
শেষ আপডেট: 13 January 2024 20:36
দ্য ওয়াল ব্যুরো: দক্ষিণ আমেরিকার সুবিশাল অঞ্চল জুড়ে রয়েছে আমাজনের বৃষ্টিঅরণ্য। ব্রাজিলের উত্তর ও পূর্ব অংশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঢেকে রয়েছে এই জঙ্গলে। সবুজে ঢাকা আমাজনের অরণ্যে আজও কত শত রহস্য লুকিয়ে। পৃথিবীর ফুসফুস জ্বালেপুড়ে গেলেও সে আজও নবীন, সবুজের তারুণ্যে তরতাজা। প্রাণি থেকে গাছপালা, নাম না জানা কত প্রজাতি—সবকিছুকেই পরম যত্নে লালন পালন করে এই বৃষ্টিঅরণ্য। ঠিক এমনভাবেই হাজার হাজার বছরের পুরনো সভ্যতাকে এতদিন লোকচক্ষুর অন্তরালে সযত্নে লালন করছিল আমাজনের বৃষ্টিঅরণ্য। ২৫০০ বছর আগের হারিয়ে যাওয়া শহর, তার সভ্যতা-সংস্কৃতি কালের গর্ভে মৃত হলেও, বৃষ্টিঅরণ্যের সবুজের মায়ায় তারা এতদিন সজীবই ছিল। বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক সভ্যতাকে নিজের গর্ভে প্রতিপালন করছিল আমাজন। এবার তারই খোঁজ পেলেন প্রত্নতাত্ত্বিক ও পুরাতত্ত্ববিদেরা।
নিবিড় সবুজের মধ্যে এতদিন লুকিয়ে ছিল সেই জনপদ। ২০১৫ সালে ‘এলআইডিএআর’ তথা ‘লিডার’ সার্ভের (রিমোট সেন্সিং-এর একটি বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি) মাধ্যমে জানা গিয়েছিল আমাজনের বৃষ্টিঅরণ্য কোনও কিছুকে গোপন করছে। যেন বাইরের জগৎ থেকে আড়াল করছে। বৃষ্টিঅরণ্যে মানুষের পা পড়লেও সেই জায়গা ছিল অধরাই। প্রযুক্তির চোখ দিয়ে এবার তাই খুঁজে বের করা হল।
আমাজনের বৃষ্টি অরণ্যের যে অংশটি ইকুয়েডরে রয়েছে সেখানেই খোঁজ পাওয়া গেছে আস্ত এক শহরের। ফ্রান্সের ন্যাশনাল সেন্টার ফর সায়েন্টিফিক রিসার্চের গবেষকরা এই শহরের অস্তিত্ব খুঁজে বের করেছেন। প্রায় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার (৩৮৫ বর্গমাইল) খোঁজ এখনও অবধি পাওয়া গেছে। আন্দিজ পর্বতমালার পাদদেশে উপানো উপত্যকায় লুকিয়ে ছিল এই জনপদ। হাজার হাজার বছর ধরে সভ্য জগতের অন্তরালে।
ফরাসি আর্কিওলজিস্ট স্টিফেন রস্টেইন বলছেন, সেই জনপদও যথেষ্টই আধুনিক ছিল। পাঁচটা বড় শহর একসঙ্গে সংযুক্ত। এক শহর থেকে আরেক শহরের যাওয়ার জন্য রাস্তা রয়েছে। প্রতি শহরে অসংখ্য মাটির বাড়ি, ছোট ছোট কুঁড়েঘর নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে তৈরি হয়েছে। অন্তত হাজার ছয়েক মাটির বাড়ি এখনও অবিকল একই রকম রয়েছে। প্রতিটা বাড়িতে রয়েছে ফায়ারপ্লেস, বড় বড় সেরামিকের কুঁজোয় ভর্তি বিয়ার। বাড়ি শুধু নয় ধর্মীয় উৎসব, অনুষ্ঠানের জন্য বহুতলও তৈরি করা হয়েছিল সেই সময়। এক একটির উচ্চতা প্রায় ৩৩ ফুট। রাস্তাগুলো নাকি এখনকার নিউ ইয়র্ক শহরের মতো।
কখনও সোজা, কখনও আঁকাবাঁকা রাস্তা সংযুক্ত করেছে শহরের প্রতিটা এলাকাকে। স্টিফেন বলছেন, সেই জনপদের মানুষজন খুবই সৌখিন ছিলেন বলেই অনুমান করা হচ্ছে। প্রতিটা বাড়ি, বহুতল সুন্দর করে সাজানো। বাড়ির আকার ও অন্দরসাজেও সৌখিনতার ছোঁয়া পাওয়া গেছে। ওই জনপদে চাষাবাদও হত। অনেকটা জায়গাজুড়ে চাষের জমিরও খোঁজ মিলেছে।

পুরাতত্ববিদরা বলছেন, আমাজনের গহীন অরণ্যে চাপা পড়ে যাওয়া ওই সভ্যতা, কিলামোপে এবং উপানো সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে হুয়াপুলা সংস্কৃতি ওই সভ্যতার উপর প্রভাব বিস্তার করে। বেশ কিছু টিলাও রয়েছে সেখানে। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ থেকে ৩০০ এবং ৬০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেখানে মানুষের বাস ছিল বলে মনে করা হচ্ছে। যে এলাকায় সমীক্ষা চলেছে, তার আশেপাশে আরও পাঁচটি জনপদের অস্তিত্ত্ব ছিল বলেই জানাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। সড়ক পরিবহণ ছিল উন্নত মানের, সবচেয়ে দীর্ঘ সড়কপথের দৈর্ঘ্য ছিল অন্তত ২৫ কিলোমিটার। হারানো এই শহর আরও অনেক রহস্যের জন্ম দেবে বলেই মনে করছেন গবেষকরা।