Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
শয়তান বা কালু বলে আর ডাকা যাবে না! স্কুলের খাতায় পড়ুয়াদের নতুন পরিচয় দিচ্ছে রাজস্থান সরকার‘পাশে মোল্লা আছে, সাবধান!’ এবার শুভেন্দুর বিরুদ্ধে কমিশনে নালিশ তৃণমূলেরWest Bengal Election 2026: বাম অফিসে গেরুয়া পতাকা! মানিকচকে চরম উত্তেজনা, থানায় বিক্ষোভ বামেদেরপয়লা বৈশাখে শুটিং শুরু, যিশুর কামব্যাক—‘বহুরূপী ২’ কি ভাঙবে সব রেকর্ড?‘কেকেআরের পাওয়ার কোচ রাসেল ২৫ কোটির গ্রিনের থেকে ভাল!’ আক্রমণে টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন তারকাবিহারে আজ থেকে বিজেপি শাসন, রাজনীতির যে‌ অঙ্কে পদ্মের মুখ্যমন্ত্রী আসলে নীতীশেরই প্রথম পছন্দঅশোক মিত্তলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইডি, ক'দিন আগেই রাজ্যসভায় রাঘব চাড্ডার পদ পেয়েছেন এই আপ সাংসদ West Bengal Election 2026: প্রথম দফায় ২,৪০৭ কোম্পানি বাহিনী! কোন জেলায় কত ফোর্স?IPL 2026: ভাগ্যিস আইপিএলে অবনমন নেই! নয়তো এতক্ষণে রেলিগেশন ঠেকানোর প্রস্তুতি নিত কেকেআর TCS Scandal: যৌন হেনস্থা, ধর্মান্তরে চাপ! নাসিকের টিসিএসকাণ্ডে মালয়েশিয়া-যোগে আরও ঘনাল রহস্য

অসমের দুঃসাহসী যোদ্ধা লাচিত বরফুকন, সরাইঘাটের যুদ্ধে তছনছ করে দিয়েছিলেন মুঘলদের

রূপাঞ্জন গোস্বামী ১৬৬১ সালে  বাংলার সুবেদার মীর জুমলা অহম রাজত্বের রাজধানী গড়গাঁও সহ বেশ কিছুটা অংশ অধিকার করে নিয়েছিলেন।মুঘলদের সঙ্গে ১৬৬৩ সালে ঘিলাঝারিঘাট চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিলেন অহমরাজ জয়ধ্বজ সিংহ। চুক্তির কিছু শর্ত ভীষণ অসম্মানজনক ছ

অসমের দুঃসাহসী যোদ্ধা লাচিত বরফুকন, সরাইঘাটের যুদ্ধে তছনছ করে দিয়েছিলেন মুঘলদের

শেষ আপডেট: 22 April 2021 06:14

রূপাঞ্জন গোস্বামী

১৬৬১ সালে  বাংলার সুবেদার মীর জুমলা অহম রাজত্বের রাজধানী গড়গাঁও সহ বেশ কিছুটা অংশ অধিকার করে নিয়েছিলেন।মুঘলদের সঙ্গে ১৬৬৩ সালে ঘিলাঝারিঘাট চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিলেন অহমরাজ জয়ধ্বজ সিংহ। চুক্তির কিছু শর্ত ভীষণ অসম্মানজনক ছিল, কিন্তু পরিস্থিতির চাপে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন অহমরাজ। মুঘলদের কাছে যুদ্ধে পরাজয় ও অপমানজনক চুক্তির পরে শোকে ও হতাশায় প্রয়াত হয়েছিলেন অহম রাজ জয়ধ্বজ সিং। মৃত্যুর আগে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী, তাঁর খুড়তুতোভাই চন্দ্রধ্বজ সিংহকে বলে গিয়েছিলেন, “পারো যদি আমার মাতৃভূমির বুক থেকে এই লাঞ্ছনা সরিয়ে দিও”। [caption id="attachment_184045" align="alignnone" width="1170"]                                                            অহম রাজত্বের ম্যাপ[/caption]

