Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
শয়তান বা কালু বলে আর ডাকা যাবে না! স্কুলের খাতায় পড়ুয়াদের নতুন পরিচয় দিচ্ছে রাজস্থান সরকার‘পাশে মোল্লা আছে, সাবধান!’ এবার শুভেন্দুর বিরুদ্ধে কমিশনে নালিশ তৃণমূলেরWest Bengal Election 2026: বাম অফিসে গেরুয়া পতাকা! মানিকচকে চরম উত্তেজনা, থানায় বিক্ষোভ বামেদেরপয়লা বৈশাখে শুটিং শুরু, যিশুর কামব্যাক—‘বহুরূপী ২’ কি ভাঙবে সব রেকর্ড?‘কেকেআরের পাওয়ার কোচ রাসেল ২৫ কোটির গ্রিনের থেকে ভাল!’ আক্রমণে টিম ইন্ডিয়ার প্রাক্তন তারকাবিহারে আজ থেকে বিজেপি শাসন, রাজনীতির যে‌ অঙ্কে পদ্মের মুখ্যমন্ত্রী আসলে নীতীশেরই প্রথম পছন্দঅশোক মিত্তলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইডি, ক'দিন আগেই রাজ্যসভায় রাঘব চাড্ডার পদ পেয়েছেন এই আপ সাংসদ West Bengal Election 2026: প্রথম দফায় ২,৪০৭ কোম্পানি বাহিনী! কোন জেলায় কত ফোর্স?IPL 2026: ভাগ্যিস আইপিএলে অবনমন নেই! নয়তো এতক্ষণে রেলিগেশন ঠেকানোর প্রস্তুতি নিত কেকেআর TCS Scandal: যৌন হেনস্থা, ধর্মান্তরে চাপ! নাসিকের টিসিএসকাণ্ডে মালয়েশিয়া-যোগে আরও ঘনাল রহস্য

মিস্টার বচ্চনের সঙ্গে স্টেজ শেয়ার করতে হবে জেনে নিজেকে তৈরি করেছিলাম: অমিত গাঙ্গুলি

বাংলার মাচা শিল্পীদের অন্যতম কিশোরকণ্ঠী অমিত গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর নামে আজও শো-এর টিকিট ফুল হয়। শুধু গান শুনতেই নয়, তাঁকে দেখতেও ভিড় করেন দর্শক-শ্রোতারা। কারণ তিনি 'টু ডায়মেনশন', একাধারে যেমন কিশোরকণ্ঠী, অন্যদিকে তাঁকে দেখতে আবার অমিতাভ বচ

মিস্টার বচ্চনের সঙ্গে স্টেজ শেয়ার করতে হবে জেনে নিজেকে তৈরি করেছিলাম: অমিত গাঙ্গুলি

শেষ আপডেট: 23 January 2022 10:42

বাংলার মাচা শিল্পীদের অন্যতম কিশোরকণ্ঠী অমিত গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর নামে আজও শো-এর টিকিট ফুল হয়। শুধু গান শুনতেই নয়, তাঁকে দেখতেও ভিড় করেন দর্শক-শ্রোতারা। কারণ তিনি 'টু ডায়মেনশন', একাধারে যেমন কিশোরকণ্ঠী, অন্যদিকে তাঁকে দেখতে আবার অমিতাভ বচ্চনের মতো। পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত ছাড়াও আমেরিকা, লন্ডন, দুবাই, বাংলাদেশেও অমিতের স্টেজ পারফর্মেন্সের বিপুল চাহিদা। এক সময়ে দিনে পাঁচটা করেও শো করেছেন অমিত। গান গেয়েছেন জনপ্রিয় চিত্রপরিচালক তপন সিংহের ছবিতেও। তাঁর ডেবিউ বলিউড ছবির গান অস্কার নমিনেশনের জন্য শর্ট লিস্টেড হয়েছিল। কোভিড-পরিস্থিতিতে তিনি কীভাবে দিনযাপন করছেন তা জানতে হাজির হয়েছিলেন চৈতালি দত্ত। একান্ত আড্ডায় উঠে এল অনেক অজানা কথা।   