
খোলাখুলি আড্ডায় অঞ্জন দত্ত
শেষ আপডেট: 19 January 2025 14:29
রাস্তার নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শহরের চরিত্র। মানচিত্র। ইতিহাস। যে কোনও শহরের ক্ষেত্রেই তা সত্য। কলকাতা তো বটেই। এ শহরের রাস্তার নামের সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে শহরের টুকরো বহু স্মৃতি। আর এই নিয়েই আক্ষেপ জমে রয়েছে ৪০ নম্বর বেনিয়াপুকুর লেন নিবাসী, বছর সত্তরের গায়ক অঞ্জন দত্তের মনে। বদলে যাওয়া রাস্তার নাম নিয়ে রয়েছে তাঁর অভিমানও। ‘দ্য ওয়াল’-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে বললেন সেই সব কথাই।
আক্ষেপের অভিমানের যথেষ্ট কারণও আছে। আছে পটভূমিও। পার্ক স্ট্রিট এলাকার ‘শর্ট স্ট্রিট’-এর নাম পরিবর্তন হয়েছে। নতুন নাম ‘সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার সরণি’। গত বৃহস্পতিবারই এই নতুন নামকরণ করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চলতি মাসে আরও এক রাস্তার নাম বদলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। হাওড়ার ডুমুরজলা হেলিপ্যাড গ্রাউন্ড সংলগ্ন ড্রেনেজ ক্যানাল রোডের নাম ছিল ভোলানাথ চক্রবর্তী সরণি তা বদলে হবে প্রয়াত ফুটবলার শৈলেন মান্নার নামে।
এই প্রথম নয়, এর আগেও একাধিকবার শহর কলকাতায় রাস্তাঘাটের নাম বদল হয়েছে। মুক্তরামবাবু লেনের নাম বদলে করা হচ্ছে শিবরাম চক্রবর্তীর নামে ৷ রাজ্য সরকারকে প্রস্তাব পাঠিয়েছে, কলকাতা পৌরনিগম।
এইসব নিয়েই অঞ্জন দত্ত বললেন, ‘শহরের রাস্তার নাম মানচিত্র ধরে রাখে। সেই চেনা নামগুলো বদলে গিয়েছে। ধরুন অক্সফোর্ড স্ট্রিট। সেই নাম শুনে বড় হয়েছি। সেই নাম হঠাৎ বদলে গেল! আমি একটা রাস্তার নাম জেনে বড় হয়েছি। আমার ছেলে আরেকটা নাম জেনে বড় হচ্ছে! সেটা কেন হবে?’
ঠিক এই কারণেই ধর্মতলা চত্বরকেও এসপ্ল্যানেড বলতে মন চায় না ‘ক্যালকাটা সিক্সটিন’ গায়কের। বললেন, ‘কেন বলব এসপ্ল্যানেড! আমি এখনও ডালহৌসি বলতে কমফর্টেবল। এই যে তিনটে ছেলে, যারা এতগুলো গুলি খেয়ে, সিম্পসনের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধ করল, তাদের সম্মান জানাতে ওটাকে ডালহৌসি বলতে গর্ব বোধ করি। আমি কেন এসপ্ল্যানেড বলতে যাব?’
অঞ্জন দত্তর আরও প্রশ্ন, ‘থিয়েটার রোড শেক্সপিয়ার সরণী হবে কেন?’ তাঁর মতে, চেনা রাস্তার নামগুলো শুধু বদলে যাচ্ছে না, পাল্টে যাচ্ছে মানুষের চিন্তাভাবনাও। শহরের চরিত্র রদবদল ঘটছে।
এভাবে পরিবর্তিত হতে থাকা রাস্তার নামের সঙ্গে যেমন অঞ্জনের ছোটবেলার স্মৃতি হারিয়ে গিয়েছে, তেমনই শহরের ‘হেরিটেজ’ও যে বারবার ধাক্কা খাচ্ছে, সেই কথাও মনে করিয়ে দেন অঞ্জন।
ঠিক যেমন, প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনার পরে, শেষমেশ শহর থেকে ট্রাম তুলে দেওয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। বালিগঞ্জ-ধর্মতলা ও শ্যামবাজার-ধর্মতলা রুটে শেষ যে দু'টি ট্রাম চলতো, তাও বন্ধ করে দিতে চলেছে রাজ্য সরকার।
সরকারের এ হেন সিদ্ধান্ত নিয়ে অঞ্জন দত্ত বলেন, ‘ট্রাম একেবারে তুলে দিলে, ক্ষতি হয়ে যাবে। টয়ট্রেন দার্জিলিং থেকে উঠে গেলে ক্ষতি হয়ে যাবে। এগুলো হেরিটেজ। হেরিটেজ মানে মনুমেন্ট নয়। হেরিটেজ হতে পারে একটা ওষুধের দোকান। একটা বারও হতে পারে, একটা সিনেমাহলও হতে পারে, একটা বইয়ের দোকানও হতে পারে হেরিটেজ। হেরিটেজের নাম এলোপাথাড়ি বদলাতে পারে না।’
এখানেই না থেমে তিনি বলেন, ‘যেটা আজ ল্যান্সডাউন রোড, কাল সেটা তরুণ কুমার সরণি হতে পারে না। এটা বিরক্তিকর। কলকাতার যে সহজাত চরিত্র সেটা পাল্টে যাচ্ছে। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই ধরুন, ডেকার্স লেন কী সুন্দর নাম, তার নাম কাল যদি জহর রায় সরণী হয়ে যায়, ভাল লাগবে? হাস্যকর নয়? আর সিনেমার লোকদের নিয়ে রাস্তার কেন নাম হবে, বুঝতে পারছি না।’
‘আমার জানলা দিয়ে একটুখানি আকাশ দেখা যায়’... কলকাতায় তাঁর ছোটবেলার ছোট্ট বাড়িকে নিয়ে লেখা সেই গানটি গেয়ে ওঠেন অঞ্জন। এ গান এ শহরের, অঞ্জন দত্তর শহরের। যিনি এ শহরের কসবায় লাল-নীল সংসার পাতার গান লিখেছেন, গড়ের মাঠ বা গড়িয়াহাটকে চোখে হারিয়েছেন প্রেমিকার বিহনে। ছোটবেলার বান্ধবীর জন্য লিখেছেন, 'রয়ে গেলে তোমরা, আঁকড়ে রিপন স্ট্রিট, দু’টো ঘর সিঁড়ির তলায়।'
এ শহরের বদলে যাওয়া নিয়ে আক্ষেপ, অভিমান তো তাঁকেই মানায়!