
পুষ্টিবিদ সাহিবা ভরদ্বাজ
শেষ আপডেট: 18 March 2024 17:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডায়েট মানে হল ব্যালান্সড চার্ট। মানে যার শরীরে যতটা সয়, তাকে ঠিক ততটাই খাবার দেওয়া। ডায়েটে যেমন কী খাবেন তা গুরুত্বপূর্ণ, কখন খাবেন ও কতক্ষণ অন্তর খাবেন, তা মেনে চলাও সমান জরুরি। কিটো, ইন্টারমিটেন্ট এই ধরনের ডায়েট এক মাস বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য করতে দেওয়া হয়। অনির্দিষ্ট কালের জন্য নিজের ইচ্ছেমতো এই ধরনের ডায়েট মানা যায় না। আপনি কখন কী খাচ্ছেন, তার উপর নির্ভর করে আপনার ওজন বাড়বে না কমবে। ভুল সময়ে (Meal Timing) ঠিক খাবার খেলে কিন্তু লাভের চেয়ে ক্ষতির আশঙ্কাই বেশি। সব খাবার সব সময়ে হজমও হয় না। তাই কোন সময়ে কী খাবেন, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকাটা একান্ত প্রয়োজনীয়। ডায়েট ঠিক কেমন হবে? শরীর, খাবার অভ্যাস সব মিলিয়ে কোন ডায়েটে কেমন উপকার হবে, কী কী নিয়ম মানতে হবে, কোনটা জরুরি আর কোনটা নয়, সেসব নিয়ে দ্য ওয়ালের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করলেন পুষ্টিবিদ সাহিবা ভরদ্বাজ।
বি.ফিট লাইফস্টাইলের কর্ণধার সাহিবা ‘দিল্লি ক্যাপিটালস ক্রিকেট অ্যাকাডেমি’-র নিউট্রিশন পার্টনার। জি-ক্যাফেতে ডায়েট নিয়ে তাঁর টক শো-ও খুব হিট করে এক সময়। সাহিবা বলছেন, প্রতিটা মানুষের ক্ষেত্রে এক ডায়েট প্ল্যান কাজ করতে পারে না। আপনি কখন ঘুমোতে যান, কখন ওঠেন ঘুম থেকে, সারাদিনের রুটিন কেমন, তার উপরেও অনেক কিছু নির্ভরশীল।
সকালবেলা ব্রেকফাস্টের সময় বেশি করে কর্বোহাইড্রেট খাওয়া উচিত – এর পোশাকি নাম কার্ব লোডিং। সূর্যাস্তের পর থেকে ক্যালোরি খরচের হার এমনিতেই কমতে থাকে, তাই রাতের দিকে ভারী কিছু না খাওয়াই ভাল। নির্ধারিত সময়ে খেলে আপনার শরীরের স্ট্রেস কম হয়। ফলে শরীর বাড়তি ফ্যাট জমিয়ে রাখে না পরে খরচ করবে বলে।
যাঁরা ব্যায়াম করেন, তাঁরা ওয়ার্কআউটের আগে অতি অবশ্যই খানিকটা প্রোটিন খাবেন, তা ছাতু, ডিম, চিকেন, ছানা যা হোক কিছু হতে পারে। ব্যায়াম করার এক-দেড় ঘণ্টা আগে প্রোটিন খেলে মাসল মাস তৈরিতে তা কাজে লাগে, ফলে আপনি বাড়তি এনার্জি পাবেন ওয়ার্কআউটের সময়। ব্যায়াম শেষ হওয়ার পর ফের অল্প মাত্রায় প্রোটিন আর কার্বোহাইড্রেট খেতে পারেন। একগাদা মাছ, মাংস, ডিম খেয়ে ফেললেই যে প্রচুর পুষ্টি হবে তা নয়। প্রোটিন (Protein) যেমন দরকার, তেমনি প্রোটিনের বাড়াবাড়ি হলে অন্য সমস্যাও দেখা দিতে থাকবে।
এক জন সুস্থ ও স্বাভাবিক ওজনের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ও মহিলাদের ক্ষেত্রে কতটা প্রোটিন দরকার তা শারীরিক অবস্থা, ওজন, উচ্চতা, মেডিক্যাল হিস্ট্রি ইত্যাদি দেখে বলে দিতে পারেন পুষ্টিবিদেরা। তবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের রোজ ৫০-৬০ গ্রাম এবং মহিলার ৭০-৮০ গ্রাম প্রোটিন খাওয়া জরুরি। অন্তঃসত্ত্বা নারী বা যাঁরা সন্তানকে স্তন্যপান করান তাঁদের বেশি পরিমাণে প্রোটিন প্রয়োজন।
