
শেষ আপডেট: 28 January 2024 11:05
শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
কবিগুরু যতই লিখুন 'কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি', কিন্তু আমাদের সমাজে কালো মেয়েরা চিরকালই ব্রাত্য। বিয়ের বাজারে তারা প্রথমেই ফেল। সমাজের চিরবঞ্চিতা কালো মেয়েদের নীরব কান্নার কথা পর্দায় ফুটে উঠেছিল যে অভিনেত্রীর হাত ধরে তিনি শ্রীলা মজুমদার।
পরশুরাম-ছবির জন্য তখন মৃণাল সেন নতুন মুখ খুঁজছেন। স্ত্রী গীতা সেনের ওপর ভার দিয়েছিলেন নতুন মেয়ে খুঁজে আনার। ততদিনে শ্রীলা রেডিওতে কথা বলায় বেশ অভ্যস্ত। বিজ্ঞাপনের কাজ করছেন। শ্রীলা ছোটবেলা শিশুশিল্পী হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কাজ করেছেন। একটু বড় হয়েই যোগ দিয়েছিলেন গ্রুপ থিয়েটারে। রেডিওতে ‘আত্মজা’ নামে একটি নাটক করেছিলেন শ্রীলা। এই নাটক শুনেই গীতা সেনের শ্রীলাকে পছন্দ হয়। জগন্নাথ বসু তখন অল ইন্ডিয়া রেডিওর নাটকের প্রযোজক। ‘আত্মজা’ তাঁরই পরিচালনা। মৃণাল সেন সরাসরি তাঁকে ফোন করেন এবং পুরো নাটকটা শোনেন। তারপর 'পরশুরাম' ছবির জন্য শ্রীলাকে পছন্দও করে ফেলেন। কণ্ঠ শুনেই মৃণাল সেন মানসচক্ষে দেখে ফেলেন তাঁর মানসকন্যাকে। কিন্তু তবু বাস্তবে শ্রীলা কেমন তা তো দেখতে হবে?
'পরশুরাম'-এর নায়িকার জন্য মৃণাল সেনের দরকার ছিল সহজাত সুন্দর চোখের মেয়ে। যার বয়স কম ছিপছিপে গড়ন। আকাশবাণীর নাটকের রিহার্সাল রুমে এসে মৃণাল সেন প্রথম দেখেন শ্রীলাকে। শ্রীলার চোখ দেখেই চমকে যান মৃণাল। বলেন, একী করেছ?'
কী ভুল করেছেন শ্রীলা? শ্রীলার তখন ভ্রু প্লাক করা। মৃণাল সেন বলেছিলেন ,'আমি ইয়াং ম্যান হলে কিছুতেই তোমার প্রেমে পড়তাম না। কারণ তুমি ভুরু প্লাক করেছ।'
যদিও সত্তর দশকে কজন বাঙালি মেয়ে আর ভ্রু প্লাক করাতেন! সিনেমার অভিনেত্রীদের ব্যাপার অবশ্য আলাদা। সবাই ভাবল মৃণাল সেনের ছবি থেকে রিজেক্ট হলেন শ্রীলা। কিন্তু তবু শ্রীলাকেই পরশুরাম-এর নায়িকা করেন মৃণাল সেন। পরশুরাম-এর মেয়েটি এক ছিন্নমূল মেয়ে। এক প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের রাতে আরও অনেক মানুষের সঙ্গে সে-ও একটা কবরখানায় আশ্রয় নেয়। সেই প্রেক্ষাপট ঘিরে গল্প। আসলে শ্রীলার গায়ের রং কালো। এটাই ছিল তাঁকে নির্বাচন করার প্রথম কারণ। চরিত্রের সঙ্গে যেন নিবিড় ভাবে মিলে গিয়েছিল শ্রীলা মজুমদারের গায়ের কালো রং। কোনও মেকআপ ছাড়াই সে কালো। এই কালোই শ্রীলাকে এনে দিল আলোর জগতে মৃণাল ভুবনে। পরশুরাম-এর শ্যুটিং শেষ হতে বেশিদিন লাগেনি। কিন্তু সে ছবি রিলিজের আগেই শ্রীলার কাছে