Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
শয়তান বা কালু বলে আর ডাকা যাবে না! স্কুলের খাতায় পড়ুয়াদের নতুন পরিচয় দিচ্ছে রাজস্থান সরকার‘পাশে মোল্লা আছে, সাবধান!’ এবার শুভেন্দুর বিরুদ্ধে কমিশনে নালিশ তৃণমূলেরWest Bengal Election 2026: বাম অফিসে গেরুয়া পতাকা! মানিকচকে চরম উত্তেজনা, থানায় বিক্ষোভ বামেদেরপয়লা বৈশাখে শুটিং শুরু, যিশুর কামব্যাক—‘বহুরূপী ২’ কি ভাঙবে সব রেকর্ড?‘কেকেআরের পাওয়ার কোচ রাসেল ২৫ কোটির গ্রিনের থেকে ভাল!’ আক্রমণে টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন তারকাবিহারে আজ থেকে বিজেপি শাসন, রাজনীতির যে‌ অঙ্কে পদ্মের মুখ্যমন্ত্রী আসলে নীতীশেরই প্রথম পছন্দঅশোক মিত্তলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইডি, ক'দিন আগেই রাজ্যসভায় রাঘব চাড্ডার পদ পেয়েছেন এই আপ সাংসদ West Bengal Election 2026: প্রথম দফায় ২,৪০৭ কোম্পানি বাহিনী! কোন জেলায় কত ফোর্স?IPL 2026: ভাগ্যিস আইপিএলে অবনমন নেই! নয়তো এতক্ষণে রেলিগেশন ঠেকানোর প্রস্তুতি নিত কেকেআর TCS Scandal: যৌন হেনস্থা, ধর্মান্তরে চাপ! নাসিকের টিসিএসকাণ্ডে মালয়েশিয়া-যোগে আরও ঘনাল রহস্য

যুদ্ধের ময়দানে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সেনাকে তছনছ করে দিয়েছিলেন এই দুঃসাহসী যোদ্ধা

রূপাঞ্জন গোস্বামী সাল ১৬৬৩, বাংলার সুবেদার মীর জুমলা দখল করে নিয়েছিলেন অহমের বেশ কিছুটা অংশ। দখল হয়ে গিয়েছিল রাজধানী গড়গাঁও। অসম্মানজনক ঘিলাঝারিঘাট চুক্তিতে সই করতে বাধ্য হয়েছিলেন অহমরাজ জয়ধ্বজ সিংহ। চুক্তির পরে শোকে ও হতাশায় প্রয়াত হয়েছিলে

যুদ্ধের ময়দানে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সেনাকে তছনছ করে দিয়েছিলেন এই দুঃসাহসী যোদ্ধা

শেষ আপডেট: 16 May 2020 04:30

রূপাঞ্জন গোস্বামী
সাল ১৬৬৩, বাংলার সুবেদার মীর জুমলা দখল করে নিয়েছিলেন অহমের বেশ কিছুটা অংশ। দখল হয়ে গিয়েছিল রাজধানী গড়গাঁও। অসম্মানজনক ঘিলাঝারিঘাট চুক্তিতে সই করতে বাধ্য হয়েছিলেন অহমরাজ জয়ধ্বজ সিংহ। চুক্তির পরে শোকে ও হতাশায় প্রয়াত হয়েছিলেন অহম রাজ। মৃত্যুর আগে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী, ভাই চন্দ্রধ্বজ সিংহকে বলে গিয়েছিলেন, “পারো যদি আমার মাতৃভূমির বুক থেকে এই লাঞ্ছনা সরিয়ে দিও”। গর্জে উঠেছিল অহম শুরু হয়েছিল মুঘলদের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি। লাঞ্ছনা মুক্তির দায়িত্ব পেয়েছিলেন দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধা মধ্য চল্লিশের লাচিত বরফুকন। মাঝারি উচ্চতা ও পেশীবহুল দেহের অধিকারী বরফুকনের হাতে সেদিন স্বর্ণখচিত তরবারি তুলে দিয়েছিলেন রাজা চন্দ্রধ্বজ সিং। অহম রাজের ভেঙে যাওয়া সেনাবাহিনীকে ১৬৬৭ সালে একত্রিত করে, মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন লাচিত