আপনি তো ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে স্টেজ পারফর্ম করেন। কোভিডে গত দু'বছর স্টেজ শো প্রায় বন্ধ, কেমন আছেন? অমিত: প্রথমেই আপনাকে এবং দ্য ওয়ালকে ধন্যবাদ জানাই। এই দুঃসময়ে কোনও মিডিয়া খবর নিচ্ছে এটা ভেবে খুবই ভালো লাগছে। আমরা যাঁরা সঙ্গীতশিল্পী কিংবা সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে যুক্ত, সত্যি আর সামাল দিতে পারছি না। ঈশ্বরের আশীর্বাদে আমি হয়তো কিছুটা নাম করেছি, তাই কিছু অর্থ রোজগার করে তা সঞ্চয় করতে পেরেছিলাম। কিন্তু গত দু'বছরে সেই সঞ্চিত অর্থও সব শেষ হয়ে গেছে। এইভাবে চলতে থাকলে আগামী দিনে কী করব, কী খাব জানিনা। বহু শিল্পী আছেন যাঁরা মাচা শো করে জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রতিদিনের ডাল ভাত জোটে। কোভিড সাংস্কৃতিক জগৎকে ধ্বংস করে দিয়েছে। আমার মতো বহু শিল্পী দিশেহারা। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় এবং বিদেশেও অনেক শো করতে গেছি একসময়, সেই জায়গাটা কোভিড পুরো শেষ করে দিয়েছে। খুবই বিপর্যস্ত এখন।স্টেজ শো করেই তো আপনি জীবিকা নির্বাহ করেন? অমিত: হ্যাঁ, একদমই তাই। আমি কোনওদিন গান ছাড়া চাকরি বা ব্যবসা করিনি। সঙ্গীত আমার ঈশ্বর, সঙ্গীত আমার সাধনা। যৌবনে ভালো চাকরি এবং ব্যবসার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু সেইসব আমি হেলায় হারিয়েছি। ও পথে আমি কোনওদিন হাঁটিনি। কারণ প্রতিদিন রেকর্ডিং, টিভি শো, শ্যুটিং, সন্ধেবেলা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত স্টেজ শো করেছি। হাতে কোনও সময় ছিল না। আর আমি খুব কম শিল্পীকেই দেখেছি, যাঁরা গানের পাশে আলাদা কোনও ব্যবসা করেন। কদিন আগে একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখানে মাননীয় মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন শিল্পীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, "গান-বাজনার সঙ্গে আরেকটু কিছু করুন। যাতে একটা দিক এফেক্টেড হলে অন্যটা দিয়ে সংসার বাঁচানো যায়।" উনি ঠিকই বলেছেন। সত্যি কথা আমি সেটা বিশ্বাস করি। কিন্তু গত দু'বছরে কোভিড অতিমারির কারণে মাচার শিল্পীদের অবস্থা খুবই করুণ। অনুষ্ঠান সব বন্ধ। প্রচুর জুনিয়র আর্টিস্ট, মিউজিশিয়ান আছেন যাঁরা সংসার চালাতে পারছেন না। খুবই অর্থাভাবে দিন কাটাচ্ছেন। কতদিন এভাবে চলবে, আমি নিজে কী করব- জানি না। আমার যেরকম স্ট্যাটাস ছিল, যেভাবে আমি চলাফেরা করেছি, আজ সেই জীবনযাত্রায় অনেকটাই কাটছাঁট করতে হয়েছে। উপায় নেই। এখনও আমি 'হাই রেন্ট' ফ্ল্যাট ভাড়ায় থাকি। গাড়ি আছে, ড্রাইভার আছে। 'কস্ট অফ লিভিং' যেটা বড় অঙ্কের টাকা মাসে খরচ তা অনেকটাই কমিয়েছি।