
শেষ আপডেট: 22 May 2024 20:51
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এমনিতেই জাতিভিত্তিক সংরক্ষণ নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। কদ্দুর অবধি সংরক্ষণ সঙ্গত বা উচিত, এই নিয়ে নানা মুনির নানা মত। অসংরক্ষিতদের দাবি, সংরক্ষণ ব্যাপারটা পুরোপুরি তুলে দেওয়া হোক। সংরক্ষণের পক্ষে পাল্টা যুক্তি, সমাজে কি জাতি বিভাজন বন্ধ হয়েছে? জাতিবিদ্বেষ, বিশেষ করে নিচু জাতের অজুহাতে বঞ্চনা বা ব্রাহ্মণ্যবাদের শ্রেষ্ঠত্ব, এগুলো কি সমাজ থেকে উঠে গিয়েছে? তাহলে বঞ্চিতরা সংরক্ষণ পাবেন না কেন? সেই আলোচনা আরও বাড়িয়ে আজ কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি রাজাশেখর মান্থা এবং তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চ রায় দিয়েছে, ২০১০ সালের পর পশ্চিমবঙ্গে ইস্যু হওয়া সব 'আদার ব্যাকওয়ার্ড কাস্ট' বা ওবিসি সার্টিফিকেটই বেআইনি। নতুন করে পশ্চিমবঙ্গের অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের ১৯৯৩ সালের আইন অনুসারে তা তৈরি করতে হবে।
কিন্তু ভারতে ওবিসি বা অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বলতে কাদের ধরা হয়?
সংবিধানের ১৫ ধারায় রয়েছে: ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ, জন্মস্থান বা অন্য কোনও মাপকাঠিতে রাষ্ট্র কোনও নাগরিকের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারে না। কিন্তু ওই ধারারই ৪ উপধারা বলছে, রাষ্ট্র চাইলে সামাজিক বা শিক্ষাগতভাবে পিছিয়ে থাকা কোনও তফশিলি জাতি বা তফশিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের নাগরিকের উন্নতিকল্পে বিশেষ উদ্যোগ নিতে পারে। সেইটুকু বৈষম্য থেকে রাষ্ট্রকে আটকানো যাবে না। সেই তালিকায় তফশিলি জাতি ও তফশিলি উপজাতিদের জায়গা শুরু থেকেই ছিল। যার প্রবক্তা ছিলেন সংবিধানের প্রতিষ্ঠাতা বি আর অম্বেদকর।
কিন্তু ওবিসি সম্প্রদায় শুরুতে এই তালিকায় ছিল না। ভারতে ওবিসি সম্প্রদায়কে আলাদা ক্যাটেগরি হিসেবে চিহ্নিত করার শুরু আটের দশকে। ১৯৭৯ সালে তৎকালীন মোরারজি দেশাই সরকার সাংসদ বিন্ধ্যেশ্বর প্রসাদ মণ্ডলের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে দেশের সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে অনগ্রসর শ্রেণিসমূহকে চিহ্নিত করার কথা ঘোষণা করে। কমিশন সেই মত কাজ শুরু করে। ১৯৮০ সালে জমা পড়া সেই কমিশনের রিপোর্ট আজ ইতিহাসে 'মণ্ডল কমিশন রিপোর্ট' বলে পরিচিত। সেই রিপোর্টে বলা হয়, দেশের ৫২ শতাংশ জনসংখ্যাই আদতে অনগ্রসর। চিহ্নিত এরকম অনগ্রসর জাতি ও সম্প্রদায়ের সংখ্যা ৩৭৪৩। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন, মণ্ডল কমিশনের হিসেব অনেকটাই স্বাধীনতার আগের জনগণনা ধরে হিসেব করা হয়েছে। পরে ২০০৬ সালে জাতীয় অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের রিপোর্টে সংখ্যাটা বেড়ে হয় ৫২ শতাংশ। মণ্ডল কমিশন এর ভিত্তিতে তফশিলি জাতি ও উপজাতিদের সঙ্গে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি বা ওবিসিদের জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ দেওয়ার কথা সুপারিশ করে। যাতে সব মিলিয়ে সংরক্ষিত থাকে ৪৯.৫ শতাংশ।
ওবিসিদের বিশেষ করে তাঁদের পেশার ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হয়। দেখা হয় তাঁদের কতটা জমি আছে, ভাগচাষ করেন কিনা, আনাজের ব্যবসায় জড়িত কিনা, গবাদি পশু কতগুলি আছে, এইসব।
তবে কেন্দ্রীয় স্তরে ওবিসিদের জন্য ২৭ শতাংশ সংরক্ষণ জারি হলেও রাজ্যগুলো তাঁদের নিজস্ব নীতিতে ওবিসি নির্ধারণ করে থাকে। অন্ধ্রপ্রদেশে যেমন ওবিসিদের পাঁচটি উপবিভাগে ভাগ করা হয়। ভূমিপুত্র, বিমুক্ত জাতি, যাযাবর বা প্রায়-যাযাবর জাতি, তাঁতি-ছুতোর-কামার-স্বর্ণকার ইত্যাদি পেশায় থাকা লোকজন ও তফশিলি জাতিভুক্ত যারা খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত।
পশ্চিমবঙ্গে যেমন আবার ওবিসিরা দুই ভাগে বিভক্ত। ওবিসি 'এ' এবং ওবিসি 'বি'। ওবিসিদের মধ্যে যারা তুলনামূলকভাবে সামাজিক ও শিক্ষাগতভাবে বেশি পিছিয়ে, তাঁরা রয়েছেন 'এ'-বিভাগে। যারা তুলনামূলকভাবে অগ্রসর, তাঁরা রয়েছেন 'বি' বিভাগে।
এখানে যেটা বলার, ভারতে কিন্তু তফশিলি জাতি হিসেবে কেবলমাত্র হিন্দু, শিখ ও বৌদ্ধদেরই ধরা হতে পারে। মুসলিম ও খ্রিস্টানদের এতে ফেলা হয় না। কারণ এই দুই আব্রাহামিক ধর্মে কোনও জাতিভেদ প্রথা নেই। কিন্তু তফশিলি উপজাতি বা শিডিউলড ট্রাইব হিসেবে কার্যত সব ধর্মের বাসিন্দাদেরই ধরা যেতে পারে, কারণ আদিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতি চালু রয়েছে। উল্টোদিকে, ওবিসিদের মধ্যে জায়গা পান মুসলিম ও খ্রিস্টানরা। তাঁদের জন্য বিভিন্ন রাজ্যে আলাদা হারে সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। রাজ্যের ওবিসি কমিশন এই ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।