
শেষ আপডেট: 9 May 2020 04:48
জোরাবার সিং কাহলুরিয়া[/caption]
লাদাখে সরকার-ই-খালসার পতাকা উড়িয়েছিলেন জোরাবার
লাদাখ তখন শাসন করছিলেন গিয়ালপো (রাজা) সেপাল নামগিয়াল। ১৮৩৪ সালে হিমালয়ের সংকীর্ণ গিরিখাত, উত্তুঙ্গ গিরিপথ ও বরফজমা শৈলশিরা অক্লেষে পার হয়ে, জোরাবার সিং তাঁর ডোগরা ফৌজ নিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন লাদাখ। সুরু নদীর তীর ধরে এগিয়ে চলেছিল জোরাবার সিংয়ের ৫০০০ ডোগরা সেনা। একের পর এক স্থানীয় ফৌজকে হারাতে হারাতে। ডোগরা ফৌজকে থামাতে লাদাখের রাজা সেপাল নামগিয়াল পাঠিয়েছিলেন তাঁর প্রধান সেনাপতিকে।
কিন্তু জোরাবার সিং যেন জ্যোতিষী। শত্রুপক্ষের গতিবিধি আগেই আন্দাজ করে নিয়ে তাঁর ফৌজকে থামিয়ে দিয়েছিলেন কারৎসে এলাকায়। লাদাখে এসে গিয়েছিল হাড়কাঁপানো শীতকাল। লাদাখের রাজা ও সেনাপতি ভেবেছিলেন প্রচণ্ড তুষারপাত ও অমানুষিক ঠান্ডায় কাবু হয়ে দেশে ফিরে গিয়েছে ডোগরা ফৌজ। কিন্তু না, লাদাখেই বসন্তের অপেক্ষায় ছিলেন জোরাবার সিং।
কেটে গিয়েছিল শীত, লাদাখে এসেছিল বসন্ত। অতর্কিতে হানা দিয়েছিল জোরাবারের ডোগরা ফৌজ। দাঁড়িয়ে দঁড়িয়ে হার মেনেছিল অপ্রস্তুত লাদাখি সেনা। ডোগরা রাজ্যের বকলমে শিখ সাম্রাজ্যের দখলে চলে গিয়েছিল লাদাখ। লে শহরের বাইরে জোরাবার বানিয়েছিলেন একটি দুর্গ। তাঁর বিশ্বস্ত ডোগরা সেনাপতি, দালেল সিংয়ের নেতৃত্বে লাদাখে রেখে দিয়েছিলেন ৩০০ ডোগরা সেনা।
[caption id="attachment_218889" align="aligncenter" width="600"]
লে শহরের উপকণ্ঠে আজও আছে জোরাবারের সেই দূর্গ।[/caption]
দখল করেছিলেন গিলগিট আর বালটিস্তান
লাদাখের উত্তর পশ্চিমে এবং কাশ্মীরের উত্তরে আছে বালটিস্তান। বালটিস্তানের সুলতান আহমেদ শাহ মাকপনের পুত্র মুহম্মদ শাহ, ১৮৩৮ সালে, পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে বসেছিলেন। পুত্র মুহম্মদ শাহ সোজা চলে গিয়েছিলেন জোরাবার সিংয়ের কাছে। পিতাকে মসনদ থেকে সরাতে জোরাবার সিংয়ের সাহায্য চেয়েছিলেন। জোরাবার সিং কখনও ভাবেননি তাঁকে ফৌজ নিয়ে কোনওদিন পশ্চিমে যেতে হবে। কিন্তু ডোগরা রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি করার আর একটা সূবর্ণ সুযোগ এসে যাওয়ায়, হাতের লক্ষ্ণী পায়ে ঠেলে দিতে পারেননি জোরাবার। ১৮৩৯ সালের শীতে, বালটিস্তানের দিকে অগ্রসর হয়েছিল জোরাবার সিংয়ের ডোগরা ফৌজ।