কিটোজেনিক ডায়েট প্ল্যানে কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার একেবারেই খাওয়া চলবে না। শর্করার অভাবের কারণে মূলত ফ্যাট বার্ন করেই শরীরের এনার্জির ঘাটতি মিটবে। কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খাওয়া একে বারে বন্ধ করে দিলে শরীর যে বিশেষ মেটাবলিক পর্যায়ে চলে যায় তাকে বলে কিটোসিস। সেই থেকে এই ডায়েটের এমন নাম। সঠিক কিটো ডায়েটে কার্বোহাইড্রেট থাকবে মাত্র ৫ শতাংশ বা তারও কম, ২৫% প্রোটিন এবং ৭০% ফ্যাট জাতীয় খাবার রাখতে হবে ডায়েটে। মিষ্টি জাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। পরিবর্তে পরিমাণ মতো খেতে হবে প্রোটিন এবং বেশি করে ফ্যাট জাতীয় খাবার। ছ'মাস নিয়ম মেনে এই ডায়েট করলে ১০ থেকে ২০ কেজি অবধি ওজন কমানো সম্ভব। তবে নো-কার্বস মানে সব বাদ দিয়ে দেওয়া নয়, পুষ্টিকর খাবার খেতেই হবে।
১৬ ঘণ্টা উপোস থেকে বাকি সময় পেট ভরে খাওয়াই এই ফাস্টিং-এর মূল কথা। দিনে ছয় থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে যা যা খাবার শরীরের জন্য প্রয়োজন, তা খেয়ে নিতে হবে। আর বাকি সময়টা অর্থাৎ, ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা উপোস করে কাটাতে হবে। ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং করার ভাল সময় হল ডিনারের পরে। রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে বাকি সময়টা উপোস দিন। ফলে, ঘুমনোর সময়েই ৭-৮ ঘণ্টা এমনিতেই গ্যাপ হয়ে যাবে। আর সকালে সময় মতো খেলেই হল। ফাস্টিংয়ের পরে বেশি খেয়ে ফেললে চলবে না। অঙ্কুরিত ছোলা, চিকেন, অল্প তেলে রান্না মাছ, স্যালাড, সবজির তরকারি, ডিম খেতে পারবেন। ব্রাউন রাইস খেলে বেশি ভাল হয়। তবে ফাস্টিং হঠাৎ করে শুরু করা উচিত নয়, কার শরীর কতটা নিতে পারবে সেটা জেনে বুঝেই এই ডায়েট দেন পুষ্টিবিদরা।
আজকাল তো ঘরে ঘরে সুগার-কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিসের রোগীরা কী কী খাবেন? ডায়াবেটিস মানেই সবকিছু বাদ দিতে হবে এমনটা নয়। ডায়াবেটিসে কী কী খাওয়া যায়, আর কী কী নয়, সে নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা আছে। কার্বোহাইড্রেট একেবারেই বাদ তা নয়। তবে ফাস্ট ফুড, ভাজা খাবার, মিষ্টি খাবার কিংবা অতিরিক্ত নুন রয়েছে যে খাবারে সেখান থেকেই অতিরিক্ত পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ করে শরীর। আর তাই এই সব খাবার একেবারেই এড়িয়ে চলতে হবে।
ডায়াবেটিসের রোগীদের স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ কমাতে হবে। যে সব খাবারের মধ্যে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি যেমন মাখন, ঘি, দুধ, রেড মিট এসব এড়িয়ে চলতে হবে। ডায়াবেটিস হলে সুনির্দিষ্ট ডায়েট ফলো করা উচিত এমনটা নয়। ভাত রুটি সব দুম করা বন্ধ করে দেওয়া এক্কেবারে ঠিক নয়। শরীরে ভাত রুটির মতো একটুও কার্বোহাইড্রেট না গেলে শরীর ঠিকমতো চলতে পারে না। তাই ওগুলোরও প্রয়োজন। ব্যালান্সড ডায়েট করাটাই জরুরি।
চাকরি করেন যে মহিলারা তারা কীভাবে ডায়েট করবেন? সংসার এবং কর্মক্ষেত্রের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে স্বাস্থের দিকে মনোযোগ কম পড়ে, ফলে স্থূলতা, থাইরয়েড, ডায়াবেটিসের মত নানাবিধ শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। ওয়ার্কং ওম্যানদের শরীরের বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। ব্যালান্সড ডায়েটে ব্রেকফাস্টে সিরিয়ালের সঙ্গে প্রোটিন রাখতেও বলা হয়। তাই প্রাতরাশের একটা পদে প্রোটিন রাখতেই হবে। সুতরাং সকালেও নিশ্চিন্তে খেতে পারেন মাছ, মাংস বা ডিম। তবে অবশ্যই তেল-মশলা ছাড়া। যাঁরা নিরামিষ খান, তাঁরা পনির, ছানা খেতে পারেন। ডালিয়ার খিচুরি, কিনোয়া, সুজিও খুব ভাল ব্রেকফাস্ট। মিড-মর্নিংয়ে খেতে পারেন ফল। একটা আপেল বা পেয়ারা ব্যাগে ঢুকিয়ে নেওয়া যেতেই পারে। ডিনারে হাতে গড়া রুটি, ডাল, সব্জি খেতে পারেন। চিকেনের হাল্কা স্ট্যু খেতে পারেন। নিরামিশাষী হলে সয়াবিন, ডাল, পনির খেতে পারেন।
