ডক্টর রাজা নাগ
(সিনিয়র কনসালট্যান্ট ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, অ্যাপোলো)
হৃদয়ে ভীষণ চাপ। শ্বাসের গতি কমছে। বুক ধড়ফড়। খিদেটা ঠিকমতো হয় না। ঘুমোতে গেলেই যেন কয়েকমণ বোঝা চেপে বসে বুকে। ঘুম ভাঙলে দমবন্ধ হয়ে আসতে চায়। মাথা ঝিমঝিম, যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সব। হার্ট অ্যাটাক হল না তো! বেশিরভাগ মানুষই ভাবেন হার্ট অ্যাটাক আর হার্ট ফেলিওর এক। আসলে চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, এই দুটি সম্পূর্ণ আলাদা। হার্ট ফেলিওর হল একটা সিনড্রোম। হৃদয়ের বয়স বাড়লে এই সম্ভাবনাও বাড়ে। কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজের মতো হার্ট ফেলিওরও চিন্তার কারণ। আসলে শরীরের বয়স বাড়ে প্রকৃতির নিয়মে। হার্টেরও তো বয়স বাড়ে। তাই নানা সমস্যা মাথা চাড়া দিতে থাকে। তবে সমাধান আছে। সতর্ক থাকা যেমন দরকার তেমনি জীবনযাত্রার ধরনে পরিবর্তনও দরকার। হার্টের বয়স তো থামিয়ে রাখা যাবে না, কিন্তু নিয়ম মানলে গোড়া থেকেই রোগ উপড়ে ফেলা যাবে। হৃদয়ের বয়সজনিত রোগ ও তার থেকে রেহাই পাওয়ার নানা উপায় নিয়ে দ্য ওয়ালের প্রতিনিধি চৈতালী চক্রবর্তীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনায় কলকাতার অ্যাপোলো গ্লেনেগলস হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডক্টর রাজা নাগ।
ইলাস্টিক টিস্যুর মতো বাড়ে-কমে হৃদপেশি, ফাইব্রোসিস হয়
আমাদের হৃদপিণ্ডের যে পেশি থাকে সেগুলি অনৈচ্ছিক পেশি। এদের বলে হৃদপেশি বা কার্ডিয়াক পেশি (Cardiac Muscle) । এই হৃদপেশি সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হয়ে হৃদপিণ্ডে রক্ত সঞ্চালনে বিশেষ ভূমিকা নেয়। এই হৃদপেশির সঙ্কোচন ও প্রসারন কিন্তু মানুষের নিয়ন্ত্রাধীন নয়। তাই হৃদপেশিতে যদি পরিবর্তন আসে তাকে রুখে দেওয়ার ক্ষমতা মানুষের নেই। হার্ট এজিং বা হৃদপিণ্ডের বয়স বাড়লে তার বড় প্রভাব পড়ে এই হৃদপেশিতেই। হার্ট মাসল বা পেশি ফুলে যেতে শুরু করে। মোটা হয়ে যায়। রাবার ব্যান্ডে যেমন ইলাস্টিক থাকে, টানলে বেড়ে যায় আবার ছেড়ে দিলে কমে যায়, হৃদপেশিও ঠিক তেমনই। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর স্থিতিস্থাপকতা নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। ফলে ফাইব্রোসিস বাসা বাঁধতে শুরু করে।

ফাইব্রোসিসের নানা কারণ। এজিংয়ের কারণে হৃদপিণ্ডের কপাটিকা বা হার্ট ভালবগুলো স্টিফ হয়ে যায়। হৃদপেশি ফুলে গিয়ে রক্তপ্রবাহ বাধা পায়। ডাক্তারি ভাষায় বলা হয় ‘অ্যাবনর্মাল থিকেনিং অব হার্ট ভালভ’ । এই কারণে হৃদপেশিতে ফাইব্রোসিস হতে থাকে যাকে কার্ডিয়াক ফাইব্রোসিস বলে। আর যদি দেখা যায়, ক্রনিক হার্টের রোগ রয়েছে বা হৃদপেশি আগে থেকেই দুর্বল তাহলে ফাইব্রোসিস খুব তাড়তাড়ি ধরে যায়।
বুড়ো হয় হার্টের ভালভ, ধমনীতে প্লাক জমে
হার্টের ভালভের বিশ্রাম নেই। হৃদপিণ্ডের কপাটিকা দিনভর রক্ত পাম্প করেই যাচ্ছে। একটানা এই কাজে ত্রুটি তো আসবেই। হৃদপিণ্ডও যন্ত্র। তার কাজ পাম্পিং। সারা শরীরে রক্ত, অক্সিজেন ছড়িয়ে দেওয়ার মতো গুরুদায়িত্ব এই অঙ্গের কাঁধে চাপানো আছে। তাই যদি দিনভর একই কাজ করতে থাকে যেই যন্ত্রেও গড়বড় হবে। বুড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভুলচুকও বাড়বে। তেমনটাই হয় এজিংয়ের ক্ষেত্রে। ভালভের বয়স যত বাড়ে তার রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমতে থাকে।