অনেকদূর ঠিক পথে গিয়েও, পথ হারিয়ে ফেলেছিল জোরাবার সিংয়ের ফৌজ। ৫০০০ সেনার মধ্যে বরফে জমে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন কয়েক হাজার সেনা। এই অবস্থায় অসহায় ডোগরা ফৌজকে ঘিরে ধরেছিল বালটিস্তানি ফৌজ। কিন্তু ঠিক সময়ে খবর পৌঁছে গিয়েছিল জোরাবার সিংয়ের কাছে। ভোজবাজির গতিতে আরও সেনা নিয়ে রণক্ষেত্রে পৌঁছে গিয়েছিলেন জোরাবার সিং। বালটিস্তানের সেনাদের তছনছ করতে করতে ঢুকে পড়েছিলেন বালটিস্তানের রাজধানী স্কার্দুতে।
[caption id="attachment_218890" align="aligncenter" width="1772"]
বালটিস্তানের স্কার্দু ,এখানেই হানা দিয়েছিল জোরাবারের বাহিনী।[/caption]
আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন বালটিস্তানের সুলতান। শিখ সাম্রাজ্যের অধীনে চলে গিয়েছিল বালটিস্তানও। বালটিস্তানের সিংহাসনে জোরাবার সিং বসিয়েছিলেন সুলতান আহমেদ শাহের পুত্র মহম্মদ শাহকে। এর পরও জম্মু না ফিরে, জোরাবার সিং তাঁর বিশ্বস্ত সেনাপতি ওয়াজির লাখপতের নেতৃত্বে ডোগরা ফৌজকে পাঠিয়েছিলেন আরও পশ্চিমে। ডোগরা ফৌজ দখল করে নিয়েছিল গিলগিটও। বন্দি করেছিল গিলগিটের সুলতানকে। লাদাখ, বালটিস্তানের সঙ্গে ডোগরা রাজ্যের হাতে এসেছিল গিলগিটও। পরে শিখ সম্রাটের অনুরোধে সুলতানকে মুক্তি দিয়েছিলেন জোরাবার সিং।
তিব্বত দখলে ঝাঁপিয়েছিলেন জোরাবার সিং
পুরো কারাকোরাম ও অর্ধেক হিমালয় চলে গিয়েছিল ডোগরাদের দখলে। এবার শুধু তিব্বত দখল করলেই, প্রায় পুরো হিমালয় চলে আসবে ডোগরাদের দখলে। এই অবস্থায়, ১৮৪১ সালে ৬০০০ সেনা নিয়ে লাদাখ হয়ে তিব্বতের পথে অগ্রসর হয়েছিলেন জোরাবার সিং। প্যাংগন লেক (১৪৩০০ফুট) পেরিয়ে থলিং, পুরাং হয়ে কৈলাস ও মানস সরোবরের পথে পশ্চিম তিব্বতে পৌঁছে গিয়েছিল জোরাবারের ফৌজ। যাত্রাপথে মানস সরোবরে পুজো দিয়েছিলেন জোরাবার সিং।
[caption id="attachment_218892" align="aligncenter" width="600"]
মানস সরোবর ও গুরলা মান্ধাতা পর্বতশ্রেণী।[/caption]
পুরাং উপত্যকাকে মানস সরোবর থেকে আলাদা করে রেখেছে গুরলা মান্ধাতা পর্বতশ্রেণী। জোরাবারের ফৌজ গুরলা পাস পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছিল ডোগপা-চা। সেখানে তিব্বতীয় সেনাদের যুদ্ধে হারিয়ে ডোগরা ফৌজ গিয়েছিল আরও দক্ষিণে, তাকালাকোটের কাছাকাছি। মায়ুম পাসের (১৭০০০ ফুট) ওপরে হয়েছিল দ্বিতীয় লড়াই। সাড়ে তিন মাস ধরে প্রবল লড়াই করে, তিব্বতের কাছ থেকে জোরাবার সিং ছিনিয়ে নিয়েছিলেন ৮৮৫ কিলোমিটার এলাকা। রণে ভঙ্গ দিয়েছিল তিব্বতীয় সেনারা। তারা জোরাবার সিংকে ভেবে নিয়েছিল অপদেবতা। যাঁকে হারানো কোনওভাবেই সম্ভব নয়। কারণ তিনি কালা-জাদু জানেন।
