের সুযোগ সুবিধা প্রদানে নিশ্চয়তা দেয়।
বিজেপি এই সব ক’টি সুবিধা বাতিলের দাবি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে। দলের নেতা তথা আইনজীবী অশ্বিনী উপাধ্যায়ের দায়ের করা মামলায় দুটি বিষয় আছে। এক. সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয়, সংখ্যালঘু কমিশন, সংখ্যালঘু শিক্ষা কমিশন তুলে দিতে হবে। দুই. প্রথম দাবিটি মানা না হলে নয়টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে হিন্দুদের সংখ্যালঘু ঘোষণা করা হোক। এই রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলি হল, পাঞ্জাব, অরুণাচলপ্রদেশ, মিজোরাম, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, লাক্ষাদ্বীপ, জম্মু কাশ্মীর, লাদাখ ও মণিপুর। তাঁর দাবি, দুশো জেলায় হিন্দুরা সংখ্যালঘু।
উপাধ্যায়ের দাবি, সংখ্যালঘু নির্ধারণের মাপকাঠি নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। যে সব রাজ্য ও জেলায় হিন্দুরা সংখ্যালঘু সেখানে তাদেরও সংখ্যালঘুদের জন্য বরাদ্দ সুবিধাগুলি দিতে হবে। এই দাবির সমর্থন করে উপাধ্যায়ের মামলায় পার্টি হয়েছে অসমের বিজেপি সরকার। ওই রাজ্যে ২৭টির মধ্যে নয়টি জেলায় মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ওই নয় জেলায় হিন্দুদের সংখ্যালঘু গণ্য করার পক্ষপাতী অসমের মুখ্যমন্ত্রী।
সংবিধান ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি এই পথেই সরকার এগোয়, তাহলে, এই নয় জেলায় সংখ্যাগুরু মুসলিমরা তাদের সংখ্যালঘু তকমা হারাবে। সেই সূত্রে প্রাপ্য সুবিধা থেকে ব়ঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ, একাধিক ধর্মীয় গোষ্ঠী সংখ্যাগুরুর স্বীকৃতি পেতে পারে না। বর্তমানে শুধু জাতীয় ও রাজ্যভিত্তিক ধর্মীয় সংখ্যালঘু বাছাইয়ের ব্যবস্থা আছে দেশে। ওই বিচারাধীন মামলায় মোদী সরকার বলেছে, সংখ্যালঘু নির্ধারণের অধিকার কেন্দ্রের হাতে ন্যস্ত। ফলে আদালত সায় না দিলে সংসদে বিল এনে উপাধ্যায়ের দাবি পূরণ করার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
২০১১-এর জনগণনা রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলায় মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও উত্তর দিনাজপুরে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। বিজেপি যে পথে এগচ্ছে তাতে আগামী দিনে ওই জেলাগুলিতে সংখ্যালঘুদের জন্য বরাদ্দ সুযোগ সুবিধা হিন্দুরা পাবে।
জনগণনার একই রিপোর্ট অনুযায়ী অসমের জনসংখ্যার ৩৪.২২ শতাংশ মুসলিম। সেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলি হল, নিম্ন অসমের ধুবরি, গোয়ালপাড়া, বরপেটা, মরিগাঁও এবং বঙ্গাইগাঁও। মধ্য অসমের নওগাঁ এবং দরং এবং বরাক ভ্যালির হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জ। গত বিধানসভা নির্বাচনে ওই নয় জেলার ৪৯টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছে ১২টি। বাকি ২৯টি পেয়েছে কংগ্রেস এবং এআইইউডিএফ জোট।
বিজেপি মনে করছে, ওই এলাকায় হিন্দুদের সংখ্যালঘুর মর্যাদা দেওয়া গেলে তারাও চাকরি, শিক্ষায় সংরক্ষণের বাড়তি সুবিধা পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিজেপির সুবিধা হবে।
মুসলিমদের চলতি সুযোগ সুবিধা কেড়ে নেওয়ার আশঙ্কা শুধু অশ্বিনী উপাধ্যায়ের জনস্বার্থ মামলাতেই সীমাবদ্ধ নয়। গত বছর কর্নাটকে বিধানসভা ভোটের মুখে বিজেপি সরকার সরকারি চাকরিতে মুসলিমদের চার শতাংশ সংরক্ষণ খারিজ করে দিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তের দিন কয়েক পর তেলেঙ্গানায় প্রচারে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ঘোষণা করেন, বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এলে চাকরি, শিক্ষায় মুসলিমদের জন্য সংরক্ষণ বাতিল করে দেবে। রাহুল গান্ধীর কাস্ট সেন্সাসের ঘোষণা এবং ‘জিতনা আবাদি উতনা হক’ স্লোগানকে প্রধানমন্ত্রী হিন্দুর স্বার্থহানির চেষ্টা বলে অভিযোগ করেছেন। কারণ তিনি জানেন, ওবিসিদের সংরক্ষণের কোটা বাড়ানো হলে বাড়তি সুবিধা পাবে মুসলিমরা। আর্থিক মানদণ্ডে তৈরি ওবিসি তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ-সহ অনেক রাজ্যেই মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পশ্চিমবঙ্গের তালিকাটি বাতিলের দাবি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করেছে বিজেপির ওবিসি মোর্চা।
ফলে মোদী সরকার ক্ষমতায় টিকে গেলে মুসলিম-সহ সব সংখ্যালঘুর সুযোগ সুবিধা কেড়ে হিন্দুদের বিলোনোর সম্ভাবনাই বরং উড়িয়ে দেওয়া যায় না। মোদী মুসলিমদের নিশানা করেছেন। কেরল, উত্তর-পূর্ব এবং পাঞ্জাবের কথা বিবেচনায় রেখে খ্রিস্টান, শিখদের টার্গেট করেননি। যদিও পদ্ম শিবিরের কৃষক আন্দোলনকারীদের খলিস্তানিদের সঙ্গে তুলনা, মণিপুরে খ্রিস্টানদের উপর নির্যাতনের ঘটনায় স্পষ্ট কোনও সংখ্যালঘুই নিরাপদ নয়। প্রধানমন্ত্রীর রাজ্যে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণের প্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় গুজরাত সরকার নির্দেশ জারি করেছে, হিন্দুরা ধর্ম বদল করতে চাইলে আগাম সরকারের অনুমতি নিতে হবে। তাই মুখ বুজে থাকার উপায় নেই। জার্মান কবি মার্টিন নিম্যোলারের সেই লাইনগুলি আজ খুবই প্রাসঙ্গিক—
যখন ওরা প্রথমে কমিউনিস্টদের জন্য এসেছিল, আমি কোনও কথা বলিনি,
কারণ আমি কমিউনিস্ট নই।
তারপর যখন ওরা ট্রেড ইউনিয়নের লোকগুলোকে ধরে নিয়ে গেল, আমি নীরব ছিলাম,
কারণ আমি শ্রমিক নই।
তারপর ওরা যখন ফিরে এলো ইহুদিদের গ্যাস চেম্বারে ভরে মারতে, আমি তখনও চুপ করে ছিলাম,
কারণ আমি ইহুদি নই।
আবারও আসল ওরা ক্যাথলিকদের ধরে নিয়ে যেতে, আমি টুঁ শব্দটি করিনি,
কারণ আমি ক্যাথলিক নই।
শেষবার ওরা ফিরে এলো আমাকে ধরে নিয়ে যেতে,
আমার পক্ষে কেউ কোনও কথা বলল না, কারণ, কথা বলার মত তখন আর কেউ বেঁচে ছিল না।