আবার চলে এল মৃণাল সেনের 'একদিন প্রতিদিন' ছবির অফার। তবে এবার আর গল্পের কেন্দ্রবিন্দু চরিত্র নয়। বোনের চরিত্র। শ্রীলার কাছে ততদিনে গডফাদার মৃণাল সেন। শ্রীলার ইচ্ছে ছিল গল্পের নিখোঁজ দিদির চরিত্র করার। কিন্তু মৃণাল সেন চেয়েছিলেন কনট্রাস্ট। শ্রীলাকে বলেছিলেন 'দিদির চরিত্র তোমায় দেবনা। একটা ফর্সা মেয়ে দেখো যদি খোঁজ পাও!' শ্রীলা অভিমান নিয়ে বলেছিলেন 'ওসব মেয়ে ফেয়ে আমার কাছে হবেনা মৃণাল দা"। শেষমেষ 'মৃগয়া' ছবির নায়িকা মমতা শঙ্করকেই মৃণাল সেন দিলেন দিদির চরিত্র। যদিও দিদির রোল বলতে গেলে অতিথি শিল্পীর মতো। বোনের রোল শ্রীলারই বেশি। দিদি সারা দিন নিঁখোজ। পুলিশ এসে শ্রীলাকে জিজ্ঞেস করছে এমন সময় শ্রীলার একটা সংলাপও ছিল ‘আমার দিদি কিন্তু ফর্সা। আমার মতো কালো নয়।’
একদিন প্রতিদিন ও পরশুরাম দুটি ছবিতেই তাক লাগিয়ে দেন শ্রীলা। ইন্ডাস্ট্রির নতুন না ভুলতে পারা কালো মেয়ে। যে কালো থেকে ফর্সা হবার কসরত করে না, মেকআপের সময় তুলে নেয়না ফাউন্ডেশনের তুলির স্পর্শ, ঠোঁটে দেয় না লাল লিপস্টিক। তবু সে কালো মেয়েকে ইন্ডাস্ট্রি অস্বীকার করতে পারে না।
'আকালের সন্ধানে' ছবির কথা ভাবুন। বম্বের স্মিতা পাতিলের পাশেও এক গ্রাম্য ঠিকে ঝির চরিত্রে শ্রীলা কেমন ভাবে ছবির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন।
মৃণাল সেনের সঙ্গে ছ'টি ছবি করেছিলেন শ্রীলা। তাই দিয়েই শ্রীলা মজুমদার হয়ে ওঠেন ফিল্ম জগতের আন্তর্জাতিক মুখ। মৃণাল সেন যেন তাঁর বাবা হয়ে গেছিলেন। মৃণাল সেন যখন বার্ধক্যজনিত স্মৃতিভ্রংশে আক্রান্ত তখনও কিন্তু তিনি মমতা আর শ্রীলা তাঁর একদিন প্রতিদিনের দুই কন্যার কথা ভোলেননি। দু জনে তাঁর ঘরে ঢুকলেই নবতিপর মৃণাল সেন হাত তুলে বলতেন "এখনও বেঁচে আছি!" মৃণাল সেনের শোকসভায় এমন কথাই বলেছিলেন সজলনয়না শ্রীলা।
তবে শুধু মৃণাল সেন নয়। অন্য পরিচালকদের সঙ্গে শ্রীলার আরও কিছু ছবি দাগ কেটেছিল সেসময়। শ্যাম বেনেগলের মান্ডি আরোহন,উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর চোখ,গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের নাগমতী, নব্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের চপার। 'গন্ডি' নামে একটি বাংলা ছবি করেছিলেন শ্রীলা মজুমদার এবং অঞ্জন দত্ত। যাতে একটি নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার পুরী যাবার স্বপ্ন দেখে। জীবনে প্রথমবার বিয়ের পর পুরীর সমুদ্র দেখতে তারা নানা উপায়ে টাকা সঞ্চয় করতে থাকে। শেষ অব্দি কি তাদের পুরী যাওয়া হয়? ছবিটা ছিল অসাধারণ।
আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন পরিচালকদের ছবিতে কাজ করলেও এবং সেসব ছবি চিত্রসমালোচক মহলে প্রশংসিত হলেও আর্থিক আয় খুব বেশি শ্রীলার ছিল না। কারণ এসব আর্ট ফিল্ম কত আর বাণিজ্যসফল হত? বছরে দু একটি ছবি। ক্রমশ তেমন ছবির পরিচালকরাও ছবি করা ছেড়ে দিচ্ছিলেন। সে কারণেই কমার্শিয়াল ছবির জগতে ঝাঁপ দিলেন মৃণাল সেনের নায়িকা।
কমার্শিয়াল ছবি মানেই ফর্সা নায়িকাদের দুনিয়া। দেবশ্রী, শতাব্দী, মুনমুনদের গ্ল্যামারে ধারেকাছেও আসেননা শ্রীলা। নেই তাঁর রূপের চটক। সে কারণেই বাণিজ্যিক ছবির নায়িকা হওয়া তাঁর হল না। তবু বীরেশ চট্টোপাধ্যায়ের 'মন ময়ূরী' ছবিতে বড় রোল পান শ্রীলা। যদিও সে ছবির নায়িকা মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়। শেষমেষ অঞ্জন চৌধুরীর ইউনিটে যোগ দিলেন শ্রীলা। যা ভাল চোখে নেননি মৃণাল সেন। কিন্তু একজন পরিপূর্ণ অভিনেত্রীর কাজই করেছিলেন শ্রীলা।
২৭শে জানুয়ারি ২০২৪ মাত্র ৬৫ বছর বয়সে প্রয়াত হলেন শ্রীলা মজুমদার। এক যুগের অবসান। সর্বোপরি কালো মেয়েদের যন্ত্রণা যেন বুকে করে বিদায় নিলেন শ্রীলা । আজ আর তাঁর কোনও বঞ্চনার অভিমান নেই, শোক নেই, রোগ নেই, দুঃখ নেই, শুধুই মুক্তি।
অঞ্জন চৌধুরীর কলমে উঠে গেল বিয়ে না হওয়া, বহুবার বিয়ে ভেঙে যাওয়া, কালো মেয়েদের গল্প। বাড়ির কালো বড়দি যার বিয়ে হয়নি। তাই সে ভাইদের সংসারে ভাইয়ের বউদের পরিচারিকার মতো আশ্রিতা। আর ভাগ্যজোরে বিয়ে হলেও শ্বশুরবাড়িতে পণের টাকা দিতে না পারায় অত্যাচারিতা। এমন রোলে অঞ্জন চৌধুরীর ছবিতে আইকনিক হয়ে উঠলেন শ্রীলা মজুমদার। লোফার, পূজা একের পর এক ছবি। অঞ্জন শিষ্য হরনাথ চক্রবর্তীর প্রতিবাদ ছবিতেও শ্রীলার একই সর্বংসহা রূপ।
তবে এই যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আর্ট ফিল্ম থেকে হার্ডকোর বাংলা ছবি দুয়েতেই নিজেকে সফল করে তোলা এ শ্রীলা মজুমদার বলেই পেরেছিলেন। এখানেই তিনি জাত অভিনেত্রী। তবে এতে জাত তো কিছুটা গেছিলও তাঁর। শেষ দিকে লীনা গঙ্গোপাধ্যায়ের সিরিয়ালেও যেমন কাজ করেছেন তেমন রেশমি মিত্রর ছবিতে ছোটখাট চরিত্র করেছেন শ্রীলা। যদিও লীনা এবং রেশমি শ্রীলার বর্তমান সময়ের বান্ধবী ছিলেন। শেষ দিকে অনিকেত চট্টোপাধ্যায়ের 'শঙ্কর মুদি' ও কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'পালান' ছবিতে আবার দাগ কেটেছিলেন শ্রীলা।
যাত্রাতেও কিন্তু শ্রীলার এই কালো রং ছিল ইউএসপি। মনে পড়ছে অরিন্দম গাঙ্গুলির সঙ্গে শ্রীলার যাত্রা 'কালো মেয়ের পাগল স্বামী'। আবার দূরদর্শনের চরিত্রহীন ধারাবাহিক ভুলি কী করে?
