শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
মাই নেম ইজ অ্যান্থনি গনজালভেস!
সাতের দশকে সকলের মুখে মুখে ফিরত এই গানের লাইন। সুপার ডুপার হিট 'অমর আকবর অ্যান্থনি'র আইকনিক গান দেখে কত যুবক যে তখন অমিতাভ বচ্চনকে কপি করতে শুরু করেছিলেন! আর কিশোর কুমার গেয়েওছিলেন তেমনই। প্রথমে অমিতাভ বচ্চনের কণ্ঠে বক্তৃতা, তার পরে কিশোরের কণ্ঠে বেজে ওঠা গান।
তবে গানের পেছনে গল্প ছিল। আদতে এ গানের কথায় যে অ্যান্থনি গনজালভেসের কথা বলা হয়েছে, তিনি কিন্তু মোটেও কোনও কাল্পনিক চরিত্র নন, রীতিমতো রক্তমাংসের মানুষ! তাঁকে ভেবেই চরিত্রায়ন, গান। বম্বের একজন বিখ্যাত মিউজিক অ্যারেঞ্জার ছিলেন অ্যান্থনি গনজালভেস। সেই আসল অ্যান্থনিরই আজ জন্মদিন!

একসময় সলিল চৌধুরীর মিউজিক অ্যারেঞ্জার হিসেবে কাজও করেছেন। অ্যান্থনি গনজালভেসের ছাত্র ছিলেন লক্ষ্মীকান্ত প্যায়ারেলাল জুটির পেয়ারেলাল থেকে রাহুল দেববর্মন পর্যন্ত। 'অমর আকবর অ্যান্থনি' ছবির সুরকার ছিলেন লক্ষ্মীকান্ত-পেয়ারেলাল জুটি। তাই পেয়ারেলালজি নিজের শিক্ষক মহাশয়ের নাম উল্লেখ করে গানটি তৈরি করেছিলেন, তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে। গানের কথা লিখেছিলেন আনন্দ বক্সী।
১৯৭৭ এর এই ছবিতে অমিতাভ বচ্চন, বিনোদ খান্না, ঋষি কাপুর জুটির তিন ভাইয়ের গল্প পরিচালনা ও প্রযোজনা করেছিলেন মনমোহন দেশাই। প্রথমে আনন্দ বক্সী যে গানের কথা লিখেছিলেন, তাতে ছিল অ্যান্থনি ফার্নান্ডেজ। মনমোহন দেশাই শেষমেশ পেয়ারেলালজির কথায় অ্যান্থনি ফার্নান্ডেজ নাম বদলে অ্যান্থনি গনজালভেস করেছিলেন বলে জানা যায়। সেই গানের কথাই লেজেন্ডারি হিট হয়ে রইল।
গানের দৃশ্যায়নে দেখা যায়, একটি ইস্টার ডিম থেকে বের হওয়ার সময় অ্যান্টনি অমিতাভ তাঁর বক্তব্য রেখে গানটি গাইছেন। কমেডির মোড়কে গানটি শ্যুট করা হয়। এবং ছবির আলটিমেট সেরা গান এটিই হয়ে থেকে যায়।

এবার আসা যাক অ্যান্থনি গনজালভেসে গল্পে। যে ভদ্রলোককে নিয়ে একটা কালজয়ী গান তৈরি হয়ে গেল, তাঁর কাহিনিও কম মনকাড়া ছিল না! একে বলা যায়, গানের ভিতর গল্প, গান তৈরির গল্প।
১৯২৭ সালের আজকের দিনে, অর্থাৎ ১২ জুন গোয়ার মারগাও-এ একটি পর্তুগিজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন অ্যান্থনি গনজালভেস। অ্যান্থনির বাবা ছিলেন চার্চের কোয়্যার মাস্টার। তিন বছর বয়সে বাবার কাছেই ভায়োলিন শিখে ফেলেন অ্যান্থনি। বাবার বানানো সব গান সে ছোট বয়সেই তুলে ফেলত। প্রখর সঙ্গীত অনুরাগ ধরা পড়ে তখনই। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে নিজের থেকে বয়সে বড়দের সে রীতিমতো মিউজিক শিক্ষা দিত, যা তাক লাগিয়ে দিত সবাইকে।
শুধু তাই নয়, ওইটুকু ছেলে ফরাসি-পর্তুগিজ মিউজিকের সঙ্গে ভারতীয় মিউজিকের মিশেল ঘটিয়ে নতুন মিউজিকও উদ্ভাবন করে ফেলত! মাত্র চোদ্দো-পনেরো বয়সেই সে চলে এসেছিল বম্বে। একেবারে একা একটি ছেলে গান খুঁজছে শহরের রাস্তায়। কিন্তু পেটে তো খাবার চাই। তাই শুধু গান নয়, খোঁঝ শুরু চাকরিরও। ১৯৪৩ সালে অ্যান্থনি গনজালভেস শহরের একটি নামী মিউজিক গ্রুপে প্রথম কাজ পেয়েছিল নিজে যোগ্যতায়। সেই মিউজিক গ্রুপের অধিপতি ছিলেন নৌশাদজি।

