রূপাঞ্জন গোস্বামী
আমাজনের অরণ্য। নামটা শুনলেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। ঘন ও দুর্ভেদ্য জঙ্গলের ভেতরে ঘুরে বেড়ায় ব্ল্যাক প্যান্থার আর জাগুয়ারের দল। জলাভূমিতে গিজগিজ করে কুমির আর গ্রিন অ্যানাকোন্ডা। নদীর জলে মৃত্যুদূত হয়ে ওঁত পাতে ইলেকট্রিক ইল আর পিরানহা মাছ। গাছের ডালপালায় জাল পেতে রাখে বিষাক্ত ট্যারেন্টুলা মাকড়সা। দক্ষিণ আমেরিকার ৯ টি দেশের, ৫৫ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রয়েছে বিশ্বের এই বৃহত্তম রেনফরেস্ট। যার বুক চিরে অ্যানাকোন্ডার মতই এঁকেবেঁকে এগিয়েছে আমাজন নদী। একদম বিরল জাতের প্রাণী, উদ্ভিদ ও পতঙ্গদের বাসভূমি এই আমাজন অরণ্য। যাদের মধ্যে বেশিরভাগ প্রজাতিই আমাজন ছাড়া বিশ্বের অন্য কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না।
[caption id="attachment_209502" align="aligncenter" width="768"]

আমাজন অরণ্যের বুক চিরে এগিয়েছে আমাজন নদী।[/caption]
আমাজনের আদিম জনজাতিদের নিয়ে কাজ করে ব্রাজিলের একটি সরকারি সংস্থ 'ফুনাই' (
Fundação Nacional do Índio)। সংস্থাটি জানিয়েছে, আমাজনের গভীরে বাস করে প্রায় ১১৩ টি আদিম উপজাতি। এদের মধ্যে এমন অনেক উপজাতি আছে যাদের কথা পৃথিবী জানে না। যারা সভ্য সমাজ থেকে হাজার হাজার বছর ধরে স্বেচ্ছা-নির্বাসন নিয়ে আছে। যাদের সঙ্গে তথাকথিত সভ্য জগতের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।
এই সমস্ত উপজাতিরা, বাইরের মানুষদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে চায় না। তাদের সঙ্গে জোর করে যোগাযোগ করতে গেলে, পরিণতি হয় ভয়ঙ্কর। তাদের ডেরার কাছাকাছি গেলেই বিষাক্ত তির বা ব্লো-পাইপ থেকে ছুটে আসা শলাকা বিঁধে নিশ্চিত মৃত্যু। এই ১১৩ টি উপজাতির মধ্যে, এখনও পর্যন্ত মাত্র ২৭ টি উপজাতির ছবি তোলা গেছে। বাকি ৮৬ টি উপজাতির উপস্থিতি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে জানা গেলেও, দুর্ভেদ্য জঙ্গলের ভেতরে থাকার কারণে তাদের ছবি তোলা যায়নি।
আমাজনের গভীরে একা বাসকরে এক মানুষ!
ভয়ঙ্কর ও দুর্ভেদ্য আমাজন অরণ্যের কেন্দ্রস্থলে বাস করে একজন মানুষ। সম্পূর্ণ একা। মাঝে মাঝে তাকে গভীর জঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়। আবার কয়েক বছরের জন্য গভীর জঙ্গলের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে নিজের ইচ্ছাতেই সে হারিয়ে যায়। মানুষটির ছবি প্রথম তোলা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। গবেষকরা ব্রাজিলের রোন্দোনিয়া প্রদেশের জঙ্গলে তাকে এক ঝলক দেখতে পেয়েছিলেন। তারপর প্রায় একদশকেরও বেশি সময় ধরে নিঁখোজ ছিল মানুষটি। আবার তাকে দেখতে পাওয়া গিয়েছিল ২০১৯ সালে। নিঃসঙ্গ মানুষটি বেঁচে আছে জেনে ভীষণ খুশি হয়েছিল 'ফুনাই' সংস্থার কর্মীরা। গবেষকরা বলছেন, মানুষটির বয়স পঞ্চাশের আশেপাশে এবং আদিবাসী মানুষটি আমাজনের মত দুর্ভেদ্য জঙ্গলে ২৫ বছর ধরে একা বাস করছে।
[caption id="attachment_209506" align="alignnone" width="768"]

