Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
শয়তান বা কালু বলে আর ডাকা যাবে না! স্কুলের খাতায় পড়ুয়াদের নতুন পরিচয় দিচ্ছে রাজস্থান সরকার‘পাশে মোল্লা আছে, সাবধান!’ এবার শুভেন্দুর বিরুদ্ধে কমিশনে নালিশ তৃণমূলেরWest Bengal Election 2026: বাম অফিসে গেরুয়া পতাকা! মানিকচকে চরম উত্তেজনা, থানায় বিক্ষোভ বামেদেরপয়লা বৈশাখে শুটিং শুরু, যিশুর কামব্যাক—‘বহুরূপী ২’ কি ভাঙবে সব রেকর্ড?‘কেকেআরের পাওয়ার কোচ রাসেল ২৫ কোটির গ্রিনের থেকে ভাল!’ আক্রমণে টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন তারকাবিহারে আজ থেকে বিজেপি শাসন, রাজনীতির যে‌ অঙ্কে পদ্মের মুখ্যমন্ত্রী আসলে নীতীশেরই প্রথম পছন্দঅশোক মিত্তলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইডি, ক'দিন আগেই রাজ্যসভায় রাঘব চাড্ডার পদ পেয়েছেন এই আপ সাংসদ West Bengal Election 2026: প্রথম দফায় ২,৪০৭ কোম্পানি বাহিনী! কোন জেলায় কত ফোর্স?IPL 2026: ভাগ্যিস আইপিএলে অবনমন নেই! নয়তো এতক্ষণে রেলিগেশন ঠেকানোর প্রস্তুতি নিত কেকেআর TCS Scandal: যৌন হেনস্থা, ধর্মান্তরে চাপ! নাসিকের টিসিএসকাণ্ডে মালয়েশিয়া-যোগে আরও ঘনাল রহস্য

বাইশ বছর ধরে পাহাড় কেটেছিলেন দশরথ মানঝি, গ্রামকে বাঁচাতে একাই বানিয়েছিলেন রাস্তা

রূপাঞ্জন গোস্বামী বিহা্রের গয়া জেলার মুহরা তহশিলের আতরি ব্লকে আছে পিছিয়ে পড়া প্রত্যন্ত গ্রাম গেহলৌর। গ্রামটিকে পাশের শহর ওয়াজিরগঞ্জ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে মস্ত এক পাহাড়, তারও নাম গেহলৌর। পাহাড় ঘুরে ওয়াজিরগঞ্জ যাওয়ার জন্য গ্রামবাসীকে পা

বাইশ বছর ধরে পাহাড় কেটেছিলেন দশরথ মানঝি, গ্রামকে বাঁচাতে একাই বানিয়েছিলেন রাস্তা