তিব্বতে এসে গিয়েছিল ১৮৪১ সালের শীত। কিন্তু এ শীত, তিব্বতের শীত। লাদাখের থেকেও ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী। প্রবল তুষারপাতে, সামনে ও পিছনের পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ডোগরা ফৌজকে ছোবল মেরে চলেছিল তুষার ঝড়। প্রচুর ডোগরা সেনা তুষারক্ষতের কারণে হারিয়েছিলেন আঙুল ও পায়ের পাতা। শরীর গরম রাখতে নিজেদের বন্দুকের কাঠের বাট জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন অনেক ডোগরা সেনা। চেনা আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে তিব্বতীয় ফৌজ,মাতসাং গিরিপথ দিয়ে ফিরে এসে অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়েছিল জোরাবার সিংয়ের অসহায় ডোগরা ফৌজের ওপর। সঙ্গে ছিল চিনা ফৌজ।
[caption id="attachment_218891" align="aligncenter" width="1200"]
বরফ ও তুষার ঝড় এখানেই অবরুদ্ধ করে রেখেছিল ডোগরা ফৌজকে।[/caption]
১৮৪১ সালের ১২ ডিসেম্বর শুরু হয়েছিল টো-ইয়োর ঐতিহাসিক যুদ্ধ
এক সপ্তাহ ধরে প্রায় অনাহারে থাকা ডোগরা ফৌজ 'মা দুর্গা'র শপথ নিয়ে লড়াই শুরু করেছিল। যুদ্ধের প্রথম দিকেই গুলিতে আহত হয়েছিলেন জোরাবার সিং। গুলি লেগেছিল তাঁর ডান কাঁধে। এই অবস্থায় বাম হাতে তরবারি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিব্বতীয় সেনাদের ওপর। কিন্তু নক্ষত্রের গতিতে ছুটে এসেছিল তিব্বতীয় ঘোড়সওয়ারদের বল্লম। বিঁধেছিল জোরাবার সিংয়ের বুকে। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন জোরাবার।
শোনা যায়, কুসংস্কারাচ্ছন্ন তিব্বতীয় সেনারা, মৃত্যুর পর জোরাবার সিংয়ের হৃদপিণ্ড কেটে বের করে নিয়েছিল, পাছে অলৌকিক ক্ষমতাযুক্ত জোরাবার সিং আবার বেঁচে ওঠেন। জোরাবার সিংয়ের মুন্ড নিয়ে যাওয়া হয়েছিল লাসায়। তিব্বতের রাজা আর জনগণকে দেখানোর জন্য। যাঁরা বিশ্বাস করতে বসেছিলেন জোরাবার সিং মানুষ না। যুদ্ধে তাঁকে হারানো, কোনও মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।
[caption id="attachment_218893" align="aligncenter" width="1024"]
জোরাবার সিংয়ের সম্মানার্থে তিব্বতীরা তাকলাকোটে বানিয়েছিল এই স্মৃতিসৌধ।[/caption]
ভাবতেই অবাক লাগে ,এত কিছুর পরেও তিব্বতের মানুষেরা, তাঁদের ইতিহাসের অন্যতম সেরা শত্রুকে সম্মান জানিয়েছিলেন, তাকলাকোটে জোরাবার সিংয়ের একটি স্মৃতিসৌধ বা চোর্তেন বানিয়ে। তাকলাকোটে আজও তা 'সিং-বা' চোর্তেন নামে খ্যাত। আজও সেখানে প্রতিদিন ধূপ দেওয়া হয়। হাজারে হাজারে মানুষ দেখতে আসেন সেই জোরাবারের স্মৃতিসৌধ। বিশ্বের ইতিহাসবিদরা যাঁকে আখ্যা দিয়েছেন ভারতের নেপোলিয়ন।