আপনার যাঁরা যন্ত্রশিল্পী, তাঁরা কেমন আছেন? অমিত: আমার মোট ছ'জন যন্ত্রশিল্পী। ওঁদের খুবই করুণ পরিস্থিতি। এঁদের মধ্যে কয়েকজনের নিজস্ব বাড়ি আছে। কেউ ছোটখাটো ব্যবসা শুরু করেছেন। আর আমার গিটারিস্ট এবং যিনি কী-বোর্ড বাজান ওঁরা টিউশান করাছেন। আমার পক্ষে যতটা সম্ভব ওঁদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছি। কোভিডের ক্রাইসিসে অনেক শিল্পী তো ভার্চুয়ালি শো করেছেন... অমিত: আমিও করেছি। তাতে অর্থনৈতিক দিক দিয়ে খুব যে সুরাহা হয়েছে তা কিন্তু নয়। এটা কখনও হতে পারে না। আর ভার্চুয়াল শোয়ের কোনও মজা নেই। 'তোমায় পড়েছে মনে' নামে প্রতি বছর বড় শো হয়, গতবছর ৪ অগাস্ট সেটাতে আমি ভার্চুয়ালি গান গেয়েছি। সাম্মানিক পেয়েছি। কিন্তু সেটা সবসময় তো সম্ভবপর নয়। আর স্টেজ শো-তে যে আনন্দ, সেটা কোথায় পাব? মাঝে অল্প সংখ্যক দর্শক নিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল। শো-র খবরও আসছিল। আস্তে আস্তে সব খুলছিল। আবার কোভিডের তৃতীয় ঢেউ এসে দুম করে সব বন্ধ হয়ে গেল। শীতকালে এইসময় তো মাচার রমরমা ব্যাপার। দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে বাংলা নববর্ষ পর্যন্ত আমরা যে রোজগার করতাম, সেটা দিয়েই সারাবছর চলত। কিন্তু কোভিড সব শেষ করে দিয়েছে।যখন অল্প সংখ্যক দর্শক নিয়ে সরকারের অনুমতি মিলল তখন শো করেছেন? উপযুক্ত সাম্মানিক পেয়েছিলেন? অমিত হ্যাঁ অল্পবিস্তর শো করেছি। এমন শো করেছি যেটা আমার জঁরের নয়। আবার যন্ত্র শিল্পীদের সাহায্যার্থেও শো করেছি। আমার যন্ত্রশিল্পীরা সকলেই জানেন যে অমিতদা ওই ধরনের শো করেননা। কিন্তু ওঁদের পাশে দাঁড়াতে আমি সেসব করেছি। ওঁদের পাশে আমি যদি না দাঁড়াই তবে কে দাঁড়াবে? অতিমারির কারণে এখন সব সেক্টরেই ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ। উদ্যোক্তাদের কাছেও ফান্ডিং কম। অনেকে ছোট করে শো করেছেন। আগে যেভাবে হত সেটা হয়নি। তবে পশ্চিমবাংলার মধ্যে কিছু শো হয়েছে। কিন্তু আমি যে ধরনের সাম্মানিক পাই সেটা অবশ্যই পাইনি। এবার একটু অন্য প্রসঙ্গ... আপনাকে তো 'ডাবল কম্বিনেশন' বলা হয়, একাধারে কিশোরকণ্ঠী অন্যদিকে আবার অমিতাভ বচ্চনের মতো দেখতে, এর জন্য স্টেজে বাড়তি কিছু প্রাপ্তি হয়? অমিত: (একটু চুপ থেকে) আমাকে অনেক মানুষ দেখতেও আসেন। তাঁরা এসে বলেন যে আমায় নাকি অমিতাভ বচ্চনের মতো দেখতে। মানুষ আমার অটোগ্রাফ নেন। ব্যাপারটা খুব এনজয় করি। আপনি তো নিজেকে অমিতাভ বচ্চনের মতো সাজিয়ে গুছিয়েও রাখেন... অমিত: (হেসে) আসলে মানুষজনই আমাকে বলেন যে আমায় অমিতাভ বচ্চনের মতো দেখতে। স্টেজে উঠলে দর্শকরা চিৎকার করে বলেন যে শুধু অমিতাভ বচ্চনের ছবির গান গাইতে হবে। বিদেশে শো করতে গিয়েও এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। এমনও হয়েছে 'ইয়ারানা' ছবির 'সারা জামানা' গানটা গাইবার সময় লাইট লাগানো পোশাক পরেও আমাকে শো করতে হয়েছে। এগুলো এন্টারটেনমেন্টের জন্য করতে হয়। তাই করি।অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে শো করার কোনও সুযোগ হয়েছে? অমিত: একবার টুটু বসু সল্টলেকে শো-র আয়োজন করেছিলেন। সেই সময় সজল মিত্র মহাশয় আমায় বলেছিলেন যে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে আমাকে স্টেজ শেয়ার করতে হবে। সেইমতো নিজেকে আমি তৈরি করেছিলাম। কিন্তু সেই সময় মিস্টার বচ্চনের অনেক প্রোটোকল ছিল, ফলে সেটা আর বাস্তবে হয়ে ওঠেনি। এটা আমার দুর্ভাগ্য বটে।আপনি কোনদিনও অভিনয়ের অফার পাননি? অমিত: প্রচুর পেয়েছি। বহু বছর আগে কমলেশ মৈত্রর 'অবাস্তব' ছবিতে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, অভিষেক চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে অভিনয় করেছিলাম। এছাড়া স্বপন ঘোষালের 'ব্যোমকেশ' সিরিজে নর্মদাশঙ্কর চরিত্রেও অভিনয় করেছি। খুবই ছোট চরিত্র ছিল। পরিচালক রাজা সেনের 'ল্যাবরেটরি 'ছবিতে অভিনয় করেছি, একটা গানও গেয়েছি। এরপরেও অনেক ছবির অফার এসেছিল, কিন্তু সত্যিই আমি সময় বের করতে পারিনি। আপনি তো অনেক ছবিতে প্লেব্যাকও করেছেন? অমিত: হ্যাঁ, বহু বছর আগে আমি প্লেব্যাক করেছি। অজয় দাস,মৃণাল বন্দ্যোপাধ্যায়, অশোক ভদ্র, অনুপম দত্ত, দেবজিৎ, সৌমিত্র কুন্ডুর সুরে গান করেছি। তবে হালফিলে প্লেব্যাক করিনি। এখন তো জিৎ গাঙ্গুলি, অনুপম রায়, সুরজিৎ ভালো কাজ করছেন। খ্যাতনামা পরিচালক তপন সিংহের ছবিতে প্লেব্যাক করার অভিজ্ঞতা কেমন? যদি একটু বলেন- অমিত:  এটি আমার কেরিয়ারের মাইলস্টোন। তপন সিংহের মতো মহীরুহ-প্রতীম পরিচালকের ছবিতে আমি প্লেব্যাক করতে পেরেছি এটা পরম প্রাপ্তি। তখন 'আজব গাঁয়ের আজব কথা' ছবির জন্য তপনদা নতুন ভয়েস চাইছিলেন। সেইসময় দিলীপ রায়, যিনি ভায়োলিন বাজাতেন, তিনিই আমাকে তপনদার কাছে নিয়ে যান। আজ আর বেঁচে নেই দিলীপদা। এরপর তপনদার কাছে গেলে উনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, আমি কী ধরনের গান করি। আমি ওঁকে বলি, 'আমি কিশোর কুমারের গান করি।' তখন তপনদা আমাকে কিশোরকুমারের একটা হিন্দি গান গাইতে বলেন। তারপর? অমিত: আমি তখন 'তুনে হামে কেয়্যা দিয়ারে জিন্দেগি' গানটি চোখ বন্ধ করে গাইছি। ওমা! চোখ খুলতেই দেখি তপনদা কাঁদছেন। আমি ভাবছি সর্বনাশ, আমার মতো একজন শিল্পীর গান শুনে তপনদার কান্না পেয়ে গেল! তখন উনি আমাকে বলেন, 'আমি নস্টালজিক হয়ে গেছিলাম।' আমাকে তপনদা