শেষ আপডেট: 19 April 2020 05:17

রূপাঞ্জন গোস্বামী
বিহা্রের গয়া জেলার মুহরা তহশিলের আতরি ব্লকে আছে পিছিয়ে পড়া প্রত্যন্ত গ্রাম গেহলৌর। গ্রামটিকে পাশের শহর ওয়াজিরগঞ্জ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে মস্ত এক পাহাড়, তারও নাম গেহলৌর। পাহাড় ঘুরে ওয়াজিরগঞ্জ যাওয়ার জন্য গ্রামবাসীকে পাড়ি দিতে হয় প্রায় ৫৫ কিলোমিটার পথ। গ্রামের উন্নয়নের পথেও প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল গেহলৌর পাহাড়। তাছাড়া গেহলৌর গ্রামের বাসিন্দারা তথাকথিত নিচু জাতের। তাই বিহারের জাতপাতের রাজনীতি গেহলৌর গ্রামে উন্নয়নকে ঢুকতে দেয়নি। দারিদ্র, অনাহার, বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুকে নিয়তি হিসেবেই মেনে নিয়েছিলেন গ্রামবাসীরা। ছিল না পানীয় জল, ছিল না বিদ্যুৎ, ছিল না স্কুল বা হাসপাতাল। সবচেয়ে কাছের হাসপাতালটির দূরত্ব ছিল প্রায় সত্তর কিলোমিটার। গরুর গাড়িতে করে মূমুর্ষু রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হত, কিন্তু পথেই মারা যেতেন বেশিরভাগ রোগী। [caption id="attachment_210544" align="aligncenter" width="650"] গেহলৌর পাহাড়।[/caption]
তবুও থেমে থাকেনি জীবন,অভিশপ্ত গ্রামটিতে
পাহাড়ের কাঁটা ঝোপের মধ্যে ফুটে থাকা বন্য ফুলের মতোই প্রেম এসেছিল গেহলৌর গ্রামের যুবক দাশু ও যুবতী ফাল্গুনীর জীবনে। দু’জনে ঘর বেঁধেছিল। সন্তানও এসেছিল, পুত্র ভগীরথ এবং কন্যা বাসন্তী। দিনমজুরের কাজ করতেন দশরথ। প্রাগৈতিহাসিক সরীসৃপের মতো গেহলৌর পাহাড় বেয়ে চলে যেতেন পাহাড়ের ওপারে। উচ্চবর্ণদের ক্ষেতে কাজ করে ফিরে আসতেন সন্ধ্যের মধ্যে। দুপুরে দশরথের জন্য খাবার ও জল, পুঁটলিতে বেঁধে নিয়ে পাহাড় বেয়ে উঠে দশরথকে দিয়ে আসতেন ফাল্গুনী। ভীষণ ভয় লাগত তাঁর। পায়ের তলা থেকে খসে যেত আলগা পাথর। অনেক কষ্টে পৌঁছাতেন দশরথের কাছে। ফাল্গুনীকে খাবার আনতে রোজ বারণ করতেন দশরথ, শুনতেন না ফাল্গুনী। সারাদিন মানুষটা না খেয়ে থাকবে! কোন ভোরে ছাতু খেয়ে পাহাড় বাইতে উঠেছিল, সে ছাতু কি আর সারাদিন পেটে থাকে! [caption id="attachment_210545" align="aligncenter" width="750"] গেহলৌর গ্রামে দশরথ মাঝির বাড়ি।[/caption]
১৯৫৯ সালের এক দুপুর
সেদিনও দুপুরের কড়া রোদ আগুন ছিটিয়ে চলেছিল গেহলৌর পাহাড়ের গায়ে। ফাল্গুনীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন দশরথ। ফাল্গুনীর আসতে দেরী হওয়ায় দশরথের মনে সেই শঙ্কা দেখা দিয়েছিল। উৎকণ্ঠা বাড়ছিল তাঁর। ওই তো কে যেন আসছে পাহাড় বেয়ে। না ফাল্গুনী নয়, এসেছিলেন একজন গ্রামবাসী। দশরথের আশঙ্কাই সত্যি হয়েছিল। খাবার নিয়ে আসার সময় ফাল্গুনী পাহাড় থেকে পা পিছলে অনেক নীচে পড়ে গিয়েছিলেন। গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ফাল্গুনীর রক্তাক্ত দেহ। গ্রামে পৌঁছে ফাল্গুনীকে গরুর গাড়িতে তুলে হাসপাতাল নেওয়ার সময় দশরথের কোলে মারা গিয়েছিলেন ফাল্গুনী। ফাল্গুনীর মৃত্যুর পর এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল দশরথের জীবন। রুক্ষ জীবনের একমাত্র ভালবাসাটুকু হারানোর রাগ ও ক্ষোভ গিয়ে পড়েছিল নিস্প্রাণ গেহলৌর পাহাড়ের ওপর। ছাগল বেচে দিয়ে কিনেছিলেন হাতুড়ি আর শাবল। শপথ নিয়েছিলেন, পাহাড়কে আর কোনও গ্রামবাসীর প্রাণ নিতে দেবেন না। যে পাহাড় তাঁর বুক থেকে ফাল্গুনীকে কেড়ে নিয়েছে, নিজের হাতে সেই পাহাড়ের বুক চিরবেন দশরথ। বানাবেন রাস্তা। যাতে গ্রামের মানুষ দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারে। গ্রামের অভিশাপ চিরতরে ঘুচিয়ে দেবেন দশরথ।
গ্রামবাসীরা বলেছিলেন, বউয়ের শোকে পাগল হয়ে গিয়েছে দাশু
