শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো বহুমুখীপ্রতিভার কিংবদন্তী কেন চলচ্চিত্র পরিচালক হলেন না, এ আমাদের অনেকেরই প্রশ্ন! যে প্রশ্ন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পর আরও জোরালো হয়েছে দর্শক মহলে। তিনি নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ির ছাত্র এবং সত্যজিৎ রায়ের হাতেগড়া মানসপুত্র। 'ফেরা', 'নীলকণ্ঠ', 'নামজীবন' ইত্যাদি বহু বিখ্যাত নাটক পরিচালনা করেছেন তিনি। দু'টি বিখ্যাত টেলিছবিও পরিচালনা করেছেন, 'স্ত্রীর পত্র' (হিন্দি) এবং 'মহাসিন্ধুর ওপার হতে' (বাংলা)। ছবির আঁকার হাতও অপূর্ব। লেখার হাতও তাই। কবিতাপাঠ অসাধারণ।
তবুও সেভাবে ফিল্ম ডিরেক্টর সৌমিত্রকে আমরা পেলাম না।

সেদিক থেকে উত্তম কুমার কম সময়েও অনেকগুলি ছবি পরিচালনা করেছেন। সেগুলি বক্সঅফিসেও হিট করেছে। 'বনপলাশীর পদাবলী' থেকে 'কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী'। অপর্ণা সেন তো অভিনেত্রীর চেয়েও পরিচালিকা রূপে দর্শক মনে বেশি জায়গা করে নিয়েছেন। মাধবী মুখোপাধ্যায়ও বেশ কিছু জনপ্রিয় টেলিছবি পরিচালনা করেছেন। একমাত্র সুচিত্রা সেন অভিনয়ের বাইরে কিছু করেননি। কিন্তু সৌমিত্র যেখানে একজন এত উচ্চমানের নাট্যনির্দেশক ও চিত্রনাট্যকার, তাঁর কাছে ছবি পরিচালনা আশা করতেন অনেকেই। তবু তেমনটা হয়নি।
আসলে সৌমিত্র নিজেও চেয়েছিলেন, বহু চেষ্টাও করেছিলেন ছবি পরিচালনা করার। কিন্তু সেটা সম্ভব হয়নি নানা কারণে।
আমাদের পেছিয়ে যেতে হবে সত্তরের দশকে। তখন বাংলা চলচ্চিত্র জগতে চলছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও উৎপল দত্ত পর্ব। 'অভিনেত্রী সঙ্ঘ'র নিবেদনে 'ক্রুশবিদ্ধ ক্যুবা' নাটকে একসঙ্গে কাজ করেছিলেন সৌমিত্র-উৎপল এবং অপর্ণা সেন। অভিনেত্রী সঙ্ঘতে টাকাপয়সার বালাই খুব একটা ছিল না। নিজেদেরই সব আয়োজন করতে হত। নাটকের মহড়া, বিশাল জনতার আয়োজন এবং পঞ্চাশ ষাট লোককে একত্র করে নাটকের রিহার্সাল দেওয়া হল। কিন্তু এত ব্যয় সাপেক্ষ নাটক সেভাবে ফলপ্রসূ হলনা। মাত্র পাঁচ-ছ'টা শো মঞ্চস্থ করা গেল।

তবুও নিরাশ হলেননা সৌমিত্র। নিরন্তর উৎকৃষ্ট মানের কাজ করে যাবার প্রচেষ্টা তাঁর ছিল। তাই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় উৎপল দত্তকে বললেন, "কম বাজেটে কিছু করুন না, যা দু'জনে মিলে করা যায়। আইল্যান্ড করবেন?" উৎপল দত্ত বললেন, "না! ওটা আমার ভাল লাগে না। তুমি 'স্লিউদ' পড়েছো?" সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বললেন, "পড়িনি, কিন্তু দেখেছি।" (১৯৭২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত স্যার লরেন্স অলিভিয়ার এবং মাইকেল কেইন অভিনীত, জোসেফ ম্যাঙ্কিউইক্স পরিচালিত এই ছবি তখন বিলেতে দেখেছেন সৌমিত্র।)
আলোচনায় ঠিক হল 'স্লিউদ'-এর বাংলায় রূপান্তর হবে। কিন্তু উৎপল দিলেন শর্ত। পরিচালনা করবেন উৎপল আর লিখবেন সৌমিত্র। সৌমিত্র বললেন ঠিক আছে। অবশ্যই দু'জনের অভিনয় নির্ভর নাটক। সৌমিত্রকে প্রচুর বই এনে দিলেন উৎপল। কিন্তু সৌমিত্র দেখলেন, বাংলায় অনুবাদ করা দুরূহ। উৎপল সহজাত ঠাট্টা করে বললেন "ওইজন্যই তো বই দিয়েছিলাম। ওটা হবেই না! আর আমিও বেঁচে যাব।"

