
শেষ আপডেট: 19 March 2019 10:36
আজ নয়, সেই ১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় থেকে তিনি শুরু করেছেন এই চিঠি লেখা। এখনও পর্যন্ত চার হাজার চিঠি লিখে ফেলেছেন জিতেন্দ্র। প্রায় ২০০ শহিদ পরিবারের থেকে জবাবও পেয়েছেন।
জিতেন্দ্র জানালেন, আর্থিক ভাবে শহিদ পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষমতা তাঁর নেই। তাই তিনি তাঁর শব্দের মাধ্যমেই তাঁদের সমবেদনা জানানোর চেষ্টা করেন। তাঁর গ্রামের অনেক বাসিন্দাই কার্গিল যুদ্ধের শহিদ৷ সেই সব পরিবার জওয়ানদের স্মৃতি আঁকড়েই বেঁচে রয়েছে৷ তাঁদের সেই স্মৃতির সম্ভারকে আরও সমৃদ্ধ করেন তিনি৷
"ভরতপুর থেকেই অনেকে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে রয়েছেন। আমি ছোটোবেলা থেকেই দেখেচি, দূরে পোস্টিং-এ থাকা জওয়ানরা চিঠি লেখেন তাঁদের পরিবারকে। এক একটি চিঠি যেন এক এক মুঠো স্বস্তি হয়ে এসে পৌঁছয় পরিবারগুলির কাছে। আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, এক সময়ে চিঠির বদলে কফিন আসে বাড়িতে। চিরতরে বন্ধ হয় চিঠি আসা। আমায় খুবই ব্যথা দেয় এই মৃত্যু। সে জন্যই, ১৯৯৯ সাল থেকে আমিও চিঠি লেখা শুরু করি। শব্দেরা অনেক ক্ষতেই মলম দিতে পারে বলে আমার বিশ্বাস। আর এটা করে আমিও খুবই তৃপ্তি পাই, শান্তি পাই।"-- বললেন জিতেন্দ্র।
জিতেন্দ্রর ছেলে হরদীপ সিং-এর বয়স এখন ১৫ বছর। ছেলেকে আর কয়েক বছর পরে সেনাবাহিনীতেই পাঠাতে চান জিতেন্দ্র। তিনি নিজেও চেয়েছিলেন সেটাই। বললেন, "আমি সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু প্রয়োজনীয় উচ্চতার থেকে মাত্র এক সেন্টিমিটার কম ছিল আমার। তাই যোগ দেওয়া হয়নি। তবে ওই সেনার পোশাকের উপর এক দুর্নিবার আকর্ষণ ছিল। সে জন্য ঠিক করি, দেশের জন্য না পারলেও, বেসরকারি ভাবে হলেও এই পোশাক আমি পরব। তাই নিরাপত্তাকর্মীর কাজ বেছে নিই।"
এ ভাবেই বছরের পর বছর দেশের সেবা করছেন তিনি। বলা ভাল, দেশের সেবা করতে গিয়ে যে মানুষগুলি হারিয়ে গিয়েছেন, তাঁদের পরিবারগুলির সেবা করছেন। এ-ও এক ধরনের মানসিক সেবা। অন্তরের শুশ্রূষা। সেই শুশ্রূষার তাগিদেই মুঠো ভর্তি স্মৃতি পাঠান তিনি৷ অতীতের গল্পকে সমবেদনায় মুড়ে তাঁর লেখায় তুলে আনেন৷ আর সেই লেখাই এগিয়ে চলার আর বাঁচার রসদ জোগায় স্বজন হারানো পরিবারগুলোকে৷
তাঁর প্রতিটি চিঠিতে খুব যত্ন করে ভারতের জাতীয় পতাকা আঁকেন তিনি৷ চিঠির শুরু হয় বন্দেমাতরম বা সত্যমেব জয়তে সম্বোধন দিয়ে৷ তার পরে তিনি লেখেন সেই সব শহিদদের বীরত্বের কথা৷ লেখেন তাঁদের সম্পর্কে নানা নতুন তথ্যও, যা উদ্বুদ্ধ করে পরিবার পরিজনদের৷ নিজের লেখা কবিতাও সে চিঠিতে উল্লেখ করেন জিতেন্দ্র, যা ওই পরিবারগুলিকে নতুন করে বাঁচতে সাহায্য করে৷ প্রিয়জনকে হারানোর ব্যথা কিছুটা হলেও ভুলিয়ে দেয় সে চিঠিগুলি।
কিন্তু কোথা থেকে পান, তিনি সেই সব চলে যাওয়া শহিদ সম্পর্কে নানা রকম তথ্য? জিতেন্দ্র জানান, নানা সংবাদপত্র, পত্রিকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন তিনি৷ সেই সব তথ্যকেই গুছিয়ে সাজিয়ে লিখে ফেলেন চিঠিতে৷ তার পরে জোগাড় করেন পরিবারগুলির ফোন নম্বর, ঠিকানা। পাঠিয়ে দেন চিঠি।
তবে শুধু চিঠি লেখাই নয়, বহু পরিবারের সঙ্গে দেখাও করেছেন জিতেন্দ্র৷ প্রায় ৩০-৪০টি পরিবারে আপনজনের সম্মানও পেয়েছেন তিনি৷ সেই সব বাড়িতে রাখা শহিদ স্মারকের থেকে মাটি সংগ্রহ করেও নিয়ে এসেছেন নিজের বাড়িতে৷
এখন জিতেন্দ্র জানালেন, পুলওয়ামায় শহিদ হওয়া জওয়ানদের পরিবারগুলিকে চিঠি লিখছেন তিনি। অনেকগুলি লেখা হয়েছে, কিছু বাকি আছে। একে একে শেষ করছেন কাজ।
৩৭ বছরের জিতেন্দ্র এভাবেই বাঁচিয়ে রেখেছেন এতগুলো পরিবারকে৷ স্মৃতির উপহার দিয়ে৷ তাঁর লেখা পোস্ট কার্ডের আশায় বসে থাকে দেশের নানা প্রান্তের স্বজন হারানো পরিবার৷ কারণ তাঁর চিঠিতে যেন প্রিয়জনের সেই চেনা গন্ধই লেগে থাকে৷