এই সেই নিঃসঙ্গ মানুষটি (এটাই তার মুখের এক মাত্র স্টিল ছবি, যা গবেষকেরা ভিডিও থেকে পেয়েছেন)[/caption]
কেন একা একা থাকে সে!
একদিন তার গোষ্ঠী ছিল। আজ নেই, তাই সে একা। গবেষকরা বলছেন বিংশ-শতাব্দীর শেষ ভাগে আমাজনে সভ্যতার চরম থাবাটি পড়েছিল। জঙ্গলের ভেতর কৃষি জমির সন্ধানে, কাঠ ও সোনার লোভে পালে পালে ঢুকে পড়েছিল সভ্য জগতের মানুষরা। আদিবাসীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছিল জঙ্গলের গায়ে লেগে থাকা কৃষি জমি। নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছিল আদিম জনগোষ্ঠীর মানুষদের। কিছু উপজাতি, আমাজনের আরও গভীরে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। গভীর জঙ্গলে শুরু করেছিল হিংস্র বন্যপ্রাণী ও সাপের সঙ্গে অস্তিত্বের লড়াই।
আদিম জনজাতিদের শেষবারের মতো আক্রমণ করা হয়েছিল ১৯৯৫ সালে। সেই সময় এই রহস্যময় মানুষটির গোষ্ঠীও বহিরাগতদের আক্রমণের মুখে পড়েছিল। তার দলটি ছোট হয়ে গিয়েছিল আগেই। মাত্র ৬ জন ছিল শেষ দলটিতে। তাদের মধ্যে পাঁচজনই মারা পড়েছিল, ভাগ্যবলে বেঁচে গিয়েছিল এই রহস্যময় মানুষটি। আমাজনের বুকে হাজার হাজার বছর ধরে বাস করে আসা এক আদিম উপজাতির আজ সে শেষ প্রতিনিধি। ২৫ বছর ধরে ভয়াল ভয়ঙ্কর আমাজন অরণ্যে একা মৃত্যুর সঙ্গে সংগ্রাম চালিয়ে বেঁচে রয়েছে মানুষটি। কখনও তাকে জঙ্গলের বাইরে আসতে দেখেনি কেউ। মানুষটির ছবি তোলার জন্য বছরের পর বছর জঙ্গলে পড়ে থেকেও, ফটোগ্রাফারেরা তার কোনও ছবি তুলতে পারেননি। একটি ভিডিও তোলা সম্ভব হয়েছিল জঙ্গলে রেখে আসা ক্যামেরায়। সেই ভিডিও থেকেই স্টিল ছবি বের করে মানুষটিকে আজ নিয়ে গবেষণা চালাচ্ছেন গবেষকরা।
[caption id="attachment_209507" align="aligncenter" width="1024"]

আমাজন অরণ্যের বুকে সভ্য জগতের এঁকে দেওয়া ক্ষত।[/caption]
কেন তার নাম সুড়ঙ্গ-মানব!
আমাজনের কেন্দ্রস্থলে, প্রায় একশো কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মানুষটি সকলের অলক্ষে ঘুরে বেড়ায়। মানুষটিকে ২০১৯ সালে আবার দেখা যাওয়ার পর ফুনাই সংস্থাটি তার গতিবিধির দিকে নজর রেখে চলেছে। ব্রাজিল সরকারের কাছ থেকে সবুজ সংকেত পেয়ে সংস্থাটি জানিয়ে দিয়েছে, কেউ মানুষটির সাথে কথা বলতে বা যোগাযোগ করতে পারবেন না। তাই মানুষটিকে নিয়ে গবেষণা করা অত্যন্ত কঠিন বিদেশি গবেষকদের পক্ষে। কেউ জানে না মানুষটির নাম। তার গোষ্ঠীর নাম। তবে একটা জিনিস জানা গেছে। আমাজন অরণ্যের ভিতর অনেক সুড়ঙ্গ কেটে রেখেছে মানুষটি।
মানুষটি জীবিত আছে কিনা জানতে রহস্যময় এলাকাটিতে গিয়েছিলেন ফুনাই সংস্থাটির কিছু কর্মী। তাঁরা জায়গাটিতে পৌঁছে দেখেছিলেন, সামান্য পাতলা হওয়া জঙ্গলের মধ্যে কয়েকশো গভীর গর্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। গর্তগুলি প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয়নি। কোনও কিছু দিয়ে খোঁড়া হয়েছে। ফুনাইয়ের গবেষকরা মনে করছেন গর্তগুলি হল পশু ধরার ফাঁদ। মানুষটি খাদ্য সংগ্রহের জন্য আদিম পদ্ধতিতে পশুশিকার করে চলেছে। কিন্তু, কিছু গর্ত লম্বালম্বিভাবে সুড়ঙ্গের মত অনেক দূরে চলে গেছে। গবেষকদের মতে বিপদের হাত থেকে বাঁচার জন্য এবং ও ঝড় বৃষ্টির সময় বসবাস করার জন্য, মানুষটি সম্ভবত এই লম্বা সুড়ঙ্গগুলি বানিয়ে নিয়েছে। তাপর থেকে রহস্যময় মানুষটির নাম হয়ে গিয়েছিল 'সুড়ঙ্গ-মানব'।
[caption id="attachment_209511" align="alignnone" width="954"]