অনেক সময় ভালভ সরু হয়ে যায়। তাতে ক্যালসিয়াম, কোলেস্টেরল জমতে থাকে। একে বলে হার্টের ক্যালসিফিকেশন। ভালভের সঙ্গে রক্তবাহ ধমনীরও বয়স বাড়ে। তারও ক্ষয় হতে শুরু করে। আমরা যদি দাঁত ব্রাশ না করি তাহলে যেমন দাঁতে প্লাক জমে, ঠিক তেমনি ধমনীতেও প্লাক জমতে থাকে। ধমনীর দেওয়ালের গায়ে ক্যালসিয়াম জমে গিয়ে আটকে থাকে। তখন আরও সমস্যা। রক্তপ্রবাহ কমে যায়। প্লাক যত বড় হতে থাকে, রক্ত প্রবাহ তত কমতে থাকে। এমন চলতে থাকলে আচমকা হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে।
চিনচিনে ব্যথা, বুক ধড়ফড়, ছন্দ হারায় হৃদয়
বুক ধড়ফড় করছে, বয়স্ক ব্যক্তিরা এই কথা হামেশাই বলে থাকেন। বুকে চিনচিনে ব্যথা, কখনও যেন উথালপাথাল হয় হৃদয়। এইসব লক্ষণ এড়িয়ে যাওয়ার নয়। সুস্থ মানুষের হৃদযন্ত্র এক মিনিটে ৭২ বার রক্ত পাম্প করে। একবার পাম্প করা মানেই অক্সিজেন সমৃদ্ধ টাটকা রক্ত সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এবার যদি এই ছন্দ বিগড়ে যায় তাহলে কী হবে? হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দ হয় বাড়বে, না হয় কমবে। ঠিক মতো পাম্প করতে পারবে না। ফলে সারা শরীরে অক্সিজেনযুক্ত রক্তও পৌঁছবে না। ডাক্তারি ভাষায় একে বলে হার্টের রিদমে গণ্ডগোল তথা ‘অ্যারিদমিয়া।’

আসলে হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক ছন্দ বাড়লে বা কমলে তেমন চোখে পড়ার মতো উপসর্গ দেখা যায় না। তাই ব্যাপারটা চট করে বোঝাও যায় না। বুক ধড়ফড় স্বাভাবিক ব্যাপার বলে এড়িয়ে যান অনেকে। কিন্তু গণ্ডগোলটা এই গোড়াতেই। সবসময় যে বয়স্ক ব্যক্তিদের হৃদয় ছন্দ হারাবে তেমনটা নয়, কমবয়সীদেরও হৃদয় বিগড়ে যেতে পারে। যদি কনজেনিটাল বা জন্মগত হার্টের রোগ থাকে বা ৩০-৪০ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাক হয় তাহলে ঝুঁকির কারণ আছে। হৃদস্পন্দন মিনিটে ৭২ বারের পরিবর্তে ১০০ বার বা তাঁর কাছাকাছি হলে ডাক্তারি পরিভাষায় বলে ট্র্যাকিঅ্যারিদমিয়া আর ৬০ বার অথবা তারও কম হলে তাকে বলে ব্রাডিঅ্যারিদমিয়া। হৃদস্পন্দনের হার যদি ৪০-এর নিচে নেমে যায় অথবা ১৫০ হয়ে যায়, তখন হাসপাতালে ভর্তি করার প্রয়োজন পড়ে। যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে রোগীর প্রাণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। একে বলে রিদম ডিসঅর্ডার।
ইস্কিমিয়া হার্ট ডিজিজে এই রিদম ডিসঅর্ডারের ঝুঁকি বাড়ে। তাছাড়া, জন্মগত ত্রুটি, ভালভের এজিং ও করোনারি হার্ট ডিজিজে রিদম ডিসঅর্ডারের সম্ভাবনা বাড়ে।
ঘুমের মধ্যে হঠাৎ দমবন্ধ! বিপদ সঙ্কেত দেয় হার্ট
অনেককেই বলতে শুনবেন, ঘুমের মধ্যে দমবন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঘুম ভাঙলে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়। খিদে কমে যায়। পা ফুলে যায়। ঘুমোনোর সময় শরীরে নানা অস্বস্তি। একটা বালিশে ঘুম আসে না। এগুলোই হল বিপদ সঙ্কেত। হার্ট ফেলিওরের লক্ষণ। এখন প্রশ্ন আসবে হার্ট ফেলিওর কেন হয়? তার নানা কারণ। যদি কখনও হার্ট অ্যাটাক হয়ে থাকে এবং তার পরেও হৃদয়ের উপর নানা অত্যাচার চলতে থাকে তাহলে হার্ট ফেলিওর কেউ ঠেকাতে পারবে না। লাইস্টাইল মডিফিকেশন না হলে হৃদপেশি দুর্বল হবেই, আর হার্ট ফেলিওরের আশঙ্কাও দ্বিগুণ হবে।

এজিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে হার্টের ভালভের রোগ দেখা দিলেও হার্ট ফেলিওরের চান্স বেড়ে যায়। জন্মগতভাবে ভালভের অসুখ থাকলে বা কোনও কারণে সংক্রমণ দেখা দিলেও ভালভ নষ্ট হয়ে গিয়ে এই সমস্যা বাড়ায়। করোনারি আর্টারি ডিজিজও একটা কারণ। হৃদপিণ্ডের পেশিতে অক্সিজেনযুক্ত বিশুদ্ধ রক্ত সরবহার কমে গিয়ে হার্ট ফেলিওরের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। বিভিন্ন ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও একটা বড় কারণ। মদ্যপান, ধূমপান এই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করে।

অনেকেই জিজ্ঞেস করেন হার্ট ফেলিওরের উপসর্গ কী কী। সবচেয়ে আগে যা দেখে বুঝবেন সেটা হল শ্বাসের সমস্যা। ছোট ছোট ঘরোয়া কাজেও যদি হাঁফ ধরে যায় তাহলে সাবধান হতে হবে। ধরুন স্নান করছেন বা ঘর সাফাই করছেন, তাতেই হাঁফ ধরে গেল। এক মগ জল তুলতেও কষ্ট হচ্ছে, তখনই সতর্ক হতে হবে। দিনভর ক্লান্তি, কোনও কাজ করতে ইচ্ছে করছে না, শরীরে জল জমছে, ওজন দ্রুত বাড়ছে, সারাক্ষণ বমি-বমি ভাব এই রোগের লক্ষণ। আরও একটা সিম্পটম্প আছে—পা, পায়ের পাতা ও গোড়ালি ফুলে যাওয়া। অনেকের আবার জন্ডিসও ধরা পড়ে। এই ধরনের সমস্যা দেখা দিলে দেরি না করে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
থেমে থাক বয়স, তারুণ্যে ঝকঝক করুক হৃদয়
ইস্কিমিক হার্ট ডিজিজ বা হার্ট অ্যাটাকের জন্য সব ফ্যাটকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোটাই হল বড় ভুল৷ তা হলে তো শীতের দেশের সব মানুষই হার্ট অ্যাটাকে মারা যেতেন৷ কারণ তাঁদের খাবারে ৯০ শতাংশের মতো ফ্যাট থাকে৷ হৃদয়ের বয়স যদি ধরে রাখতে হয় তাহলে জীবনযাত্রায় অদলবদল করাটা সবচেয়ে আগে জরুরি। রোজ রোজ তেল–ঘিয়ে ঠাসা খাবার খাবেন না ঠিকই, কিন্তু উপকারী ফ্যাট কিছু খেতেই হবে৷ এরা হার্টকে খারাপ করার বদলে রক্ষা করবে৷ যেমন, কাজু, অ্যালমন্ড, আখরোট, ব্রাজিল নাট, সবুজ শাক-সব্জি, নানা রঙের ফল খেতেই হবে। নুন যতটা সম্ভব কম খান। সোডিয়াম ক্লোরাইড অর্থাৎ নুন ছাড়া খাবার খাওয়া মুশকিল। কিন্তু নুনের বাড়তি সোডিয়াম হার্ট ফেলিওর বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যাকে উত্তরোত্তর বেড়ে যায়। নুনের সোডিয়াম রক্তবাহী ধমনীতে জলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ফলস্বরূপ আর্টারিতে বাড়তি চাপ পড়ে। ফলে এক দিকে রক্তচাপ বেড়ে যায়, অন্যদিকে হৃৎপিণ্ডের পেশি বাড়তি চাপের ফলে আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করাই ভাল। অতিরিক্ত ধূমপান, অ্যালকোহলের নেশা হার্ট ফেলিওরের সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেয়। ঘরোয়া কাজ, সিঁড়ি ওঠানামার পাশাপাশি সপ্তাহে অন্তত চার দিন কম করে ১৫–২০ মিনিট জোর কদমে হাঁটুন, তাতেই কাজ হবে। প্রেশার, সুগার, ওবেসিটি ইত্যাদি না থাকলে বছরে অন্তত দু’বার চেকআপ করিয়ে নেওয়া জরুরি। আমি বলব, হার্ট চেকআপে খামতিগুলো ধরা পড়ে। রোগের ঝুঁকি আছে কিনা বোঝা যায়। ইসিজি, ইকোকার্ডিয়োগ্রাম, ট্রেডমিল টেস্ট করিয়ে নেওয়া ভাল। আয়েসি শহুরে জীবনযাপনে অভ্যস্ত হলে একটা কার্ডিয়াক সিটি স্ক্যান করতে পারলে ভাল হয়। হাই প্রেসার থাকলে নিয়মিত প্রেসার মাপা দরকার। সে ক্ষেত্রে বাড়িতে একটা যন্ত্র থাকলে ভাল। তাতে পালস রেটও দেখা যাবে। হার্টের সমস্যা হলে পালস দ্রুত চলতে থাকে। পালস দেখেই আগেভাগে সতর্ক হতে পারবেন।