
শেষ আপডেট: 27 November 2020 13:11
ব্রিটিশ সমাধিক্ষেত্র : রাজবাড়ির সামনের রাস্তা ধরে কাটিগঙ্গার দিকে কিছুটা এগোলেই হাতাবাগানে এই সমাধিক্ষেত্র দেখা যাবে। এই অঞ্চলেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠির বিশাল ভবন, জাহাজঘাটা প্রভৃতি ছিল, বর্তমানে কোনও কিছুর চিহ্ন নেই। পলাশির যুদ্ধের পরে যে সমস্ত ব্রিটিশ আধিকারিক কাশিমবাজারে থাকতেন এটি মূলত তাদের সমাধিস্থান। ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রথম স্ত্রী মেরি ও শিশুকন্যা এলিজাবেথের সমাধি এখানে আছে। এছাড়া প্রখ্যাত হিরে ব্যবসায়ী ও ড্রাগ ইন্সপেক্টর লায়ান প্রাগার (১৭৯৩), দুগাল ক্যাম্পবেল (১৭৮২), ক্যাপ্টেন হার্টি (১৭৮২), ক্যাপ্টেন কার্ক (১৭৮২) প্রবীণ বণিক জন পিচ (১৭৯০) প্রমুখের মোট ১৮টি সমাধি আছে। সমাধিস্থলটি পুরাতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত।
পাতালেশ্বর শিবমন্দির : কাটিগঙ্গার ধারে বিরাট এলাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে পাতালেশ্বর শিব মন্দির এলাকা। মন্দিরের সামনে সম্প্রতি পাহাড়ের মধ্যে মহাদেবের বিশাল মূর্তি (সিমেন্টের) স্থাপিত হয়েছে। মন্দির চত্বরের সামনের সুন্দর উদ্যান পেরিয়ে বিশাল বটগাছের নীচে পাতালেশ্বরের নতুন সুদৃশ্য মন্দির। মন্দিরের চাতাল থেকে খানিকটা নীচে নেমে পাতালেশ্বর শিবের অবস্থান। মন্দিরের ডান দিকে কাটিগঙ্গার তীরে একটি স্থানকে ঘিরে রাখা আছে যেটি সতীবেদি নামে খ্যাত। ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামমোহন রায় এখানে এসেছিলেন কোম্পানির চাকরি নিয়ে। এখানে সতীদাহের বীভৎসতা দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেছিলেন তিনি।
এই বিরাট মন্দির এলাকায় নানা দেবদেবীর মন্দির ও গোশালা আছে। শিবরাত্রি উৎসবে এখানে বড় উৎসব হয় ও কয়েক হাজার মানুষ একসঙ্গে প্রসাদ গ্রহণ করেন। এই মন্দিরকে ঘিরে কাশিমবাজারের এই এলাকাটি সারাবছর জমজমাট থাকে।
আনন্দময়ী কালীবাড়ি : পাতালেশ্বর শিবমন্দিরের বাঁদিকের রাস্তা ধরে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলে প্রথমেই পড়বে একটি প্রাচীন শিবমন্দির। বর্তমানে সংস্কারের পর অন্য রূপ পেয়েছে। আর একটু এগোলেই একটি উঁচু ঢিপির ওপরে রয়েছে অধুনা নির্মিত আনন্দময়ী কালীবাড়ি। এই কালীমন্দির ১৩৮৫ বঙ্গাব্দে নির্মাণ করেছিলেন রবিঠাকুর ওরফে রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। উঁচু জায়গায় মন্দিরে ওঠার সিঁড়ি আছে। সুন্দর মায়ের মূর্তি। মন্দিরে বিভিন্ন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান হয়। মন্দিরের পিছনে নদীর ধারে রয়েছে সতীদাহ ঘাট, শিশু সমাধিস্থল প্রভৃতি। রবিঠাকুরের জন্ম ৪ চৈত্র, ১৩৫৮ সন ও তিরোধান ১ অগ্রহায়ণ, ১৪০১ সন। তাঁর সমাধির ওপর ভক্তরা গাছের নীচে সন্ন্যাসীঘাটায় সমাধিমন্দির করে মূর্তি স্থাপন করেছেন। এই নদীর ধারে একসময় ছিল বিভিন্ন জিনিসের কেনাবেচা, লোকলস্কর-সহ বিদেশি বণিকদের আনাগোনা। আজ কেবল শ্মশানের নিস্তব্ধতা।
কৃপাময়ী কালীবাড়ি : পাতালেশ্বর শিবমন্দিরের সামনে থেকে এক কিলোমিটার পথ গেলেই ভাটপাড়ায় রয়েছে ইতিহাস বিজড়িত কৃপাময়ী কালীমন্দির। মন্দিরটি আধুনিক কালের হলেও মূর্তিটি প্রাচীন। লুপ্ত নেমিনাথ মন্দিরের কাছেই কাটিগঙ্গার ধারে জনৈক সাধক এই দেবীর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে প্রচলিত। কথিত আছে, বর্গি আক্রমণের সময় কাশিমবাজার লাভের আশায় ভাস্কর পণ্ডিত দেবী কৃপাময়ীর পূজা করে ১০৮ নরবলি দিয়েছিলেন। কিন্তু কাশিমবাজার লুঠ করতে ব্যর্থ হয়ে হতাশায় দেবীমূর্তিকে কাটিগঙ্গার জলে ফেলে দিয়েছিলেন। অনেক পরে এই মূর্তি উদ্ধার হলে নতুন করে এই মন্দিরে তাকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। কালীমন্দিরের বিপরীত দিকে একটি শিবমন্দির আছে। দেবীর নিত্যপূজা হয়। কৃপাময়ীদেবীর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কৃষ্ণেন্দ্র হোতা।