লাঞ্ছনা মুক্তির দায়িত্ব পেলেন দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধার লাচিত বরফুকন

গর্জে উঠেছিল অহম। শুরু হয়েছিল মুঘলদের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি। নতুন রাজা চন্দ্রধ্বজ সিংহ মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলেন চরাইদিওতে তাই অহম পরিবারে জন্ম নেওয়া দুধর্ষ যোদ্ধা লাচিত বরফুকনকে। সিং তাঁর প্রধান সেনাপতি লাচিত বরফুকনের হাতে সেদিন স্বর্ণখচিত এক তরবারি তুলে দিয়েছিলেন রাজা চন্দ্রধ্বজ। মধ্য চল্লিশের লাচিত বরফুকন কোনও ছবি পাওয়া না গেলেও অহম রাজাদের সরকারি নথিপত্র 'বুরুঞ্জি' থেকে জানা যায়, লাচিত বরফুকনের মুখমন্ডল ছিল গোলাকার, উচ্চতা ছিল, পেশীবহুল দেহের অধিকারী ছিলেন। তাঁর চোখের দিকে কেউ তাকাতে পারত না, এমনই ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব। [caption id="attachment_184043" align="alignnone" width="764"]        অহম রাজাদের সরকারি নথি বুরুঞ্জির তথ্য অনুযায়ী আঁকা লাচিতের ছবি[/caption] মুঘলদের সঙ্গে যুদ্ধের পর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পরাজিত ও হতদ্দ্যম অহম সেনাকে একত্রিত করেছিলেন নতুন সেনাপতি লাচিত বরফুকন। গুয়াহাটির নতুন ফৌজদার ফিরোজ খানের অত্যাচার ও দাবি চরমে ওঠায়, ১৬৬৭ সালের গ্রীষ্মের আগে লাচিত বরফুকনের নেতৃত্বে অহম সেনা মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল।

 মুঘলদের থেকে গুয়াহাটি ছিনিয়ে নিলেন লাচিত বরফুকন

কালিয়াবরে ঘাঁটি স্থাপন করে লাচিতের সেনারা ব্রহ্মপুত্রের দুই তীর ধরে এগোতে শুরু করেছিল। উত্তর তীরে ছিলেন লাচিতের এক সেনাপতি ডেকা ফুকন, দক্ষিণ তীরে আক্রমণের দায়িত্বে ছিলেন নৌসালিয়া ফুকন। জল স্থলে লড়াই করে লাচিত মুঘলদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন বাহবাড়ি, কাজালি, সোনাপুর,পানিখাইতি ও তিতামারা, শাহ বুরুজ ও  রঙ্গমহল দুর্গ। দুরন্ত গতিতে গুয়াহাটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল লাচিতে বরফুকনের ফৌজ। লাচিতের মূল লক্ষ্য ছিল গুয়াহাটিতে মুঘলদের প্রাণভোমরা ইটাখুলি দুর্গটি দখল করা। প্রায় দুই মাস ধরে দুর্গটিকে ঘেরাও করে রেখে এক কড়া শীতের রাতে (৪ নভেম্বর) এক ভয়ঙ্কর আক্রমণ হেনেছিলেন লাচিত। মুঘল সেনাদের রক্তে ভেসে গিয়েছিল ইটাখুলি দুর্গ। নভেম্বরের মাঝামাঝি পতন হয়েছিল ইটাখুলি দুর্গের। লাচিত দখল করেছিলেন গুয়াহাটি, সঙ্গে দখল করেছিলেন মুঘলদের প্রচুর অস্ত্র, অর্থ ও অনান্য যুদ্ধ সামগ্রী। কিছুদিন পর আবার আক্রমণ চালিয়েছিল মুঘলরা। কিন্তু লাচিতের বাহিনী আবার মুঘল আক্রমণ প্রতিহত করেছিল। বন্দি করে ফেলেছিল গুয়াহাটির মুঘল ফৌজদার ফিরোজ খানকে। [caption id="attachment_184052" align="alignnone" width="1000"]   আজও সযত্নে আছে মুঘলদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত কামান[/caption]