সৌমিত্র তবু ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। ডাল্টনগঞ্জ চলে গেলেন, নিভৃতে বসে বাংলা অনুবাদ করতে। চিত্রনাট্য হয়েও গেল। উৎপল দত্ত পড়ে ভীষণ খুশি হলেন, বললেন নাটকের নাম 'টিকটিকি' দিতে। ইংরাজিতে স্লিউদ মানে গুপ্ত গোয়েন্দা। যার সঙ্গে টিকটিকি নাম একেবারেই যথার্থ।
কিন্তু উৎপল দত্তর নাটকের দল 'পিএলটি' ওঁকে বাইরে নাটক করতে দিল না। উৎপল দত্ত সৌমিত্রকে ওঁদের দলে করতে বললেন নাটকটি। সৌমিত্র তাতে রাজি হলেন না। এদিকে উৎপল দত্ত 'অভিনেত্রী সঙ্ঘ'-তে কাজ করবেন না। কারণ ওখানে টাকাকড়ির সমস্যা। আগে সেখানে 'ক্রুশবিদ্ধ ক্যুবা' নাটকে কাজ করে দেখেছেন, কীভাবে শো ফ্লপ হয় এবং শো পায় না।

শেষমেষ উৎপল সৌমিত্রকে বললেন আমি আর তুমি মিলে 'টিএলটি' বলে একটা প্রফেশানাল দল করে এ নাটক করব। সেটাও 'পিএলটি' প্রত্যাখ্যান করল। উৎপল দত্ত-সৌমিত্র জুটির অসামান্য আখ্যান ভেঙে গেল। তবে 'হাল ছেড়ো না বন্ধু' স্লোগানে বিশ্বাসী সৌমিত্র যত্নে রেখে দিলেন সেই বাংলা অনুবাদ চিত্রনাট্য।
কেটে গেল বেশ কিছু বছর।
আমরা বাঙালিরা উত্তম-সৌমিত্র কে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে তর্কের ঝড় তুলি। কিন্তু ওঁদের কাজে প্রতিযোগিতা থাকলেও পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল দাদা-ভাইয়ের। উত্তম কুমার সৌমিত্রকে যা স্বাধীনতা দিয়েছেন, ভালবাসা ও স্নেহ দিয়েছেন, তা তুলনাতীত।

উত্তম কুমার চলে যাওয়ার দু'বছর আগের ঘটনা। উত্তম আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় জগৎবল্লভপুরে আউটডোর শ্যুটিং করছেন একটি ছবির। চণ্ডীমাতা ফিল্মসের ছবি। 'স্লিউদ' ছবিটি উত্তমও দেখেছিলেন বম্বেতে। তো আড্ডায় উঠে এল সেই 'স্লিউদ' প্রসঙ্গ। উত্তম বললেন "কলকাতায় আসেনি ছবিটা, পুলু তুই দেখেছিস কি? আমার দারুণ লেগেছে।" সৌমিত্র বললেন "বিলেতে দেখেছি। আমার বাংলায় নাট্যরূপও দেওয়া আছে। তুমি করবে? একটি চরিত্রে তুমি আর একটিতে আমি। এমনটা যদি হয়, হল ফেটে পড়বে।"
উত্তমকুমারের তখন শারীরিক অবস্থা বেশ উদ্বেগজনক। মঞ্চে অভিনয় করার ধকল শরীরে আর সইবে না। এমনকি কঠিন শট দিতে গেলেও জিভের তলায় সরবিট্রেট রাখতে হয়। সেসব ভেবেই উত্তম বললেন, "থিয়েটার আমি এখন আর পারব না রে! দেখছিস তো অবস্থা! তার চেয়ে 'টিকটিকি' সিনেমা করি চল। একসঙ্গে চল চণ্ডীমাতা ফিল্মসের নারায়ণবাবুদের বলব। তুই ডিরেক্ট কর পুলু (সৌমিত্রর ডাক নাম)। আমাকে টাকাও দিতে হবে না, বক্স অফিস বিক্রি থেকে আমারটা শোধ হয়ে যাবে।"

এর চেয়ে ভাল অফার সৌমিত্রর কাছে আর কিছু হতে পারত না।
এর পরে দু'জনেই বললেন চণ্ডীমাতা ফিল্মসকে। তাদের ব্যানারে অসংখ্য ছবি করেছেন উত্তম কুমার। যার পনেরো-কুড়িটা ছবি সুপারহিট। সন্ন্যাসী রাজা, হার মানা হার, কাল তুমি আলেয়া, ধনরাজ তামাং। সৌমিত্ররও ওই ব্যানারে ছ-সাত খানা ছবি হিট। উত্তম-সৌমিত্রর 'অপরিচিত'র মতো ছবি বানিয়েছে চণ্ডীমাতা প্রাইভেট লিমিটেডই।