বরফুকন। [caption id="attachment_221242" align="aligncenter" width="723"] লাচিত বরফুকন[/caption] ব্রহ্মপুত্রের দুই তীর ধরে এগোতে শুরু করেছিল লাচিতের সেনারা। বাহবাড়ি, কাজালি, সোনাপুর,পানিখাইতি ও তিতামারা, শাহ বুরুজ ও রঙ্গমহল দুর্গ ছিনিয়ে নিয়ে দুরন্ত গতিতে গুয়াহাটির দিকে এগিয়ে চলেছিল লাচিত বরফুকনের গেরিলারা। গুয়াহাটিতে মুঘলদের প্রাণভোমরা ছিল ইটাখুলি দুর্গ। প্রায় দু'মাস ধরে দুর্গটিকে ঘিরে রেখে, ৪ নভেম্বর রাতে  ভয়ঙ্কর আক্রমণ হেনেছিলেন লাচিত। মুঘল সেনাদের রক্তে ভেসে গিয়েছিল ইটাখুলি দুর্গ। মুঘলদের থেকে গুয়াহাটি ছিনিয়ে নিয়েছিলেন লাচিত। লাচিতের নাম পৌঁছে গিয়েছিল ঔরঙ্গজেবের কানে লাচিতের হাতে মুঘল বাহিনীর পরাজয়ের খবর সম্রাট ঔরঙ্গজেব পেয়েছিলেন ১৬৬৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে সম্রাট ঔরঙ্গজেব অম্বরের রাজা রাম সিংকে পাঠিয়েছিলেন গুয়াহাটি দখলের জন্য। দখল করতে না পারলেও যেন নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে আসে মুঘল ফৌজ। ঔরঙ্গজেবের সেনাপতি রাম সিংয়ের নেতৃত্বে মুঘল সেনা রাঙ্গামাটিতে পৌঁছে গিয়েছিল ১৬৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। সেনাবাহিনীতে ছিল প্রায় ৬০০০০ সৈন্য, ১৮০০০ ঘোড়া। নদী পথে পৌঁছেছিল ৪০ টি রণতরী। মুঘলরা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি, লাচিত বরফুকনের গোয়েন্দাবাহিনী তাদের পিছু নিয়েছিল। সব খবর পৌঁছে যাচ্ছিল লাচিত বরফুকনের কাছে। সেই মতো রণকৌশল সাজিয়ে রেখেছিলেন গেরিলা যুদ্ধে পটু লাচিত বরফুকন। তিনি ঠিক করেছিলেন প্রচণ্ড শক্তিশালী মোগল সৈন্যের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে যাবেন না। রাতে অতর্কিতে গেরিলা আক্রমণ চালাবেন। যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন গুয়াহাটিকে। কারণ গুয়াহাটিকে ঘিরে আছে পাহাড়। এলাকায় কোনও বিশাল ময়দান নেই। এরকম জায়গায় লড়াই করতে মুঘল সৈন্যরা একদমই অভ্যস্ত নয়। ফলে মুঘলদের এগোতে হবে ব্রহ্মপুত্র নদী ধরে। লাচিত বরফুকন চাইছিলেন, যুদ্ধ হোক ব্রহ্মপুত্রের জলে। কারণ মুঘলবাহিনী জলযুদ্ধে একেবারেই পটু ছিল না। অন্যদিকে লাচিতের হাতে ছিল জল, জঙ্গল আর পাহাড়ে লড়াতে ওস্তাদ গেরিলা বাহিনী। সেই জন্য লাচিত বরফুকন, রণক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন,সরাইঘাটের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র নদের অতি সংকীর্ণ অংশটিকে। এখানে ব্রহ্মপুত্র মাত্র এক কিলোমিটার চওড়া। নদীবক্ষে মোগলদের ঘায়েল করার সেরা জায়গা। [caption id="attachment_221244" align="aligncenter" width="998"] ব্রহ্মপুত্রের বুকেই হয়েছিল অহম-মুঘল যুদ্ধ।