দেশ-কাল ভেদে বছরের পর পর পাশাপাশি বসবাস করা দু’টো মানুষের গল্প কোথাও না কোথাও গিয়ে হয়তো মিলেই যায়।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 20 August 2025 17:09
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘‘প্রকাশক আর লেখকের সম্পর্ক টা স্বামী-স্ত্রীর মতো, লেখক থাকে ভিতরে আর বাইরে থাকে প্রকাশক, তুমি আমার জীবনের লেখক…’’
‘‘৫০ বছর ধরে তুমি আমার জুতোটা পর্যন্ত খুঁজে দিয়েছ। তুমি তো স্বাবলম্বী হতে পেরেছ, আমি পারিনি…’’
‘‘এই বয়সে একাকিত্ব জিনিস্টা বড় ভয়ঙ্কর… ওখানে আমার সঙ্গে তো ঝগড়া করার কেউ ছিল না।’’
কথাগুলো ভীষণ চেনা। হয়তো কঠোর বাস্তবও। দেশ-কাল ভেদে বছরের পর পর পাশাপাশি বসবাস করা দু’টো মানুষের গল্প কোথাও না কোথাও গিয়ে হয়তো মিলেই যায়। জাপানের বয়স্ক দম্পতি তেতসু আর কেইকোর জীবনও এক জায়গায় গিয়ে মিলে গিয়েছে সেলুলয়েডের সঙ্গে। এ যেন অনেকটা বাস্তবের বেলাশেষে…
৬০ বছর বয়সে চাকরি থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন তেতসু ইয়ামাদা। অবসরের সময় হাতে ছিল প্রায় ২.৯৬ কোটি টাকা (৫০ মিলিয়ন ইয়েন)। ইচ্ছে ছিল, এবার শেষ বয়সটা স্ত্রী কেইকোকে নিয়ে গ্রামে ফিরে গিয়ে শান্তিপূর্ণ জীবন কাটাবেন। কিন্তু শহুরে জীবনের আরাম আর ব্যস্ততার সঙ্গে অভ্যস্ত কেইকো সেই প্রস্তাবে রাজি হলেন না। তাঁদের দুই ছেলে, যাঁরা টোকিওতেই চাকরি করেন, তাঁরাও গ্রামে যেতে পারেননি। ফলে ইয়ামাদার অবসরের স্বপ্নের সঙ্গে পরিবারের জীবনযাত্রার সংঘাত শুরু হয়।
কেইকো প্রস্তাব দেন ‘সোৎসুকন’এর, যা জাপানের একটি বিশেষ প্রচলিত ধারণা - বিয়ে অক্ষুণ্ণ রেখে আলাদা থাকা, যাতে দু’জনই নিজেদের মতো করে স্বাধীন জীবনযাপন করতে পারেন। ২০০৪ সালে চালু হওয়া এই ধারণা ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে জাপানের প্রবীণ দম্পতিদের মধ্যে।
তেতসু ইয়ামাদা এটিকে ডিভোর্সের তুলনায় সহজ মনে করে প্রস্তাবে সম্মতি দেন। একাই গ্রামে চলে যান, পুরোনো বাড়ি সংস্কার করেন অবসরের টাকায়। ভেবেছিলেন, শান্তির ‘দ্বিতীয় জীবন’ শুরু হল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল তিনি নিত্যদিনের কাজ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। রান্না-বান্না সম্পর্কে কোনও ধারণা না থাকায় ইনস্ট্যান্ট নুডলস আর ফ্রোজেন সবজিতেই দিন কাটতে লাগল।
অন্যদিকে কেইকোর জীবন নতুন রঙে ভরে উঠল। সংসার থেকে মুক্তি পেয়ে ঝাড়া হাতপা কেইকো টোকিওতে শুরু করেন হ্যান্ডমেড ক্রাফটের একটি ওয়ার্কশপ, যা খুব দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সোসশ্যাল মিডিয়ায় তেতসু প্রায়ই দেখেন স্ত্রীর সাফল্যের ছবি। একসময় তিনি বুঝতে পারেন, তাঁকে ছাড়া কেইকো খুশিই আছেন নিজের জীবনে। এদিকে তাঁর নিজের জীবনে এসেছে নিঃসঙ্গতা আর অনুশোচনার পাহাড়।
যদিও তিনি মাঝে মাঝে স্ত্রীর সঙ্গে অনলাইনে কথা বলেন, তবে ছেলেদের সঙ্গে সম্পর্কটা বেশ ফিকে হয়ে এসেছে বলে মনে করেন তেতসু। যে জীবনের স্বপ্ন দেখেছিলেন, বাস্তবে দাঁড়িয়ে তা নিয়ে বেশ দ্বিধাগ্রস্ত তেতসু। আবার টোকিওয় ফিরবেন কিনা, সে নিয়েও ভাবছেন তিনি।
এক সমীক্ষায় (Interstation, ২০১৪) দেখা গিয়েছিল, ৩০ থেকে ৬০ বছর বয়সি বিবাহিত জাপানি মহিলাদের প্রায় ৫৬.৮ শতাংশ সোৎসুকন-এর ধারণাকে সমর্থন করেছেন। তাঁদের অধিকাংশই ৬০–৬৫ বছর বয়সের মধ্যে আলাদা থাকার পক্ষে মত দিয়েছেন। অনেকের মতে, সংসারের দায়িত্ব থেকে মুক্ত থেকে স্বাধীনভাবে জীবন উপভোগ করার জন্যই এই ইচ্ছা।
তেতসুর গল্প এখন অনেককে ভাবাচ্ছে, পরিবার ছেড়ে স্বাধীন জীবনের স্বপ্ন কখনও দুঃস্বপ্নও হয়ে উঠতে পারে।
জাপানের সোশ্যাল মিডিয়ায় রীতিমতো ভাইরাল হয়ে গিয়েছে তেতসু-কেইকুর কথা। একজন মন্তব্য করেছেন, “তেতসু ভেবেছিলেন নতুন জীবন শুরু করছেন, কিন্তু সংসার চালানোর দক্ষতা ছাড়া একা থাকা তাঁর জন্য শেষমেশ বিপর্যয় হয়ে দাঁড়াল।” আরেকজন লিখেছেন, “কেইকোকে শুভেচ্ছা জানাই। অন্যের যত্ন করার বোঝা আর তাঁর নেই, এবার তিনি নিজের শখ পূর্ণ করতে পারবেন।”