বাচ্চারা জাঙ্ক ফুড খাওয়ার জন্য বায়না করে, কেমন ডায়েট দরকার ছোট থেকে? শিশুর বয়স অনুযায়ী কতটা পুষ্টি দরকার, তা অনেক সময় বুঝতে পারা যায় না। তা ছাড়া, আমাদের অনেক ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে। যেমন- শিশুকে বেশি করে খাওয়ালেই সুস্থ থাকবে এমনটা নয়। আসলে বেশি খাওয়া বা কম খাওয়া নয়। দরকার পর্যাপ্ত পরিমাণ পুষ্টিকর খাবার।
একজন প্রাপ্তবয়স্কের প্রতি কেজি ওজনের জন্য দরকার হয় ১ গ্রাম প্রোটিন। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রোটিনের পরিমাণ একটু বেশি। শিশুদের প্রতি কেজি ওজনের জন্য দরকার হয় ১.২ গ্রাম প্রোটিন। অর্থাৎ শিশুর যদি ৫ কেজি ওজন হয়, তাহলে তার প্রতিদিন দরকার প্রায় ৬ গ্রাম করে প্রোটিন। বাড়ন্ত বয়সে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রোটিন জাতীয় খাবার খেলে শরীরের গঠন এবং বৃদ্ধি ভাল হয়। পরবর্তীকালে শরীর স্বাস্থ্যকর থাকে এবং কোনও রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। তাই একটি শিশুর শরীরে পুষ্টির চাহিদা মেটাতে কী জাতীয় খাবার কতটা পরিমাণে দরকার তা খেয়াল রাখতে হবে তার বাবা-মাকে। ভাজাভুজি, জাঙ্ক ফুড না দিয়ে বাচ্চাদের ফল, সব্জি বেশি করে খাওয়ানো জরুরি। বাড়িতেই বানিয়ে দিন পুষ্টিকর ও মুখরোচক টিফিন, বাচ্চারা জাঙ্ক ফুড আর চাইবেই না।
এই প্রশ্নটা খুবই কমন, অনেকেই জিজ্ঞেস করেন- এমন কোনও ডায়েট আছে কী যাতে এক মাসের মধ্যে ১৫ কেজি ওজন কমিয়ে ফেলা যায়? এই পদ্ধতি একেবারেই স্বাস্থ্যকর নয়। নিয়মমাফিক রোজকার জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়েই ওজন কমাতে হয়। একেবারে দুম করে কয়েক কেজি ওজন কমিয়ে ফেললে শরীরেও তার অনুরূপ বন্দোবস্ত করতে পারে না। ফলে আচমকাই প্রেসার ফল, হার্ট রেট বেড়ে যাওয়া বা হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনাও প্রবল হয়। ওজন কমানোর একমাত্র বিজ্ঞানসম্মতভাব পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং সপ্তাহে অন্তত পাঁচদিন ১ ঘণ্টা করে শরীরচর্চা ও হাঁটাহাঁটি করা দরকার। প্রথমেই রক্তচাপ, হার্টের অবস্থা ও রক্তে শর্করার মাত্রা জেনে নিয়ে তবেই ওজন কমানোর জন্যে শরীরচর্চা ও হাঁটাহাঁটি শুরু করতে হবে। খাওয়াদাওয়ার দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। অনেকে ভাবেন, নিয়মিত শরীরচর্চা করলে যা ইচ্ছে খাবার খাওয়া যায়। কিন্তু জাঙ্ক ফুড বা প্রসেস করা খাবার বা বেশি পরিমাণে ভাজাভুজি খেলে শরীরের যে পরিমাণে মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়, তা শুধু ব্যায়াম করে সারানো সম্ভব নয়।
ডায়েট করলেই হল না, তাতে পুষ্টি উপাদান কতটা আছে সেটাও যাচাই করা দরকার। ডায়েট সকলের ক্ষেত্রে সমান নয়। শরীরচর্চা শুরু করলে সেই মতো ডায়েটও মেনে চলতে হবে। অনেকেই ভাবেন এক্সারসাইজ করতে যা খুশি খাওয়া যায় সেটাও যেমন ভুল, তেমনি অনেকে আবার কম খেতে শুরু করেন। সেটাও ভুল। বয়স, পেশা, রোজকার অভ্যাস, মেডিক্যাল হিস্ট্রি, পরিবারে রোগের ইতিহাস, ইত্যাদি দেখেশুনে যাচাই করে তবে ডায়েট ঠিক করা হয়।