ডিনামাইট নেই, পাথর কাটার মেশিন নেই, আর দাশু বানাবে পাথর কেটে রাস্তা। দশরথকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করতেন গ্রামবাসীরা। কিন্তু দশরথের কানে সে সব যেত না। ১৯৬০ সাল, এক ভোরে, সূর্য ওঠার আগে দশরথ নেমে পড়েছিলেন প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের অসম লড়াইয়ে। হাতুড়ির প্রতিটি ঘায়ে, গেহলৌর পাহাড়ের পাথরে দশরথ মাঝির ক্ষোভের ফুলকি ঠিকরে উঠেছিল। হাতুড়ির প্রতিটি ঘা যেন স্ত্রী ফাল্গুনীর মৃত্যুর প্রতিশোধ। গ্রামের লোকেরা খবর পেয়ে মজা দেখতে ভিড় করেছিলেন। দশরথ কোনও দিকে তাকাননি, কারও কথা শোনেননি। দেহের সব শক্তি একত্রিত করে আঘাতের পর আঘাত হেনেই চলেছিলেন পাহাড়ের পাথরে। গা দিয়ে ঝরনা ধারার মত ঘাম গড়াত, গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যেত, মুখে  ফেনা উঠত, হাত ফেটে রক্ত বার হত, তবুও থামতেন না অক্লান্ত দশরথ। তাঁর মনে হত, ফাল্গুনী এর চেয়ে ঢের যন্ত্রণা পেয়েছিল। ফাল্গুনীর সারা দেহের হাড় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল। দিনমজুরির কাজ ছেড়ে দিয়েছিলেন দশরথ। নাওয়া নেই, খাওয়া নেই, ঘুম নেই, উন্মত্তের মত পাহাড় কেটে চলেছিলেন। এরই ফাঁকে গ্রামের মানুষের বিভিন্ন জিনিস পাহাড়ের ওপারে বয়ে দিতেন। এর থেকে যে পয়সা পেতেন তাই দিয়ে কোনও মতে চলত সংসার। [caption id="attachment_210550" align="aligncenter" width="630"] দশরথ মানঝি।[/caption]
রোদ ঝড় বৃষ্টি থামাতে পারেনি দশরথের হাতুড়ি 
গ্রামে দেখা দিয়েছিল ভীষণ খরা। অনেকে গ্রামবাসী গেহলৌর ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। দশরথের বাবা দশরথকে বুঝিয়েছিলেন, তাঁদেরও গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। কিন্তু দশরথ সবাইকে শহরে পাঠিয়ে নিজে রয়ে গিয়েছিলেন গ্রামে। পাহাড়ের পাশেই যে শুয়ে আছে ফাল্গুনী। তাকে ছেড়ে পালাবেন না দশরথ। এভাবে একদিন দু’দিন করে কেটে গিয়েছিল দশ বছর। গ্রামের লোক অবাক হয়ে দেখেছিলেন, পাহাড়ের গায়ে বড় একটা ফাটল বানিয়ে ফেলেছেন দশরথ। ফাটলটা ধীরে ধীরে বাড়ছিল দশরথের হাতুড়ির ঘায়ে। রোদ ঝড় বৃষ্টিতে সবাই যখন থাকতেন ঘরের নিরাপদ আশ্রয়ে, তখনও পাথরে আঘাত হেনে চলত দশরথের হাতুড়ি। এভাবেই কেটে গিয়েছিল বাইশ বছর। [caption id="attachment_210555" align="aligncenter" width="730"] পাহাড় কাটছেন দশরথ মানঝি।[/caption] ১৯৮২ সাল, শেষ পাথরটি কাটার পর দশরথ তীব্র আক্রোশে পাথরটিকে লাথি মেরে গড়িয়ে দিয়েছিলেন ঢালু পথে। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। চোখের জলে ভিজে গিয়েছিল গেহলৌরের আকাশ। নেমেছিল বৃষ্টি। গ্রামের লোক ভিজতে ভিজতেই ছুটে এসেছিলেন খবর পেয়ে। দেখেছিলেন, পাহাড়ের বুক চিরে শুয়ে আছে ৩৬০ ফুট লম্বা ও ৩০ ফুট চওড়া একটি রাস্তা। সেদিন গ্রামবাসীরা কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন দশরথকে। তুমুল উল্লাসধ্বনিতে মুখরিত হয়েছিল সারা গ্রাম। দশরথ কোনও কথা বলেননি। রাতের আকাশে যখন পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছিল, দশরথ গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন পাহাড়ের কোলে থাকা সেই ছোট্ট ডোবাটির ধারে। যেখানে তাঁর প্রিয়তমার চিতা দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল কোনও এক সন্ধ্যায়। গভীর রাতে সবুজ ঘাসে টপ টপ করে ঝরে পড়ছিল দশরথের চোখের জল, ভোরের শিশিরের মত। [caption id="attachment_210556" align="aligncenter" width="928"] পাহাড় কেটে দশরথ মাঝি বানিয়েছিলেন এই রাস্তা।[/caption] সম্রাট শাহজাহান বিশ হাজার শ্রমিক দিয়ে, কোটি কোটি স্বর্ণমুদ্রা খরচ করে স্ত্রী মমতাজের জন্য বানিয়েছিলেন ভালবাসার প্রতীক তাজমহল। গেহলৌরের হতদরিদ্র মজুর দশরথ মানঝি, বাইশ বছর ধরে পাহাড় কেটে  প্রিয়তমা ফাল্গুনীর জন্য ভালোবাসার যে অদৃশ্য তাজমহল বানিয়ে গিয়েছেন, ইতিহাসে তার দাম বুঝি শত শত তাজমহলের চেয়েও বেশি।

```