
শেষ আপডেট: 5 December 2023 13:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আইসক্রিমের নামই জানত না তিলোত্তমা। বরফ ছিল বিলাসপণ্য। পানীয়ে দেওয়ার এক টুকরো বরফ আসত হাজার হাজার মাইল রাস্তা পেরিয়ে। এখন যেমন ফ্রিজ খুললেই বরফের কিউব হাতে চলে আসে, তখন তেমন ভাবাই যেত না। বস্টন এবং নিউ ইংল্যান্ডের বিভিন্ন হ্রদ থেকে বরফ তুলে তা দেশে দেশে রফতানি করা হত। ১৮৩৩ সালে বস্টন থেকে প্রথম কলকাতায় পৌঁছয় বরফ। স্বচ্ছ, পরিষ্কার যা সরাসরি পানীয়ে দিয়ে খাওয়া যাবে। এর আগে হুগলির চুঁচুড়া থেকে অপরিষ্কার এক রকম বরফ কলকাতায় আসত বটে, কিন্তু তা খাওয়া যেত না।
১৮৪৩ সালের কথা। দক্ষিণ মুম্বইয়ের অ্যাপোলো রোড, এখন যা শহীদ ভগত সিং রোড, সেখানে একটি ১৬ ফুট লম্বা সাদা গোলাকৃতি ভবন ছিল। ছাদটা গম্বুজের মতো। সেই সময় এই ভবনটিকে বলা হত ‘বম্বে আইস হাউজ’। স্থানীয়রা বলতেন বরফের বাড়ি। প্রায় ১৫০ টন বরফ মজুত করে রাখা যেত ওই ভবনে। বিদেশে থেকে জাহাজে চেপে হাজার হাজার মাইল পেরিয়ে যে বরফ আসত দেশে তা ওই ভবনে জমা করে রাখা হত।
১৮৩০ সাল থেকে ১৮৭০ অবধি ব্রিটিশ ভারতে বরফ ছিল বিলাসের জিনিস। পেয়ালায় পছন্দের পানীয়ে এক টুকরো বরফ মিশিয়ে খাওয়া ছিল বিলাসিতা। সে বড়লোকদের ব্যাপার। উত্তর-পূর্ব আমেরিকা থেকে আমদানি করা হত বরফ। উনিশ শতকে এই বরফের ব্যবসা এতটাই জনপ্রিয় হয় যে সে নিয়ে আস্ত বই লিখেছিলেন জনপ্রিয় ইংরেজ লেখক ডেভিড ডিকেনসন। বইয়ের নাম ‘দ্য নাইটিন্থ সেঞ্চুরি ইন্দো-আমেরিকান আইস ট্রেড।’
কলকাতায় বরফ তো পৌঁছল, কিন্তু তা সংরক্ষণের উপায় কোথায়! ইতিহাস বলে ‘টাস্কানি’ নামে একটি জাহাজে চাপিয়ে ১৮০ টনের মতো বরফ কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। কিন্তু চার মাসের সমুদ্রযাত্রায় অনেক বরফই গলে গিয়েছিল। যদিও কাঠের গুঁড়ো, খড় ভর্তি বাক্সে করে বরফ নিয়ে আসা হচ্ছিল। কলকাতায় সেই বরফ রাখার জন্য বিশেষরকম তাপ নিরোধক ঘরও বানানো হয়।
বরফ এল, তা জনপ্রিয়ও হল বাঙালি বাবুদের কাছে। ব্রিটিশরা আনন্দে কিনে নিল সেই বরফ। শহরের উচ্চবিত্ত বাঙালিরাও বরফ কিনে বেশ নামও কিনল। শহরে তৈরি হল ‘আইস হাউজ’। কলকাতা, বম্বে, মাদ্রাজে ফুলেফেঁপে উঠল বরফের ব্যবসা।
