দ্য ওয়াল ব্যুরো: ছোট্টবেলায়, চরম অভাবের সংসারে, মাত্র ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়ে গেছিল এক শিশু। নিয়ু গেনশেং নামের সেই মানুষটিই পরবর্তীকালে চিনে পরিচিত হয়ে ওঠেন 'ডেয়ারি গডফাদার' নামে। আজ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ আইসক্রিম সাম্রাজ্যের কর্ণধার তিনিই। ৬৭ বছর বয়সি নিয়ু গেনশেং-এর এই অবিশ্বাস্য উত্থান কেবল আর্থিক সাফল্যের নয়, তাঁর মর্মস্পর্শী মানবিক সংগ্রাম ও সামাজিক দায়বদ্ধতারও অনন্য নজির।
ইনার মঙ্গোলিয়ার এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম হয় নিয়ুর। আর্থিক টানাপড়েনের কারণে জন্মের কিছুদিনের মধ্যেই তাঁকে ৫০ ইউয়ান (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৬০০ টাকা)-এর বিনিময়ে এক পশুপালক দম্পতির হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেই ছোটবেলা থেকেই শুরু হয় কঠিন জীবনসংগ্রাম। কিছুদিনের মধ্যেই তার সেই পালক পিতামাতারও মৃত্যু হয়। একাই পথ চলা শুরু হয় নিয়ুর।
১৯৮৩ সালে এক দুধের কারখানায় বোতল ধোয়ার কাজ দিয়ে শুরু হয় কর্মজীবন। সেই প্রতিষ্ঠানই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে চিনের অন্যতম বৃহৎ দুধের সংস্থা ইয়িলি। কর্মজীবনে নিষ্ঠা ও দক্ষতায় ১৯৯২ সালের মধ্যে তিনি উৎপাদন বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হয়ে ওঠেন। তখনই নিয়ুর বার্ষিক আয় হয়ে দাঁড়ায়, ১০ লক্ষ ইউয়ান, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১.৪ কোটি টাকা।
তবে কিছুদিন পরে সংস্থার অন্দরের নানা অশান্তির কারণে ইয়িলি ছেড়ে দিতে হয় নিয়ুকে। ১৯৯৯ সালে ১০ মিলিয়ন ইউয়ান অর্থাৎ প্রায় ১৪ কোটি টাকার পুঁজি নিয়ে তিনি নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন মেংনিউ ডেইরি। শুরু থেকেই তাঁর লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ বাজার। স্থানীয় উপভাষায় প্রচার, সাশ্রয়ী মূল্য এবং গুণগত মানের মাধ্যমে তিনি গ্রাহকদের মন জয় করেন। ২০০৪ সালের মধ্যেই কোম্পানির আয় পৌঁছয় ৭.২ বিলিয়ন ইউয়ানে, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯৮৫ কোটি টাকায়। এক বছরের ব্যবধানে, ২০০৫-এ মেংনিউ ডেইরি চিনের শীর্ষ দুগ্ধ সংস্থা হয়ে ওঠে।

২০১৫ সালে তিনি নজর দেন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে। ইন্দোনেশিয়ায় শুরু করেন আইসক্রিম ব্র্যান্ড 'Aice'। নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের কথা মাথায় রেখে তৈরি এই ব্র্যান্ডের প্রতিটি আইসক্রিমের দাম ছিল খুব কম। বিশেষ করে অঞ্চলভিত্তিক জনপ্রিয় স্বাদ যেমন ডুরিয়ান ও নারকেল কফির মত আইসক্রিম এনে বাজার মাত করেন। ছোট দোকানিদের বিনামূল্যে ফ্রিজ এবং বিদ্যুৎ ভর্তুকি দিয়ে ব্যবসার পরিধিও বাড়ান।
আজ ইন্দোনেশিয়ার ১২০০-রও বেশি জেলাজুড়ে রয়েছে Aice ব্র্যান্ডের দোকান। বছরে ৩ বিলিয়ন ইউয়ানের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ৩,৪০০ কোটি টাকা আয় করে এই ব্র্যান্ড, যা একে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শীর্ষ আইসক্রিম ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।
তবে নিয়ুর দৃষ্টিভঙ্গি শুধুমাত্র মুনাফাকেন্দ্রিক নয়। তাঁর কথায়, 'ধনীদের আরও বেশি বিলাসিতা নয়, দরিদ্রদের সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে দেওয়া আমার ব্যবসার উদ্দেশ্য।' তাই তিনি নিজের জন্মস্থান, ইনার মঙ্গোলিয়ায় অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসাতেও বহু টাকাপয়সা দান করেন এবং চিনের নানা প্রান্তে বহু স্কুল নির্মাণেও সহায়তা করেন।
চিনের সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর জীবনের গল্প ভাইরাল হয়েছে। সেখানে একজন ব্যবহারকারী লেখেন, 'ইনার মঙ্গোলিয়ার গরুর খামার থেকে জাকার্তার আইসক্রিম ফ্যাক্টরি পর্যন্ত লড়াই করে, ৪০ বছর ধরে নিয়ু প্রমাণ করেছেন, তিনিই প্রকৃত ব্যবসায়ী। তিনি সমানাধিকারে বিশ্বাস করেন এবং মানবিক প্রয়োজন বোঝেন।'
তাই নিয়ু গেনশেং-এর জীবন কেবল সফলতার গল্প নয়, এটি লড়াই ও উদারতার এক বিরল মহাকাব্য।