সবকটি আজ কিংবদন্তি (Uttam Kumar Movies)। সবকটির কাহিনি যেন রূপকথার মতো, অথচ বাস্তবের সঙ্গে মিশে থাকা।

উত্তমকুমারের ৫টি ছবির ৫০ বছর।
শেষ আপডেট: 15 August 2025 13:58
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শোলের ৫০ বছর, হিন্দি ছবির ইতিহাসে এক মাইলফলক। এই সময় জুড়ে হইচই, রেট্রো পোস্টার, নতুন প্রচার— সবই চলছে। কিন্তু আমরা কি মনে রেখেছি, ১৯৭৫ সালে উত্তম কুমারেরও একসঙ্গে পাঁচটি ছবি মুক্তি পেয়েছিল? অগ্নীশ্বর, আমি সে ও সখা, বাঘবন্দির খেলা, অমানুষ এবং সন্ন্যাসী রাজা। সব ক'টি আজ কিংবদন্তি। সবকটি কাহিনি যেন রূপকথার মতো, অথচ বাস্তবের সঙ্গে মিশে থাকা।
উত্তম কুমারের অভিনয়ের বিস্তার, চরিত্রে ডুবে যাওয়ার ক্ষমতা আর প্রজন্মের পর প্রজন্মকে আলোড়িত করা— এই পাঁচ ছবিই তার প্রমাণ। দেখে নেওয়া যাক, কী কী ছবি।
আদর্শবান, জাতীয়তাবাদী, দৃঢ়চেতা চিকিৎসক ডাঃ অগ্নীশ্বর চট্টোপাধ্যায়। তিনি নীচ, স্বার্থসর্বস্ব মানুষও দেখেছেন, আবার নিঃস্বার্থ ভাল মানুষও চিনেছেন। স্ত্রী (মাধবী মুখোপাধ্যায়) মারা যাওয়ার পর ছেলে (পার্থ মুখোপাধ্যায়) আর বৌমার সঙ্গে থেকেও বুঝে যান, তাঁর ব্যক্তিত্ব তাঁদের স্বাভাবিক জীবনকে অস্থির করে তুলছে। একদিন হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। স্বাধীনতার পর সরকার তাঁকে নতুন হাসপাতালের দায়িত্ব দিতে চায়, কিন্তু তিনি তখন গ্রামের এক ছোট্ট ছেলেকে চিকিৎসা করছেন। ভাগ্যের পরিহাসে, ঠিক সেখানেই ঘটে যায় দুর্ঘটনা।
এ ছবির পর্দার বাইরের গল্পও কম আকর্ষণীয় নয়। পরিচালক অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, মাত্র ১৫ সেকেন্ডের এক দৃশ্যের জন্য উত্তম ঘণ্টাখানেক ধরে একা রিহার্সাল করেছিলেন। যেখানে এক রোগী তাঁকে প্রণাম করতে গেলে তিনি বলেন, “আমার মায়ের চেহারাটা ঠিক মনে নেই... তুমি যদি আমার চেয়ে ছোটো না হতে, আমি তোমাকেই প্রণাম করতাম।” এই সংলাপে অগ্নীশ্বরের ভেতরের কঠিন আবরণ ভেঙে কোমল হৃদয় প্রকাশ পায়। এমন সত্যিকারের আবেগের নিখুঁত অভিনয়ের জন্যই ছিল তাঁর এত পরিশ্রম।

দ্বৈত চরিত্রে উত্তম। একজন বড় ভাই, সৎ শিক্ষক। মিথ্যে অপবাদে পাগলা গারদে। আরেকজন ছোট ভাই, প্রথমে অসৎ পথে হলেও পরে মেসোমশাইয়ের তত্ত্বাবধানে ভালো মানুষ হয়ে ডাক্তার। দুই ভাইয়ের গল্প জড়িয়ে যায় বন্ধুত্ব, প্রেম আর নৈতিক দ্বন্দ্বে।
বন্ধুকে অর্থলোভ থেকে ফেরানো, বড় ভাইয়ের অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া— সব মিলিয়ে এই ছবিতে ছিল পারিবারিক আবেগ ও সামাজিক বার্তা। দুই চরিত্রের শরীরী ভাষা, অভিব্যক্তি, সংলাপের ফারাক, সব মিলিয়ে উত্তম কুমারের অভিনয়প্রতিভার এক দুর্দান্ত উদাহরণ।