লাচিতকে হারাতে ঔরঙ্গজেব পাঠালেন রাজা রাম সিংকে

সম্রাট ঔরঙ্গজেব মুঘল বাহিনীর পরাজয়ের খবর পেয়েছিলেন ১৬৬৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর। ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে অম্বরের মির্জা রাজা রাম সিংকে পাঠিয়েছিলেন গুয়াহাটি পুনরুদ্ধারের জন্য, নাহলে যেন নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে আসে মুঘল ফৌজ।  ২৭ ডিসেম্বর অহম জয়ের উদ্দেশ্যে দিল্লি থেকে এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন মোগল সেনাপতি রাম সিং। মুঘল সেনা রাঙ্গামাটিতে পৌঁছে গিয়েছিল ১৬৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। রাম সিংয়ের সেনাবাহিনীতে ছিল ঔরঙ্গজেবের দেওয়া ৪০০০ সৈন্য, সম্রাটের নিজের নিয়োগ করা ১৫০০ আহাদি সৈন্য, ৫০০ বরকন্দাজ,৩০০০০ পদাতিক সৈন্য, ২১ রাজপুত সেনাপতি, ১৮০০০ ঘোড়সওয়ার, ২০০০ তিরন্দাজ ও ৪০ টি রণতরী। এছাড়া মোগল পক্ষে যোগ দিয়েছিল কোচবিহারের সেনাও। মুঘলরা ঘুণাক্ষরে টের পায়নি, লাচিত বরফুকনের গোয়েন্দাবাহিনী গোপনে তাদের পিছু নিয়েছিল। সব খবর পৌঁছে যাচ্ছিল লাচিত বরফুকনের কাছে। সেই মতো রণকৌশল সাজিয়ে রেখেছিলেন গেরিলা যুদ্ধে পটু লাচিত বরফুকন। [caption id="attachment_184070" align="aligncenter" width="1024"]      শিবসাগরে স্থাপন করা লাচিত বরফুকনের (তরবারি হাতে) স্ট্যাচু[/caption]

লাচিত বরফুকন নিয়েছিলেন এক অসামান্য রণকৌশল

তিনি ঠিক করেছিলেন প্রশিক্ষিত, পেশাদার ও প্রচণ্ড শক্তিশালী মোগল সৈন্যের বিরুদ্ধে লাচিত সম্মুখসমরে যাবেন না। রাতে অতর্কিতে ঝটিকা আক্রমণ চালাবেন। যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন গুয়াহাটিকে। কারণ গুয়াহাটিকে ঘিরে আছে পাহাড়। এলাকায় প্রশস্ত ময়দান নেই। এরকম এলাকায় লড়তে মুঘল সৈন্যরা একদমই অভ্যস্ত নন। ফলে মুঘলদের এগোতে হলে এগোতে হবে গুয়াহাটির পূর্বে থাকা ব্রহ্মপুত্র নদীপথ ধরেই। লাচিত বরফুকন চাইছেন জলযুদ্ধ, কারণ মুঘলবাহিনীর সবচেয়ে দুর্বল জায়গা ছিল তাদের নৌসেনা। অন্যদিকে লাচিতের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর নৌসেনা এবং নদী তীরের জঙ্গল ও পাহাড়ের ওপর থেকে আচম্বিতে আক্রমণ শানানো গেরিলা বাহিনী। তাই লাচিত লড়াইয়ের ময়দান হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন, সরাইঘাটের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র নদের অতি সংকীর্ণ  অংশটিকে। [caption id="attachment_184076" align="aligncenter" width="998"]       ব্রহ্মপুত্রের বুকেই হয়েছিল অহম-মুঘল যুদ্ধ[/caption] এখানে ব্রহ্মপুত্র মাত্র এক কিলোমিটার চওড়া। নদীবক্ষে মোগল আক্রমণকে প্রতিহত করার সেরা জায়গা। কামাখ্যা আর শুক্রেশ্বর পাহাড়ের মাঝে থাকা ধু ধু বালুচর আন্ধারউবালিকে তাঁর ঘাঁটি বানিয়েছিলেন লাচিত। মোগলরা যখন বুঝে গেল পাহাড়ি পথে গুয়াহাটি আক্রমণ করা সুবিধাজনক নয়, তখন তারা ব্রহ্মপুত্র নদীপথে আঘাত হানার চেষ্টা করেছিল।