শোনা যায়, মুঘল বাদশারা নাকি ব্যবহার করতেন হিমালয়ের বরফ। তবে তা সংরক্ষণের জন্য বিস্তর খরচ হত। অনেক শ্রমিকও লাগত। হুগলিতেও তৈরি হত বরফ। অগভীর গর্তে জল জমিয়ে বরফ তৈরি করা হত। তবে তা ছিল অপরিষ্কার, খাওয়ার অযোগ্য। স্থানীয় নাম ছিল ‘হুগলি আইস’। তবে সেই দিশি বরফ স্বাদ ও গুণমানে মার্কিন বরফের ধারে কাছে যেতে পারেনি। তাই স্বচ্ছ সুস্বাদু মার্কিন বরফ কলকাতায় এসে পৌঁছলে, তার চাহিদা হয় আকাশছোঁয়া।
ফ্রেডরিক টিউডরই প্রথম ব্রিটিশ ভারতে নিয়ে আসেন ‘আমেরিকান আইস’। টিউডরকে সেই সময় বলা হত আইস কিং। তবে আটলান্টিক ও ভারত মহাসাগর পেরিয়ে ভারতে সেই বরফ নিয়ে আসতে মাস চারেক সময় লেগে যেত। টিউডর তাই সেই সময়েই বরফ সংরক্ষণ করে নিয়ে আসার জন্য নানারকম পদ্ধতির প্রয়োগ করেছিলেন। প্রথমেই চড়া দামে বরফ বেচেননি টিউডর। বাজারটা ধরেছিলেন আগে। এক পাউন্ড বরফের দাম ছিল ১ টাকা। প্রথমে গঙ্গার ধারে, স্ট্র্যান্ডে আর তার পর বর্তমান ব্যাঙ্কশাল কোর্টের ঠিক পশ্চিমে, চার্চ লেনের দিকে মুখ করে তৈরি হয় ‘বরফ ঘর’। আমদানি আর বরফ ঘরে সংরক্ষণেই মন দেন টিউডর। ওজন করে মেপে, প্যাকেট করে সেই বরফ পাঠানো হত শহরের বাবুদের। বেলা বাড়লে যেত শৌখিন সাহেবদের মহলে। শহরের নানা জায়গায় খুচরো বন্টন কেন্দ্রও তৈরি হয় সেই সময়।
এই বরফ আমদানি নিয়ে নানা মজার গল্পও শোনা যায়। ১৮৩৩ সালের ৬ সেপ্টেম্বর নাকি শহরে প্রথম আমেরিকান আইস এসে পৌঁছয়। ১৮০ টন থেকে কমে ১০০ টনের মতো বরফ জাহাজ থেকে নামানো হয়। শহরবাসী এতদিন হুগলির সেই অপরিষ্কার বরফই দেখেছিলেন। এমন দুধসাদা, পরিষ্কার, স্বচ্ছ বরফ খণ্ডগুলো দেখে তাদের আনন্দ আর ধরে না। শোনা যায়, একজন নাকি জাহাজের ক্যাপ্টেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আমেরিকায় বরফ কি গাছে হয়?’
৩০ বছর ধরে আমেরিকা থেকে কলকাতা, বম্বে, মাদ্রাজে বরফ নিয়ে আসতেন টিউডর। রাতে জাহাজ এসে পৌঁছত বন্দরে। বরফ নামিয়ে তা সরাসরি নিয়ে যাওয়া হত কলকাতার বিভিন্ন গুদামে। তবে ধনী অ্যাংলো সমাজই সেই বরফ কিনত। ছাপোষারা শুধু তাকিয়ে দেখেই আনন্দ পেত।
১৮৭৮ সাল নাগাদ এই ব্যবসার মৃত্যুঘণ্টা বেজে যায়। বরফকল তৈরি হতে থাকে এ দেশের বিভিন্ন জায়গায়। জাহাজে করে বরফ আসা বন্ধ হয়ে যায় তিন-চার বছরের মধ্যেই।১৮৮২ সালে কলকাতার আইস হাউজ ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ১৯২০ সালে নষ্ট করে ফেলা হয় বম্বের সেই বরফের বাড়ি। চেন্নাইয়ের বরফ ঘর নষ্ট করা হলেও তা এখন বসত বাড়ি হিসেবেই ব্যবহার করা হয়। বিদেশি বরফের অস্তিত্বই মুছে যায় দেশের প্রেসিডেন্সি শহরগুলো থেকে।