শেষ আপডেট: 11 April 2020 05:14
পৃথিবীর পঞ্চম বৃহত্তম হীরে, ১৮৫ ক্যারেটের জ্যাকব ডায়মন্ড।[/caption]
হ্যাঁ, এই চুড়ান্ত মিতব্যয়ী লোকটিই একসময় ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড়লোক। তিনি হলেন, অবিভক্ত ভারতের হায়দরাবাদ ও বেরার রাজ্যের শেষ নিজাম, স্যর মীর উসমান আলি খান সিদ্দিকি। রাজ্যটি পরাধীন ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য ছিল। স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ডকে যুক্ত করলে যা আয়তন হয় তৎকালীন হায়দরাবাদ ও বেরার স্টেটের আয়তন ছিল তার থেকেও বেশি। নিজামের অধীনে বাস করতেন ১ কোটি ৬০ লক্ষ মানুষ, অধীনে ছিল ৮২,৬৯৮ বর্গ মাইল ভূখন্ড।
নিজামের ক্ষয়াটে চেহারা, জামা কাপড়ের ছিরি এবং ঝুলো গোঁফ দেখে এক ঝলকে মনে হতো রাজা রাজড়ার রসুইয়ের বাবুর্চি। কিন্তু এই খর্বকায় মানুষটি ছিলেন অবিশ্বাস্য পরিমাণ সম্পদের অধিকারী। নিজাম থাকাকালীন তিনিই বিশ্বের ধনীতম ব্যক্তি ছিলেন। ফরচুন পত্রিকা ১৯৪০ সালে তাঁর সম্পত্তির মূল্য ধরে দুই বিলিয়ন ইউএস ডলার। বর্তমানে যার মূল্য দাঁড়াতো কম করে ধরলেও প্রায় চার বিলিয়ন ইউএস ডলার। টাকার মূল্যে প্রায় ২৯৭৪৫ কোটি টাকা। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি তো ছিলেনই , ১৯৩০-১৯৫০ অবধি তাঁকে দক্ষিণ এশিয়ার ধনীতম ব্যক্তি হিসেবে ধরা হত। বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের কভারে, ১৯৩৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি, নিজামের ছবি ছাপা হয়েছিল। নিচে ক্যাপশন দেওয়া ছিল, "The richest man in the world"।
[caption id="attachment_207392" align="aligncenter" width="400"]
বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন কভারে নিজামের ছবি।[/caption]
স্যার মীর উসমান আলি খান সিদ্দিকি নিজাম হিসেবে রাজ্য শাসন করেছেন ১৯১১ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত। রাজ্যটিকে রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। ভারতে বা পাকিস্তানের অধীনে রাজ্যটিকে নিয়ে যেতে চাননি। চেয়েছিলেন ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গেই জন্ম নিক তৃতীয় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। চৌধুরী রহমত আলি যার নাম দিয়েছিলেন ‘উসমানিস্তান‘। কিন্তু ভারত সরকার নিজামের এই সিদ্ধান্ত পত্রপাঠ প্রত্যাখ্যান করেছিল। কিন্তু নাছোড়বান্দা ছিলেন নিজামও।
আলোচনার টেবিলে বিফল হয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর হায়দরাবাদ আক্রমণ করেছিল। মেজর জেনারেল জয়ন্ত চৌধুরীর নেতৃত্বে এক ডিভিশন ভারতীয় সেনা ও একটি ট্যাঙ্ক ব্রিগেড হায়দরাবাদে আক্রমণ চালিয়েছিল। আক্রমণের সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন পোলো’।
নিজামের পাঁচ হাজার সেনার পক্ষে ভারতের প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীর স্থল ও আকাশ পথে হামলা প্রতিহত করা সম্ভব ছিল না। তাই কয়েক ঘন্টার মধ্যে হার মেনেছিলেন নিজাম। তাঁর হায়দরাবাদ ও বেরার স্টেট ভারতের মানচিত্রে প্রবেশ করেছিল। ভারতে অন্তর্ভুক্তির পর ১৯৫০ সালের ২৫শে জানুয়ারি নিজাম মীর উসমান আলিকে হায়দরাবাদ স্টেটের 'রাজপ্রমুখ' পদে বসানো হয়েছিল। সেই পদে তিনি ছিলেন ১৯৫৬ সালের ৩১শে অক্টোবর পর্যন্ত।
[caption id="attachment_207393" align="aligncenter" width="771"]
নিজাম, স্যার মীর উসমান আলি খান সিদ্দিকি।[/caption]