লাচিতের পাতা ফাঁদে পা দিয়েছিল মোগলরা

১৬৬৯ সালের মার্চ এপ্রিলে মুঘলরা গুয়াহাটির কাছে এসে পৌঁছালে, বন্দি ফৌজদার ফিরোজ খানকে দিয়ে মুঘল সেনাধ্যক্ষ রাম সিংয়ের সঙ্গে কথা চালানোর চেষ্টা শুরু করেছিলেন লাচিত বরফুকন। আসলে এটা ছিল তাঁর সময় নষ্ট করার চেষ্টা।  লাচিত যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হয়ে রাম সিংকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, চিঠিতে লেখা ছিল "গুয়াহাটি আর কামরুপ মুঘলদের নয়।" ফলে শুরু হয়ে গিয়েছিল মুঘল-অহম যুদ্ধ। মুঘল সৈন্য চার ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। ব্রহ্মপুত্রের উত্তর তীর ধরে আক্রমণের দায়িত্বে ছিলেন রাম সিং নিজে।  লাচিতের সেনাও দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। উত্তর তীরে ছিলেন আতন বুঢ়াগোহাঁই এবং দক্ষিণ তীরে ছিলেন স্বয়ং লাচিত বড়ফুকন। লাচিতের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়েছিল গারো, জয়ন্তীয়া, নাগা সেনারা। তুমুল লড়াই শুরু হয়েছিল, দুর্গগুলির ঘন ঘন হাত বদল হচ্ছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই আসামে এসে গিয়েছিল ঘোরতর বর্ষা। পাহাড়ি বর্ষায় কাবু মুঘল সেনার ওপর রাতের আঁধারে আক্রমণ করে তুমুল ক্ষয়ক্ষতি করে রাতের আঁধারেই এলাকা ছেড়ে যাচ্ছিল লাচিতের গেরিলা বাহিনী। কোথা থেকে কখন এসে লাচিত বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়বে এই আতঙ্কে নাওয়া খাওয়া ভুলে গিয়েছিল মুঘল সেনারা। বিপর্যস্ত রাম সিং একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন লাচিতের কাছে, লিখেছিলেন, "এরকম আক্রমণ, কাপুরুষোচিত। এতে যুদ্ধের গরিমা নষ্ট হচ্ছে।" উত্তর দিয়েছিলেন লাচিত, স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন রাজা রাম সিংহ। চিঠিতে লেখাছিল, "ভুলে যাবেন না সিংহরা রাতেই আক্রমণ করে।"