অথচ তার পরেও বেঁকে বসল চণ্ডীমাতা ফিল্মস। তাঁরা স্পষ্ট জানিয়ে দিল, "মাত্র দু'জন পুরুষ চরিত্র ছবিতে। একটাও মেয়ে নেই। নায়িকাবিহীন এ ছবি মফস্বলে চলবে না। আমরা এই ছবি করে লোকসান করব না।"
দুই মহাতারকা নায়ক এক হয়ে যে ছবি করতে উদ্যোগী হন, সেই ছবির আশা নিভে যায় শুধু এক প্রযোজক সংস্থার অবিবেচক আচরণে। তাঁরা তাঁদের দিকটাও হয়তো ভেবেছিলেন। এক্সপেরিমেন্টাল কাজ তো পাবলিক সব সময় গ্রহণ করে না, তার ওপর হলিউড কাজের বাংলা রূপ। গান নেই সেভাবে যে ছবিতে।

এই শুনে উত্তমকুমার বলেছিলেন "এই দেশে এর থেকে বেশি আশা করা যায় না।" সৌমিত্র বলেছিলেন, "যাদের ঘরে আমার আর উত্তমদার এতগুলো হিট ছবি, তাঁরা না হয় একটা ছবির টাকা ফেলেই দিত। চণ্ডীমাতার যে ফ্লপ ছবি একটাও নেই তা তো নয়। কিন্তু এ ছবির আর্কাইভ ভ্যালু বিশাল হত। বাঙালির কাছে কি সম্পদ রয়ে যেত ভাবুন। উত্তম-সৌমিত্র এরকম আর্কাইভাল জিনিস থাকত। তো সে-ও হল না।"
সৌমিত্র তাঁর ফিল্ম পরিচালনা নিয়ে আরও বলেছিলেন, "আসলে কী জানো, ছবি করার জন্য ফাইনান্সার হয়তো পেতাম, কিন্তু তাহলে আমাকে গতে বাঁধা বাংলা ছবিই করতে হতো। সেটা করতে আমার মন কোনও দিনই সায় দেয়নি।" বহু বছর পরে বিখ্যাত শিল্পী দম্পতি শ্যামল সেন ও চিত্রা সেনের পুত্র, অভিনেতা ও নির্দেশক কৌশিক সেনের অনুরোধে তাঁদের নাট্যদল 'স্বপ্নসন্ধানী'কে নাটকটি দেন সৌমিত্র।

১৯৯২ সালে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে সভাপতি করে নিজস্ব নাট্যদল স্বপ্নসন্ধানী গঠন করেন কৌশিক সেন। ১৯৯৫ নাগাদ 'স্বপ্নসন্ধানী'র জন্মদিন উপলক্ষে 'টিকটিকি' প্রথম মঞ্চস্থ করা হয়। অভিনয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ও কৌশিক সেন দু'জনে। অসাধারণ নাটক। অসামান্য অভিনয়।
গোয়েন্দা গল্পলেখক 'সত্যসিন্ধু চৌধুরী', কলকাতার বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী, যিনি ছিলেন নাকি তাঁদের একজন পূর্বসূরী, অর্থাৎ সত্যসিন্ধু সেই বংশের অন্যতম উত্তরসূরী, সেই 'সত্যসিন্ধু'-রূপে আবির্ভূত হন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। 'রোহিতাশ্ব' তাঁরই সৃষ্ট এক গোয়েন্দা চরিত্র। তাঁর কাছে 'বিমল নন্দী' নামে যে যুবক আসেন, সেই ভূমিকায় রূপদান করেন কৌশিক সেন।

'টিকটিকি' এই দুই অভিনেতার অভিনয়ে চলচ্চিত্র আকারে মুক্তি পায় ২০১২ সালে। তখন তার পরিচালক ছিলেন রাজা দাশগুপ্ত। টেলিভিশন সম্প্রচারও হয়েছিল। কিন্তু যে গল্প একটা ঐতিহাসিক কাজ হতে পারত বাঙালির জীবনে তা থেকে বঞ্চিত হল সকলে। অবিবেচক প্রযোজকগোষ্ঠীর সিদ্ধান্তে শিল্পের বিচার হল না। কে বলতে পারে, সৌমিত্রর পরিচালনায় উত্তম-সৌমিত্রের ছবি হয়তো হাউসফুল ও দর্শকধন্য হত। বাঙালি তো ভক্তিৃশ্রদ্ধায়-আবেগেই এ ছবিকে মাথায় করে রাখত।