
শেষ আপডেট: 1 December 2020 08:24
আদতে রাজু ঠক্কর ছিলেন গুজরাটি। কিন্তু কলকাতায় বড় হওয়া তাই বাংলা ভালই বলতে পারতেন, একটা গুজরাটি টান থাকলেও। চুল, দাড়ি, কোঁকড়ানো, কটা চোখের দৃষ্টিতে ভিলেনের জনপ্রিয়তা দাপট সহজেই আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন রাজু।
শুরুটা টলিপাড়ায় জুনিয়র আর্টিস্ট হিসেবে। টালিগঞ্জের স্টুডিওয় সব পরিচালকদের কাছেই নিজের পোর্টফোলিও ছবি দিয়েছিলেন রাজু। তখন তেরো এপিসোডের ধারাবাহিক হত। প্রথম মেগা সিরিয়াল 'জননী' করছেন বিষ্ণু পালচৌধুরী। সেখানেই ভিলেনের রোলে রাজুর ছবি দেখে পছন্দ হয়ে গেল বিষ্ণু পালচৌধুরীর। ডেকে পাঠালেন রাজুকে। অডিশনে সিলেক্টেডও হলেন তিনি।
সুপ্রিয়া দেবী অভিনীত 'জননী'তে সুপ্রিয়া দেবীর সেই দাপটের সঙ্গে টক্কর দিতে হবে নবাগত রাজুকে। রাজুর লুক তাঁকে জিতিয়ে দিল।
'জননী'তে জয় বদলানী করতেন টনি ডিস্যুজা নামে একটা চরিত্র। টনির এক মোহময়ী মেনকা জুলির রোল করেছিলেন সঙ্ঘমিত্রা বন্দ্যোপাধ্যায়। জুলি চরিত্রটি খুবই বিখ্যাত হয়। তার সঙ্গে টনির শাগরেদের একটা চরিত্রে ছিলেন রাজু ঠক্কর। 'জননী' তখন সবার দুপুরের সঙ্গী। তাই বাঙালির ঘরেঘরে অবাঙালি রাজু ভিলেন-রূপে জায়গা করে নিলেন। বিষ্ণু পালচৌধুরীর হাত ধরেই প্রথম জনপ্রিয়তা পেলেন রাজু ঠক্কর। পেলেন লোক পরিচিতি। আর বহু ফিল্মের অফার।
এর পরে অঞ্জন চৌধুরী, বীরেশ চট্টোপাধ্যায়, যীশু দাশগুপ্ত, হরনাথ চক্রবর্তীর অজস্র বাংলা ছবির পরিচালকদের ছবি, সিরিয়ালে ভিলেন মানেই রাজু ঠক্কর ছিলেন অপ্রতিরোধ্য। বিপ্লব চট্টোপাধ্যায় খুব পরিচিত বাঙালি ভিলেন ছিলেন। তার পরবর্তী ভিলেন রূপে রাজুর লুকটা ছিল রীতিমতো আন্তর্জাতিক। তাঁকে দেখলে শিহরিত হতে হত এতটাই ভিলেন লুক ছিল তাঁর।
ওই সময়েই রূপা গাঙ্গুলি অভিনীত 'দ্রৌপদী' সিরিয়ালে ঋষি শুক্রাচার্যর ভূমিকায় রাজু ঠক্কর দুর্দান্ত লুকে অভিনয়ে অবতীর্ণ হন।
পরবর্তীকালে সুযোগ এল বলিউডে। রামগোপাল ভার্মার 'সরকার' ছবিতে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে অভিনয় করার সুযোগ পান রাজু। যা ছিল তাঁর সারাজীবনের স্বপ্নপূরণ। কাজ করেছিলেন সঞ্জয় দত্তর সঙ্গেও। বাংলাতেও রঞ্জিত মল্লিক, প্রসেনজিৎ, চুমকি চৌধুরী, ইন্দ্রাণী হালদার সবার সঙ্গেই ভিলেন রোলে তুখোড় ছিলেন রাজু।
করোনা আবহের মধ্যেও কিছু কাজ করছিলেন। ছবির শ্যুটিং থেকে পাবলিক প্রোগাম। একজন শিল্পী কয়েক দিনই বা ঘরে বসে থাকতে পারেন!
তিনি ভিলেন হলেও করোনা নামক ভিলেনটির কাছে পরাজিত হতে হল তাঁকে। রাজু ঠক্করের মতো লুকের ভিলেন আর সহজে আসবে না টলিউডে এবং কলকাতা শহরে। মেক আপ দিয়ে ভিলেন অনেকেই হন, কিন্তু যে আদতেই আলাদা দেখতে, তাঁর পরিপূরক তো সহজে মেলে না।
'বিদ্রোহ', 'রাখী পূর্ণিমা', 'তবু ভালবাসি', 'মহান', 'ওস্তাদ', 'বাঘবন্দী খেলা' আরো অনেক ছবির খলনায়ক ছিলেন রাজু। 'ফেলুদা সিরিজ' এও কাজ করেছিলেন। ভিলেনের রোল করে টলিউডের সেরা ভিলেন হিসেবে পেয়েছিলেন উত্তমকুমার পুরস্কারও। যেটা ছিল তাঁর জীবনে বড় স্বীকৃতি। কারণ আমাদের দেশে তো নায়কদেরই শুধু স্বীকৃতি দেওয়া হয়!
রাজু ঠক্কর ভিলেন রোলে বিখ্যাত হলেও আদতে মানুষটি ছিলেন খুবই অতিথিপরায়ণ। তাঁর সঙ্গে যারই আলাপ হয়েছে তাঁদেরই মনে আছে রাজুদার আন্তরিকতা। একটা কোমল মনের নিপাট জেন্টলম্যান ছিলেন। সেলিব্রিটি হয়েও ফেসবুকে রোজ সবাইকে জানাতেন গুড মর্নিং। মানুষটি রেখে গেলেন স্ত্রী,পুত্র,কন্যা ও নাতনিদের।করোনা বিধি মেনে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।
একটাই আফশাস, তাঁকে টলিউড বা বলিউড চিরকালই ভিলেনের রোল দিল। একটা অন্যরকম রোল কেউ দিল না। যা হয় একটায় খ্যাতি পেলে সেটাতেই রোল আসতে থাকে, এটাই নিয়ম। অন্যভাবে ভাবার মানুষই তো কম।
যদিও ভিলেন ক'জন পারেন? ভিলেনে তিনি ছিলেন একশোয় দুশো।
কলকাতাকে যে গুজরাটি মানুষটি আপন করে নিয়েছিলেন, বাঙালি না হয়েও বাংলা ছবি করে বাংলার মানুষের ভালবাসা তিনি পেয়েছিলেন। খলনায়কের প্রস্থানেও আজ বাঙালীদের তাই মন খারাপ। টলিউডের অপূরণীয় ক্ষতি। এমন ভিলেন আর আসবে না। শ্রদ্ধা রাজু ঠক্কর।