 রাম সিংহ খেলেছিলেন অন্য চাল

তিনি অহম সেনাদের মধ্যে ফাটল ধরাতে অহম শিবিরে খবর পাঠালেন, লাচিতকে তিনি একলক্ষ টাকার বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। লাচিত বরফুকন গুয়াহাটি তাঁর হাতে তুলে দেবে। রাজা চক্রধ্বজ বিশ্বাস করলেও, প্রধানমন্ত্রী আতন বড়গোহাঁই রাজাকে বুঝিয়েছিলেন এটা মুঘলদের রণকৌশল। লাচিত বড়ফুকনের মতো মহান  দেশপ্রেমিক কজন হয়! ইতিমধ্যে  অহমের রাজসিংহাসনে পালাবদল হয়েছিল।রাজসিংহাসনে বসলেন উদয়াদিত্য সিং। ১৬৬৯ শুরুতে  ঔরঙ্গজেব খবর পেয়েছিলেন তাঁর সেনাপতি রাম সিং অহম সেনাপতি লাচিত বরফুকনকে এক ইঞ্চিও টলাতে পারেননি। বাংলার সুবেদার শায়েস্তা খানকে ঔরঙ্গজেব বলেছিলেন রাম সিংকে আরও বাহিনী দিয়ে সাহায্য করতে। ১৬৬৯ সালের ৫ আগস্ট  আলাবই পাহাড়ের কাছে উভয়পক্ষের মধ্যে হয়েছিল এক ভয়াবহ যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ১০০০০ অহম সেনা নিহত হয়েছিল। সেই প্রথম পরাজয়ের নির্মম স্বাদ পেয়েছিলেন লাচিত বরফুকন। [caption id="attachment_184116" align="aligncenter" width="203"]          মির্জা রাজা রাম সিং[/caption]

রাম সিংয়ের লক্ষ্য এবার গুয়াহাটি দখল 

আলাবই যুদ্ধে জেতার জন্য ঔরঙ্গজেবের কাছ থেকে পুরষ্কার পাওয়া রাজা রাম সিংর গুয়াহাটি দখলের শেষ চেষ্টা শুরু করেছিলেন। কারণ তাঁর কাছে খবর ছিল লাচিত বরফুকন অসুস্থ হয়ে ইটাখুলি দুর্গের রোগশয্যায়। ১৬৭১ সালের মার্চ মাসের শুরুতে প্রবল উৎসাহে আক্রমণ শুরু করেছিলেন মুঘল সেনাপতি রাম সিং। ব্রহ্মপুত্রের উত্তর তীর দিয়ে এগিয়ে চলেছিল মুঘলরা। সুয়ালকুচিতে পদাতিক মুঘলবাহিনীর সঙ্গে এসে যোগ দিল জাহাজ, তীরন্দাজ ও গোলন্দাজ বাহিনী। আলাবইয়ের যুদ্ধে মুঘলদের কাছে শোচনীয়ভাবে হেরে অহম সেনাদের মনোবল একেবারে শেষ হয়ে গিয়েছিল। তার ওপর প্রধান সেনাপতি লাচিত বরফুকন ও তাঁর নৌসেনাপতিদের অনেকে গুরুতর অসুস্থ। যুদ্ধে দায়িত্ব এখন মিরি সান্দিকোর কাঁধে।  দুর্বল অহম সেনাদের জল ও স্থলযুদ্ধে হারাতে হারাতে আন্ধারউবালির দিকে ক্রমশ এগিয়ে আসছিল মুঘল সেনারা। ইটাখুলির দুর্গের বিছানায় শুয়ে সব লক্ষ্য করছিলেন লাচিত বরফুকন।

জীবনের শেষ যুদ্ধে নামলেন অসুস্থ লাচিত বরফুকন

মুঘল সেনা যখন আন্ধারউবালির কাছে এসে গেল, আর শুয়ে থাকতে পারলেন না লাচিত। স্থল ও জলে থাকা সমস্ত অহম সেনাকে মুঘলদের ওপর মারণ আঘাত হানতে বললেন। কিন্তু পরাজয় মেনে নিয়ে অহম সেনারা তখন পালাতে ব্যস্ত ছিল।  লাচিত বরফুকন তখন নিজের জন্য সাতটি নৌকা সাজাতে বললেন। নৌকায় উঠে বলেছিলেন,"রাজা আমাকে মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বলেছিলেন, আর আমি পালিয়ে যাব স্ত্রী পুত্র কন্যাদের কাছে? তোমরা যারা পালিয়ে যাচ্ছ, ফিরে গিয়ে রাজাকে বোলো তাঁর সেনাপতি যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালায়নি।" নিজের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে, মহাদেবকে স্মরণ করে মহাবিক্রমে জীবনের শেষ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন বীরশ্রেষ্ঠ লাচিত বরফুকন। লাচিত বরফুকনের আবেগ বিহ্বল ভাষণে পলায়নরত অহম সেনারা উদ্দীপ্ত হন এবং না পালিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন এক অসমসাহসী লড়াইয়ে।  অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন অহম সেনাপতি লাচিত আবার যুদ্ধে ফিরে এসেছেন শুনে ভয় পেয়ে যায় মুঘল সেনারা। [caption id="attachment_184088" align="alignnone" width="660"]       জোড়হাটে আছে লাচিত বরফুকনের স্মৃতিসৌধ[/caption]