আমাদের মনে হতে পারে, সাতটি স্ত্রী , চৌত্রিশটা সন্তান এবং অগনিত রক্ষিতা নিয়ে জীবন কাটানো নিজাম সাহেব আদৌ সুবিধের লোক ছিলেন না। কেউ মনে করতে অপারেন, তিনি তীব্র ভারত বিরোধী ছিলেন। কেউ কেউ তাঁকে একজন কট্টর হিন্দু বিদ্বেষী মুসলিম শাসক ও শোষক হিসেবে দেখিয়েছেন। যদিও ধর্মের ভিত্তিতে সদ্য তৈরি হওয়া পাকিস্তানের সঙ্গে তাঁর রাজ্যকে যুক্ত করেননি নিজাম। তাহলে এবার জেনে নিন, এই মানুষটি, নিজাম মীর উসমান আলি খান সিদ্দিকি ভারতের জন্য কী করে গেছেন। সবার অপছন্দের নিজাম বাহাদুর ভারতের জন্য যেটা করে গেছেন, তা আজ পর্যন্ত কেউ করতে পারেননি। পারবেনও না।
তখন ১৯৬৫ সাল, ভারতকে চোখ রাঙাচ্ছে চিন। সঙ্গী পেয়েছে দোসর পাকিস্তানকে। দেশকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচাতে ভারত তৈরি করেছিল জাতীয় নিরাপত্তা তহবিল। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী হায়দরাবাদে গিয়েছিলেন। নিজামকে অনুরোধ করেছিলেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা তহবিলে কিছু দান করার জন্য। লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর কাছ থেকে সব জেনে, মিটি মিটি হাসতে হাসতে কৃপণ নিজাম নিজের সেক্রেটারিকে ডেকেছিলেন। একটা কাগজে উর্দুতে কী একটা লিখে সেক্রেটারিকে দিয়েছিলেন।
[caption id="attachment_207394" align="aligncenter" width="1011"]
নিজের প্রাসাদে নিজাম।[/caption]
সেক্রেটারি সাহেব লেখাটা পড়ে চমকে উঠেছিলেন। ভারতের নিরাপত্তা তহবিলে নিজাম ওসমান আলি দান করেছিলেন সামান্যই। মাত্র পাঁচ টন সোনা। এর সঙ্গে নগদে দিয়েছিলেন ৭৫ লক্ষ টাকা। চমকে গিয়েছিল বিশ্ব। নিজামের দেওয়া পাঁচ টন সোনা, এখনও পর্যন্ত ভারতের জাতীয় কোষাগারে দান হিসাবে দেওয়া সবচেয়ে বড় অর্থরাশি। কত টাটা, বিড়লা, অম্বানী, আদানি, মিত্তাল এলেন ও গেলেন, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনও ব্যক্তি তো বটেই, কোনও প্রতিষ্ঠানও এতো পরিমাণ সম্পদ ভারতের সুরক্ষা খাতে দান করার বুকের পাটা দেখাতে পারেননি।
একদা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও সবচেয়ে সঞ্চয়ী ব্যক্তি নিজাম মীর উসমান আলি একাধারে কুবের ও বিশ্বকর্মা ছিলেন। এই মানুষটি তাঁর রাজ্যের বাজেটের ১১% শিক্ষা খাতে ব্যয় করতেন। তাঁর রাজ্যে প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। গরীবদের জন্য ছিল নিখরচায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থাও। নিজের রাজ্যের বাইরেও, ভারত ও বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তিনি বিশাল অঙ্কের টাকা অনুদান হিসেবে পাঠাতেন।
সেই প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে ছিল জামিয়া নিজামিয়া, দারুল উলুম দেওবন্দ, আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি, এমনকি বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিও ছিল। তাঁর তৈরি করা ওসমানিয়া ইউনিভার্সিটি আজ ভারতের অন্যতম বৃহৎ ইউনিভার্সিটি। প্রচুর স্কুল, কলেজ, অনুবাদ কেন্দ্র নিজের হাতে গড়ে তুলেছিলেন কৃপণ নিজাম সাহেব।
[caption id="attachment_207401" align="aligncenter" width="612"]
লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর সঙ্গে নিজাম।[/caption]
বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিকে নিজামের ডোনেশন দেওয়া নিয়ে একটি মজার গল্প আছে। এক হাড়কাঁপানো শীতের রাতে, নিজাম কাঁপতে কাঁপতে তাঁর আর্দালিকে কম্বল কিনে আনতে বলেছিলেন। চুড়ান্ত মিতব্যয়ী নিজাম বলে দিয়েছিলেন কম্বলের দাম ২৫ টাকার বেশি হওয়া চলবে না। তাঁর আর্দালি ২৫ টাকার কম্বল না পেয়ে ফিরে এসেছিলেন। কারণ কম্বলের দাম দোকানি চেয়েছিলেন ৩৫ টাকা।যাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ শুনলে ভির্মি খান রাজারাজড়ারা, সেই নিজাম বাহাদুর, আর্দালির মুখে কম্বলের দাম শুনে পুরোনো কম্বল গায়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন।
কয়েক ঘন্টা পরে, সকালে উঠেই তিনি বার্তাবাহকের মাধ্যমে বিকানীরের মহারাজার একটি অনুরোধ পেয়েছিলেন। বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে হিন্দু ছাত্রদের জন্য কিছু সাহায্যের অনুরোধ। একটুও না ভেবে, নগদে এক লাখ টাকা বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন নিজাম। সেই নিজাম, যিনি গতরাত্রে দশ টাকা দাম বেশি হওয়ায় নিজের জন্য একটি কম্বল কেনেননি।
নিজাম ওসমান গনি ভারতের তৎকালীন সব রাজা মহারাজাদের চেয়ে সব বিষয়েই এগিয়ে ছিলেন। আজ দিল্লিতে যে ঐতিহ্যশালী হায়দরাবাদ হাউসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করেন, সেই প্যালেসটি কিন্তু নিজামের অর্থে বানানো। তাঁর জমানায় তিনি হায়দরাবাদ শহরে তৈরি করেছিলেন তাক লাগানো কিছু প্রাসাদ। সেগুলির মধ্যে আছে ওসমানিয়া হসপিটাল, হায়দরাবাদ হাইকোর্ট, আসাফিয়া লাইব্রেরি (যেটি এখন পরিচিত স্টেট জেনারেল লাইব্রেরি নামে), টাউন হল (এখন অ্যাসেম্বলি হল নামে পরিচিত), জুবিলী হল, হায়দরাবাদ মিউজিয়াম (বর্তমানে যেটি স্টেট মিউজিয়াম), নিজামিয়া অবজারভেটরি ছাড়াও অগনিত প্রাসাদ ও মনুমেন্ট।
হায়দরাবাদ স্টেটের মারাঠাওয়াড়া অঞ্চলে কৃষিক্ষেত্রে গবেষণার হাতে খড়ি নিজাম সাহেবের হাতেই হয়েছিল। ১৯১৮ সালে পারভানিতে প্রথম পরীক্ষামূলক ফার্ম গড়ে তুলেছিলেন নিজাম। ১৯৪১ সালে নিজাম নিজের ব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নাম দিয়েছিলেন হায়দরাবাদ স্টেট ব্যাঙ্ক। বর্তমানে যার নাম স্টেট ব্যাঙ্ক অফ হায়দরাবাদ। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ায় হায়দরাবাদই ছিল একমাত্র স্টেট, যাকে ব্রিটিশরা নিজস্ব কারেন্সি নোট ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছিল। নিজামের মুদ্রার নাম ছিল, ‘ওসমানিয়া সিক্কা‘। নোটের নামে ছিল, ‘হায়দ্রাবাদি রুপি।
[caption id="attachment_207398" align="aligncenter" width="660"]
নিজামের ডেকান এয়ারওয়েজ-এর বিমানের সামনে লাঠি হাতে নিজাম।[/caption]
বিমানের শখও ছিল নিজামের। ‘হায়দরাবাদ এরো ক্লাব’ এবং বেগমপেট এয়ারপোর্ট প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজাম তিনি ১৯৩০ সালে। এই বেগমপেট এয়ারপোর্ট বিমানবন্দর থেকে আকাশে উড়েছিল ব্রিটিশ ভারতের প্রথম ব্যবসায়িক এয়ারলাইনস 'ডেকান এয়ারওয়েজ'– এর ন্যাশনাল ও ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইট গুলি। 'ডেকান এয়ারওয়েজ' -এর মালিক ছিলেন নিজাম সাহেব।
বিশ্বের ধনীতম মানুষটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আরেকটি বিখ্যাত কাহিনী শুনলে অবাক হবেন। ভারতীয় নিরাপত্তা তহবিলে দেওয়ার জন্য, পাঁচ টন স্বর্ণমুদ্রায় ভর্তি ট্রাঙ্কগুলি যখন ভ্যানে লোড করা হচ্ছিল। কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়ানো নিজাম সাহেব ভুরু কুঁচকে তাঁর নিজস্ব অফিসারদের বলেছিলেন, "আমি কিন্তু পাঁচ টন স্বর্ণমুদ্রাই শুধু দান করেছি। ট্রাঙ্কগুলি নয়। খেয়াল রেখ, ট্রাঙ্কগুলি যেন আমার কাছেই ফেরত আসে।”