জঙ্গলের ভিতর ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সুড়ঙ্গ-মানবের তৈরি করা সুড়ঙ্গ।[/caption]
সারাদিন কী করে কাটায় সুড়ঙ্গ-মানব!
ফুনাই সংস্থাটির কর্মীরা ২০১৯ সালে, আড়াল থেকে দেখেছেন, মানুষটি সারাদিন ধরে, জঙ্গলের ভিতর অক্লান্ত পরিশ্রম করে। আমাজনের একেবারে কেন্দ্রস্থলে আদিম পদ্ধতিতে নিজের প্রিয় সবজি নিজেই চাষ করে। একটা ছোট্ট ঘাসে ছাওয়া কুঁড়ে ঘরও আছে তার। ঘরটির চারদিকে ভুট্টা, পেঁপে গাছের চাষ করেছে সুড়ঙ্গ-মানব। বড় বড় গাছে শিম্পাঞ্জীর দক্ষতায় তরতরিয়ে ওঠে সে। পরনে বস্ত্র বলতে, এক চিলতে পশুর ছাল। জানা গিয়েছে, কঠিন ও ভয়ঙ্কর পরিবেশে আদিম মানবের মতোই মানিয়ে নিয়েছে সুড়ঙ্গ-মানব। সংস্থার কর্মীরা ঘাসের কুঁড়েটির সামনে সুড়ঙ্গ-মানবের তৈরি আদিম যন্ত্রপাতিও দেখতে পেয়েছেন। সেই সব যন্ত্র ব্যবহার করে সুড়ঙ্গ খোঁড়ে, শিকার করে, মাছ ধরে সুড়ঙ্গ মানব।
[caption id="attachment_209512" align="aligncenter" width="660"]

ভিডিওতে ধরা পড়েছে সুড়ঙ্গ-মানবের কাজ করার ছবি।[/caption]
ক’দিন সুরক্ষিত রাখা যাবে সুড়ঙ্গ-মানবকে!
সুড়ঙ্গ-মানবের দিকে এখন সারা বিশ্বের নজর পড়েছে। সুড়ঙ্গ-মানবের ছবি তুলতে পারলেই এখন কোটিপতি হওয়ার সুযোগ। তাই সুড়ঙ্গ-মানবের নিরাপত্তা নিয়ে খুবই চিন্তিত ফুনাই সংস্থাটি। আদিম উপজাতিদের বাঁচাতে ৯০ দশকে আমাজনের কোর এলাকাকে ‘তানারা ইন্ডিজেনাস রিজার্ভ’ নাম দিয়ে সংরক্ষিত করলেও, প্রতি মুহূর্তে সেখানে হানা দিচ্ছে বাইরের মানুষ। তাই সুড়ঙ্গ-মানবকে বাঁচাবার জন্য, তার ঘোরাফেরার এলাকার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে এলাকাটিকে নজরবন্দী করে ফেলা হয়েছে। বসানো হয়েছে নিরাপত্তাকর্মীও। সংরক্ষিত এলাকায় সাধারণের প্রবেশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এককথায় সুড়ঙ্গ-মানবের জন্য তৈরি করা হয়েছে অভয়ারণ্য।
[caption id="attachment_209514" align="aligncenter" width="618"]

আমাজনের একেবারে কেন্দ্রে আছে সুড়ঙ্গ মানবের ঘাসে ছাওয়া কুঁড়ে ঘর।[/caption]
একুশ শতকে এসেও আমাজনের অন্ধকারকে বেছে নিয়েছে সুড়ঙ্গ-মানব। ২০০০০ বছর আগে যে ভাবে বাঁচত তার পুর্বপুরুষ, ২০২০ সালে সে ভাবেই বাঁচছে সুড়ঙ্গ-মানব। সুড়ঙ্গ-মানব ভয় পায় না জাগুয়ার কিংবা অ্যানাকোন্ডাকে। তার ভয় সভ্য জগতের মানুষকে। যারা তার বাবা,মা,ভাই,বোন,স্ত্রী এমনকী দুধের শিশুদেরও মেরে ফেলেছে। যে জমাট ব্যথা বুকে নিয়ে আমাজনের গভীরে ঘুরে বেড়ায় সুড়ঙ্গ-মানব, তা কোনও দিন সভ্য জগত জানতে পারবে না। এক বুক হতাশা আর অভিমান নিয়ে, আমাজন জমাট অন্ধকারে চিরকালের জন্য একদিন হারিয়ে যাবে নিঃসঙ্গ সুড়ঙ্গ-মানব।