কাশিমবাজার ছোট রাজবাড়ি (রায়বাড়ি) : কাশিমবাজারের রায় পরিবারের বিখ্যাত ছোট রাজবাড়িটি বর্তমানে সংগ্রহশালায় রূপান্তরিত। এই বংশ প্রথমে চট্টোপাধ্যায় হিসাবে পরিচিত ছিল, পরে রায় উপাধি পায়। এই বংশের দীনবন্ধু রায় এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে। দীনবন্ধুর পিতা অযোধ্যানারায়ণ চট্টোপাধ্যায় ভগবানগোলা থেকে কাশিমবাজার এসেছিলেন। দীনবন্ধু কাশিমবাজারের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রেশম কুঠির কর্মচারী ছিলেন। দীনবন্ধুর পুত্র জগবন্ধু ও তাঁর পুত্র নরসিংহ প্রসাদ রংপুরের সাইরেন পরগনার জমিদারি ক্রয় করেছিলেন। নরসিংহ প্রসাদের পুত্র নবকৃষ্ণ রায় কৃষ্ণনাথ কলেজের প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন। এই বংশের অন্নদাপ্রসাদ রায় ও আশুতোষ নাথ রায় বহু জনহিতকর কাজ করেছিলেন। আশুতোষের পুত্র কমলারঞ্জনও দানশীল ছিলেন। তিনি রাজা উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর পুত্র প্রশান্ত রায় ও পুত্রবধূ সাবিত্রী রায় প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। তাঁরা রাজবাড়ির সংস্কার করে সেখানে জাদুঘর, অতিথিশালা-সহ রাজবাড়ির স্থাপত্য ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
৩০ টাকার টিকিট কিনে সংগ্রহশালায় প্রবেশ করলে দেখা যাবে রাজবাড়ির বিভিন্ন অংশ। যেমন কুস্তি করার জায়গা, খাসপুকুর, অন্দরপুকুর, বাগান, নাচঘর, সুসজ্জিত ঠাকুরদালান, গোবিন্দ মন্দির, আশুতোষনাথ শিব মন্দির, চণ্ডীমণ্ডপ, লক্ষ্মীঘর, শিবমন্দির, গৃহদেবতা রাধাবল্লভের মন্দির প্রভৃতি। ঠাকুরদালানে এখনও দুর্গাপূজা হয়।
মিউজিয়ামে রাখা আছে তৎকালীন সময়ের নকশা করা পালকি যাতে করে রাজবাড়ির মহিলারা যেতেন বেড়াতে অথবা গঙ্গাস্নানে। বাংলা ইটের তৈরি ৩০ ইঞ্চির দেওয়ালের ঘরে ঢুকলেই ঠান্ডার পরশ পাওয়া যাবে। ৩০০ বছর আগে বিদেশ থেকে আনা বরফি পাথরের মেঝে আজও সমানভাবে উজ্জ্বল। নাচঘরে আয়না, শ্বেতপাথরের টেবিল, ঢাল, তরবারি, প্রদীপদান, ধাতুনির্মিত হরিণ, কামান, ড্রেসিং টেবিল, আলনা, বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। রাজা আশুতোষনাথ রায় ও রাজা কমলারঞ্জন রায়কে দেওয়া সনদ দুটি দেওয়ালে টাঙানো। আছে সেই সময়কার পালঙ্ক, রঙিন ঝাড়লন্ঠন, রং-বেরংয়ের হুঁকো, তাকিয়া। আছে সেদিনের টমটম গাড়ি। এগুলি দেখতে দেখতে মন চলে যায় কয়েক শতক পিছনে। আর আছে কিছু পারিবারিক পোট্রেট। এছাড়াও বহু নৈসর্গিক দৃশ্য আছে যেগুলি এককথায় তুলনাহীন। বহু নামকরা বিদেশি শিল্পীর আঁকা ছবির সম্ভার রয়েছে। চিত্রকলাগুলি সত্যই মনোমুগ্ধকর। একটি মিনার বা গম্বুজ নতুন করে করা হয়েছে। সেখান থেকে পুরো কাশিমবাজার দেখা যাবে। দেখলে মনে হবে সত্যি একটা আলাদা রাজত্ব ছিল।
সত্যজিৎ রায় যখন ‘ঘরে-বাইরে’ চলচ্চিত্রটি তৈরি করছিলেন তখন বিভিন্ন আসবাব ও নানা সামগ্রী কাশিমবাজারের এই রাজবাড়ি থেকে নিয়েই ব্যবহার করেছিলেন। এই রাজবাড়ির রাজকীয় ঐশ্বর্য আবালবৃদ্ধবনিতাকে আকর্ষণ করবে একথা বলাই বাহুল্য।
গল্পের বই বা উপন্যাসে নয়, বাস্তবের রাজবাড়ি দেখতে হলে একবার আসতেই হবে কাশিমবাজারে। দর্শনের সময় সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত। রাজবাড়িতে অতিথি হিসাবে থাকার ইচ্ছে হলে থাকা যেতে পারে রূপকথা গেস্ট হাউসে।
যোগাযোগ : রূপকথা গেস্ট হাউস, কাশিমবাজার রাজবাড়ি (রায়), চলভাষ : ৮৫৮৪০৩৫৬৬৩, ৯৮৩১০৩৪৬৭৭।
কাছেপিঠে আরও নানা জায়গায় বেরিয়ে পড়তে ক্লিক করুন নীচের লাইনে।