[/caption] লাচিতের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিল মুঘল সেনা স্থলভাগ ধরে গুয়াহাটি দখল অসম্ভব দেখে নদীপথে আঘাত হানার চেষ্টা করেছিল মুঘল সেনারা। ১৬৬৯ সালের মার্চ মাসে,  গুয়াহাটির কাছে এসে পৌঁছেছিল মুঘলরা। মুঘল সেনাধ্যক্ষ রাম সিং পেয়েছিলেন লাচিতের চিঠি। চিঠিতে লেখাছিল “গুয়াহাটি আর কামরুপ মুঘলদের নয়। এখনও সময় আছে প্রাণ নিয়ে পালাও।” শুরু হয়ে গিয়েছিল মুঘল-অহম যুদ্ধ। ব্রহ্মপুত্রের উত্তর তীর ধরে আক্রমণ শুরু করেছিলেন স্বয়ং রাম সিং। লাচিতের সেনা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। উত্তর তীরে ছিলেন আতন বুঢ়াগোহাঁই এবং দক্ষিণ তীরে ছিলেন স্বয়ং লাচিত বড়ফুকন। লাচিতের গেরিলা দলে যোগ দিয়েছিলেন গারো, জয়ন্তীয়া, নাগা সেনারা। তুমুল লড়াই শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই আসামে এসে গিয়েছিল ঘনঘোর বর্ষা। পাহাড়ি বর্ষায় কাবু মুঘল সেনাদের ওপর রাতের অন্ধকারে আক্রমণ হেনে চলেছিল লাচিতের গেরিলা বাহিনী। বিপর্যস্ত রাম সিং একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন লাচিতকে। লিখেছিলেন, “এরকম আক্রমণ কাপুরুষোচিত। এতে যুদ্ধের গরিমা নষ্ট হচ্ছে।” উত্তরে লাচিত লিখেছিলেন, “ভুলে যাবেন না সিংহরা রাতেই আক্রমণ করে।” [caption id="attachment_221247" align="aligncenter" width="1024"] শিবসাগরে স্থাপন করা লাচিত বরফুকনের (তরবারি হাতে) স্ট্যাচু।[/caption] সম্রাট ঔরঙ্গজেব, ১৬৬৯ সালের শুরুতে খবর পেয়েছিলেন তাঁর দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী  লাচিত বরফুকনকে এক ইঞ্চিও পিছু হঠাতে পারেনি। বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খাঁকে সেনা নিয়ে অহম যেতে বলেছিলেন ঔরঙ্গজেব। ১৬৬৯ সালের ৫ আগস্ট, আলাবই পাহাড়ের কাছে লাচিতের সেনা আর মুঘল বাহিনীর মধ্যে হয়েছিল এক ভয়াবহ যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে লাচিতের কয়েক হাজার সেনা নিহত হয়েছিলেন। সেই প্রথম পরাজয়ের নির্মম স্বাদ পেয়েছিলেন লাচিত বরফুকন। গুয়াহাটি দখলের শেষ চেষ্টা শুরু করেছিলেন রাম সিং আলাবই যুদ্ধে জেতার জন্য ঔরঙ্গজেবের কাছ থেকে পুরষ্কার পেয়েছিলেন রাজা রাম সিং। খবর পেয়েছিলেন লাচিত বরফুকন মারাত্মক অসুস্থ। ইটাখুলি দুর্গে তাঁর চিকিৎসা চলছে। গুয়াহাটি দখলের জন্য প্রবল উৎসাহে আক্রমণ শুরু করেছিলে রাম সিং। ১৬৭১ সালের মার্চ মাসে, ব্রহ্মপুত্রের উত্তর তীর ধরে এগিয়ে চলেছিল মুঘলবাহিনী। সুয়ালকুচির কাছে, পদাতিক সেনাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল নৌবাহিনী, তীরন্দাজ ও গোলন্দাজ বাহিনী। অন্যদিকে, আলাবইয়ের যুদ্ধে মুঘলদের কাছে শোচনীয়ভাবে হেরে অহম সেনাদের মনোবল একেবারে শেষ হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর প্রধান সেনাপতি লাচিত বরফুকন ও তাঁর নৌসেনাপতিদের অনেকে গুরুতর অসুস্থ। যুদ্ধের দায়িত্ব ছিল মিরি সান্দিকোর কাঁধে। দুর্বল অহম সেনাদের জল ও স্থলযুদ্ধে হারাতে হারাতে লাচিতের ঘাঁটি আন্ধারউবালির দিকে ক্রমশ এগিয়ে