কামাক্ষ্যা পাহাড়ের কাছে থাকা অমরাজুলিতে হয়েছিল এই ভয়াবহ যুদ্ধ

ব্রহ্মপুত্রর বুকে আড়াআড়িভাবে নৌকা সাজিয়ে ব্যুহ রচনা করে অসুস্থ শরীর নিয়ে সুবিশাল মুঘলবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন লাচিত। অল্পসংখ্যক ও বিশ্বস্ত কিছু অহম গেরিলা নিয়ে ছোট ছোট দ্রুতগামী নৌকা নিয়ে আক্রমণ করলেন মুঘলদের সুবিশাল রণতরীগুলিকে। রাতের অন্ধকারে মুঘল শিবিরে চিতাবাঘের মতো হানা দিতে থাকলেন লাচিত বরফুকন, তাঁর গেরিলাবাহিনীর বিষাক্ত তির ও গাদা বন্দুকের গুলিতে একে একে ঘায়েল হতে লাগল মুঘল সেনারা। মুঘল নৌ-সেনাধ্যক্ষ মুনাওয়ার খান হুঁকা সেবনরত অবস্থায় নিহত হলেন পিছন থেকে আসা গুলিতে। মুঘল তিন সেরা আমীরও নিহত হলেন লাচিতের চকিত আক্রমণে। লাচিত বরফুকনের তরবারির সামনে কচুকাটা হতে লাগল আতঙ্কিত ও নেতা হারিয়ে মনোবল হারানো মুঘলসেনারা। গুয়াহাটি, কামাক্ষ্যা, ইটাখুলি ও অশ্বক্রান্তার মাঝে থাকা ব্রহ্মপুত্রের জলে জমেছিল মুঘল রণতরীর ভাঙা কাঠ আর ৪০০০ মুঘল সেনার মৃতদেহ। [caption id="attachment_184066" align="aligncenter" width="960"]   ব্রহ্মপুত্রের বুকে আজ সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে লাচিত ফুকন ও তাঁর গেরিলা বাহিনীর স্ট্যাচু[/caption] মুঘল রক্তের স্বাদ পাওয়া লাচিতের তরবারির হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে পালাতে শুরু করেছিল মুঘল সেনারা। পালাতে থাকা সেনাকে পিছন থেকে আঘাত করতে বারণ করেছিলেন লাচিত। অহম বীর লাচিত বরফুকনের বিক্রমে ভারতের বুকে সবচেয়ে লজ্জাজনক হার মেনে নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়েছিল মুঘল সেনারা। ১৬৭১ সালের ৭ এপ্রিল মহাপরাক্রমশালী মুঘলসেনাবাহিনীর সবচেয়ে লজ্জাজনক পরাজয়ের দায়িত্ব ও কলঙ্ক মাথায় নিয়ে পরাজিত মুঘল সেনাপতি রাজা রাম সিংহ মাথা নিচু করে অসম ছেড়ে রাঙামাটি চলে যান। সেখান থেকে রওনা দেন দিল্লির দিকে। যাওয়ার আগে লিখে গিয়েছিলেন, " রাজার গৌরব,মন্ত্রীদের গৌরব, সেনাপতিদের গৌরব, দেশের গৌরব, এমন একজন মানুষের কাছে আমরা হেরে গেলাম। আমি থাকা সত্বেও। কারণ,আঘাত হানার জন্য একটা কোনও দুর্বল স্থান বা সুযোগ পেলাম না। "

```