প্রফুল্ল রায়ের গল্পে পীযূষ বসুর ছবি। উত্তম কুমারের চরিত্র ভবেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। দুর্নীতিগ্রস্ত, চোরাচালানকারী, অনৈতিক ব্যবসায়ী। ছেলে রাজেশ সৎ, কিন্তু বাবার ছায়া থেকে পালাতে পারে না। দ্বিতীয় স্ত্রী বিভা সব চক্রান্ত ফাঁস করে দেয়। পুলিশ আসতেই ভবেশ আত্মহত্যা করে।
নায়কোচিত ইমেজ থাকা সত্ত্বেও এমন এক নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয়— এটাই ছিল উত্তমের সাহস আর বহুমুখিতা।

শক্তি সামন্তের পরিচালনায় শক্তিপদ রাজগুরুর নয়া বসত অবলম্বনে তৈরি এই ছবি বাংলা ও হিন্দি, দুই ভাষাতেই সুপারহিট। মধুসূদন চৌধুরী (উত্তম) বড়লোক কাকার উত্তরাধিকারী, অথচ সরল, গরিবদের বন্ধু। লেখাকে (শর্মিলা ঠাকুর) ভালবাসে। কাকার কর্মচারী মহিম ঘোষালের (উৎপল দত্ত) ষড়যন্ত্রে মিথ্যে মামলায় জেলে যায়। বেরিয়ে দেখে কাকা নেই, সব দখল হয়ে গেছে। মাতনের আশ্রয়, লেখার বিরহ, মদের নেশা— শেষ পর্যন্ত সত্য প্রকাশ পায়, মহিম ধরা পড়ে, আর মধু ফিরে পায় লেখাকে।
এই ছবির শ্যুটিং হয়েছিল সন্দেশখালিতে। সেখানকার স্মৃতি এখনও অনেকের মনে উজ্জ্বল। ১৯৭৪ সালে শ্যুটিং চলাকালীন ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে গিয়েছিল। এক সন্ধ্যায় লঞ্চে ফেরার সময় পথ হারিয়ে ফেলেন উত্তম, পরে হ্যারিকেন হাতে শত শত গ্রামবাসী এসে পৌঁছে দেন। উত্তম কুমারকে এক ঝলক দেখার আনন্দে সেই রাতে গ্রাম উৎসবে পরিণত হয়।

পীযূষ বসুর পরিচালনায় ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলার উপর ভিত্তি করে। রাজা সূর্য কিশোর নাগ চৌধুরী (উত্তম) ভোগবিলাসে মগ্ন, কিন্তু হত্যার ষড়যন্ত্রে আক্রান্ত হয়ে অলৌকিকভাবে বেঁচে যান। ফিরে এসে দেখেন, সম্পত্তি অন্যের দখলে। শুরু হয় নিজের পরিচয় প্রমাণ আর ন্যায়ের লড়াই।
রাজকীয় ভঙ্গি, অথচ চোখে অনন্ত কষ্ট— উত্তমের অভিনয় এখানে যেন জীবন্ত ইতিহাস।

এক বছরে পাঁচটি ছবিতে পাঁচ রকম চরিত্র। আদর্শ চিকিৎসক, যমজ ভাই, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী, প্রেমিক ও যোদ্ধা জমিদার। প্রতিটি চরিত্রের জন্য আলাদা প্রস্তুতি, আলাদা শরীরী ভাষা— এমন ধারাবাহিক বৈচিত্র্য বাংলা সিনেমায় বিরল।
আজ শোলের ৫০ বছর উদযাপনে যখন দেশ মাতোয়ারা, তখন বাংলা ছবির দর্শকদেরও উচিত ১৯৭৫ সালের দিকে ফিরে দেখা, যেখানে এক মহানায়ক একাই পাঁচটি ছবি দিয়ে ইতিহাস লিখে দিয়েছিলেন।