এভাবেই অ্যান্থনি গনজালভেস র জার্নি শুরু হয়। শোনা যায়, নৌশাদ বম্বে শহরের পথে অ্যান্থনির ভায়োলিন শুনে বলেছিলেন, "খুব সুন্দর বাজাও তো ! চাকরি করবে?" চাকরি নয়, আকাশের চাঁদ হাতে পেল অ্যান্থনি। এর পরেই ছবিতে কাজের সুযোগ আসে। আর তার পরেই অ্যান্থনি তৎকালীন প্রথম সুপারস্টার নায়িকা দেবিকা রানির স্নেহ পায় কাজ করতে গিয়েই।
এরপর ১৯৫০ থেকে ১৯৬০ দশক বহু বিখ্যাত ছবিতেই মিউজিক অ্যারেঞ্জার হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। বিআর চোপড়ার 'নয়া দৌড়', 'ওয়াক্ত', নৌশাদজীর 'দিল্লাগি', চেতন আনন্দের 'হাকিকত' র মতো ছবি, মহল, ঢোলক, পহেলি নজর ছবিও তাঁরই মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্টে।
১৯৫৮ তে অ্যান্থনি গনজালভেস প্রতিষ্ঠা করলেন 'সিম্ফনি অর্কেস্ট্রা অফ ইন্ডিয়া', যেখানে লতা মঙ্গেশকর থেকে মান্না দে তাঁর শিক্ষায় বহু একক গান গেয়েছেন। এতই জনপ্রিয় হয় এই অর্কেস্ট্রা যে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ বম্বেতে বাঁধাধরা হয়ে যায় তাঁদের শো।
১৯৬৫ সালে বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে নিউ ইয়র্কের সিরাকিউজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভ্রমণ অনুদানের মাধ্যমে আমেরিকা চলে যান অ্যান্থনি। তিনি আমেরিকান সুরকার, প্রকাশক ও লেখক সমাজের সদস্য হয়েছিলেন। পরে ভারতে ফিরে আসেন, পূর্বপুরুষের ভিটে গোয়ার গ্রামে ফিরে চলে যান। সেখানেই বাড়ি করেন নতুন করে এবং গান লেখেন নিজের মতো। ছবির রজগতে আর ফেরেননি তিনি।

কোনও এক অভিমানে অ্যান্থনি বলেছিলেন, "বলিউড খুব অকৃতজ্ঞ ওখানে আর ফিরে যেতে চাই না।"
৮৩ বছর বয়সে অ্যান্থনি গনজালভেসকে কর্মবীর পুরস্কার দেয় ৪১তম পানাজি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব কমিটি। ২০১২ সালের ১৮ ই জানুয়ারি নিউমোনিয়া অসুখে অ্যান্থনি গনজালভেসের মৃত্যু হয়। বলিউড তাঁর ঋণ স্বীকার করেনি স্বর্ণযুগে, কিন্তু তাঁর ছাত্র পেয়ারেলাল মাস্টারমশাইকে বলিউড ইতিহাসে যথাযোগ্য সম্মান দিয়ে অ্যান্থনি গনজালভেস নামটাই খোদাই করে দিলেন বলিউডের আইকনিক এক গানে।
অ্যান্থনি সেটা দেখে যেতে এবং সেই জনপ্রিয়তা উপভোগ করে যেতে পেরেছেন, এটাই প্রাপ্তি। চিরকাল বলিউডের সেরা পার্টির গানে রয়ে যাবে ভরাট কণ্ঠে "মাই নেম ইজ গনজালভেস।"
শুনুন সেই বিখ্যাত গান।
https://youtu.be/wlxfIIgKZho