শ্রীলা মজুমদার কালো রঙের জন্য যতই শিরোনামে থাকুন তবু তাঁর কন্ঠ ছিল ঈর্ষণীয়। বাচিকশিল্পী হিসেবে গ্রাম থেকে শহর প্রথমা নায়িকা তিনি।
শ্রীলা মজুমদারের কন্ঠ ছাড়া হতই না চোখের বালিতে বিনোদিনী ঐশ্বর্য রাই। ব্যাপারটা কী? আসলে ঋতুপর্ণ ঘোষের চোখের বালিতে ঐশ্বর্য রাই এর সমস্ত সংলাপ বলেছিলেন শ্রীলা মজুমদার। যে কারণে বিনোদিনী পর্দায় ঝড় তোলে। চোখের বালিতে ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রধান সহকারী পরিচালক শৌভিক মিত্র জানালেন "আসলে ঋতুদের ইন্দ্রাণী পার্কের পাড়াতে শ্রীলাদির কোনও এক আত্মীয় থাকতেন। সেইজন্য শ্রীলাদি আসতেন। ওঁর সঙ্গে ঋতুপর্ণর দেখা হত। ঋতু যখন চোখের বালিতে ঐশ্বর্যর শ্যুটিং শেষ করে ফেলেছিল তখন হঠাৎই ওঁর মনে এল শ্রীলা মজুমদারকে দিয়ে ঐশ্বর্যর সংলাপ বলালে কেমন হয়? সেভাবেই শ্রীলাদি এসে বিনোদিনীর সবটা ডাবিং করেন। ঐশ্বর্যকে আমরা ইংরেজিতে কিছু বাংলা সংলাপ লিখে দিয়েছিলাম। ঐশ্বর্য সেগুলো কাজ চালাবার মতো বলেছিলেন। প বর্গ ম্যানেজ করতে পারলেই এই ডাবিং ঠিক করা যায়। ঐশ্বর্যর ডাবিং করলেন শ্রীলা মজুমদার। সেটা কিন্তু সাধারণ দর্শক অনেকেই বুঝতে পারেননি। তবে কিরণ খের -রীতা কয়রাল ডাবিং-এর মতো ঐশ্বর্য-শ্রীলা ডাবিং নিয়ে কোনও সমস্যা হয়নি।"
শ্রীলা মজুমদাররেডিও,দূরদর্শন,চলচ্চিত্র,পাবলিক থিয়েটার,গ্রুপ থিয়েটার থেকে হালের সিরিয়াল সবেতেই কাজ করেছিলেন। তবে সব জায়গাতেই তিনি শোষিত নারীর চরিত্রে। শেষদিকে হালের কিছু ছবিতে অভিজাত রোল করলেও সেসব দাগ কাটেনি দর্শকের মনে। শোষিত নারীর কথা বলতে বলতে বাস্তবেও যেন তিনি ইন্ডাস্ট্রিতে অবহেলিত হয়ে পড়েছিলেন। সেভাবে কালো মেয়ের ইমেজের বাইরে তাঁকে ভাবা হল কই?
ইন্ডাস্ট্রিতে কারও পজিটিভ ইমেজ হয় কারও নেগেটিভ। শ্রীলা বাক্সবন্দী হয়ে যান কালো বঞ্চিতা মেয়ের ইমেজে। আজীবন সেই কালো বিয়ে না হওয়া মেয়ের চরিত্রেই তিনি কাস্ট হয়ে গেলেন। তবে এ কথা সত্যি তাঁর মতো কালো মেয়েদের গল্প বলতে আর কে পারবে?
এমনকী শ্রীলার মৃত্যুর খবরে ইন্ডাস্ট্রি জানল তিনি ক্যানসারে ভুগছিলেন। যদিও তিনি তো পর্দার প্রেয়সী। জরা পর্দার পরীদের স্পর্শ করে না। তাই শ্রীলাও হয়তো চাননি এ খবর প্রকাশ্যে আনতে। এই ইন্ডাস্ট্রিতে রোগের খবর ছড়িয়ে পড়লে কাজ পাওয়াও মুশকিল হয়ে যায়।