চলেছিল মুঘল সেনারা। ইটাখুলির দুর্গের বিছানায় শুয়ে সব লক্ষ্য রাখছিলেন লাচিত বরফুকন। মুঘল সেনা যখন আন্ধারউবালির কাছে এসে গিয়েছিল, আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারেননি লাচিত। পরাজয় মেনে নিয়ে তাঁর সেনারা তখন পালাতে ব্যস্ত ছিল। অসুস্থ্য শরীরেই রণসাজে সজ্জিত হয়ে নৌকায় উঠেছিলেন লাচিত। পলায়নরত সহযোদ্ধাদের চিৎকার করে বলেছিলেন, "রাজা অহমের সম্মান রাখতে বলেছিলেন। আমি পালিয়ে যাব স্ত্রী পুত্র কন্যাদের কাছে! তোমরা যারা পালিয়ে যাচ্ছ, ফিরে গিয়ে রাজাকে বোলো, তাঁর সেনাপতি যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালায়নি। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ লাচিত বরফুকন লাচিতকে আবার রণাঙ্গনে দেখে পলায়নরত অহম সেনারা ফিরে এসেছিলেন। ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন এক ঐতিহাসিক লড়াইয়ে। লাচিত আবার যুদ্ধে ফিরে এসেছেন শুনে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল মুঘল সেনারা। কামাক্ষ্যা পাহাড়ের কাছে থাকা অমরাজুলিতে হয়েছিল এই ভয়াবহ যুদ্ধ। সারাদিন লাচিতের সেনাদের দেখা পাওয়া যেত না। কিন্তু অন্ধকার নামলেই, ছোট ছোট দ্রুতগামী নৌকা নিয়ে মুঘলদের বিশাল বিশাল রণতরীগুলিতে চিতাবাঘের মতো হানা দিতে শুরু করেছিলেন লাচিত বরফুকন। লাচিতের গেরিলাবাহিনীর বিষাক্ত তির ও গাদা বন্দুকের গুলিতে একে একে ঘায়েল হতে শুরু করেছিল মুঘল সেনারা। কারণ রাতের অন্ধকারে কোনওদিন যুদ্ধ করেনি। এরকমই এক রাতে, নিজের রণতরীতে হুঁকা সেবনরত অবস্থায়, গেরিলাদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন মুঘল নৌ-সেনাধ্যক্ষ মুনাওয়ার খান। নিহত হয়েছিলেন মুঘল সেনার তিন আমীর। [caption id="attachment_221251" align="aligncenter" width="960"] ব্রহ্মপুত্রের বুকে আজ সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে লাচিত ফুকন ও তাঁর গেরিলা বাহিনীর স্ট্যাচু।[/caption] এরপর মনোবল হারিয়ে ফেলেছিল মুঘল সেনারা। লাচিত বাহিনীর আক্রমণের মুখে আর টিকে থাকতে পারেনি। লাচিত বরফুকনের তরবারি বজ্রের মতো আগুন ছড়িয়ে চলেছিল দিনে রাতে। গুয়াহাটি, কামাক্ষ্যা, ইটাখুলি ও অশ্বক্রান্তার মাঝে থাকা ব্রহ্মপুত্রের জলে ভেসেছিল মুঘল রণতরীগুলির ভাঙা কাঠ আর প্রায় চার হাজার মুঘল সেনার মৃতদেহ। ভারতের বুকে সবচেয়ে লজ্জাজনক হার মেনে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়েছিল মুঘল সেনারা। পালাতে থাকা মুঘল সেনাদের পিছন থেকে আঘাত করতে বারণ করেছিলেন লাচিত। লজ্জাজনক পরাজয়ের কলঙ্ক মাথায় নিয়ে, মুঘল সেনাপতি রাম সিংহ, মাথা নিচু করে অসম ছেড়েছিলেন। দিনটি ছিল ১৬৭১ সালের ৭ এপ্রিল। দিল্লি রওনা হওয়ার আগে লিখে গিয়েছিলেন,"আমি থাকা সত্ত্বেও, এমন একজন মানুষের কাছে আমরা হেরে গেলাম, যাকে আঘাত করার সামান্যতম সুযোগও সে আমাদের দেয়নি।"

```