প্রশ্ন করেন, 'এই গানটির ছবির নাম তুমি জানো?' আমি বলি, 'না, ক্যাসেটে শুনে গানটা আমি তুলেছি।' তখন তপনদা আমাকে বললেন,'এটা আমার পরিচালিত হিন্দি ছবি 'জিন্দেগি জিন্দেগি'র গান। সুরকার ছিলেন এস ডি বর্মন। এই গান শুনেই তপনদা আমাকে সিলেক্ট করেন। এরপর 'আজব গাঁয়ের আজব কথা' ছবিতে তপন সিংহের সুরে আমি গান গাই। ই টিভির জন্য 'চার চতুর্থ'তে তপন সিংহর সুরেও আমি গান গেয়েছি। এরপর একদিন তপনদা আমায় ডেকে সুবিনয় রায়ের রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্যাসেট দিয়ে বলেন, 'তুমি এখান থেকে ভালো করে গান শোনো। তোমাকে দিয়ে আমি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়াবো।' আমি তো শুনে অবাক! ওঁকে জিজ্ঞাসা করি, 'আমি কি পারব?' তপনদা আমাকে বলেন, 'আলবৎ তুমি পারবে। তোমাকে দিয়ে আমি রবীন্দ্রসঙ্গীতই গাওয়াবো। তবে তুমি নিজের মতো করে গাইবে, সুবিনয় রায়ের মতো নয়।' এই ব্যাপারে আমাকে আরেকজন সাহায্য করেছিলেন। তিনি আমার সঙ্গীতগুরু, গিটারিস্ট তথা জনপ্রিয় কম্পোজার বুদ্ধদেব গঙ্গোপাধ্যায়। এরপর কী হল? অমিত: তখন 'তিনমূর্তি' নামে একটি ছবি তপনদা তৈরি করছিলেন। সেখানে মনোজ মিত্র, রঞ্জিত মল্লিক, দীপঙ্কর দে মুখ্য চরিত্রে। আমাকে দিয়ে দুটি রবীন্দ্রসঙ্গীত আর একটি শ্যামাসঙ্গীত 'কালো মেয়ের পায়ের তলায়' প্লেব্যাক করান তপনদা। তপনদার ছবির জন্য যে কটি গান গেয়েছি, সব উনি আমাকে দিয়ে লাইভ রেকর্ডিং করিয়েছিলেন। কিন্তু 'তিনমূর্তি' ছবির শ্যুটিং শুরু হতেই তপনদা অমৃতলোকে যাত্রা করেন। সেই ছবি পরে পরিচালক রাজা সেন শেষ করেন। রাজাদা আমার কণ্ঠে একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত, 'মাঝে মাঝে তব দেখা পাই' এবং শ্যামাসংগীত 'কালো মেয়ের পায়ের তলায়' গানটি  'তিনমূর্তি' ছবিতে ব্যবহার করেন। [caption id="attachment_2425160" align="aligncenter" width="258"] তপন সিংহ[/caption] আপনি তো রাজা সেনের 'ল্যাবরেটরি' ছবিতে রাবিনা ট্যান্ডনের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করেছিলেন? অমিত: হ্যাঁ করেছি। একটা গানের দৃশ্যে। প্রথম প্লেব্যাক কবে করেন ? অমিত: ১৯৯৬ সালে পরিচালক অঞ্জন চৌধুরীর 'গীত সঙ্গীত' ছবিতে প্রথম প্লেব্যাক করি। ওই একই বছরে আশা অডিও থেকে আমার 'চিরদিনের গান' নামে অ্যালবাম প্রকাশিত হয়, যা স্ম্যাশ হিট হয়। তার অনেক আগেই ৯০-৯১ সাল থেকে আমি মাচার শো করছি। অঞ্জন চৌধুরী ছাড়াও সুখেন দাস, অনুপ সেনগুপ্ত, স্বপন সাহা, বিমল দে, চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, পার্থ জোয়ারদার, শতরুপা সান্যাল প্রমুখ পরিচালকদের ছবিতে প্লেব্যাক করেছি। প্লেব্যাক, না কি মাচার শো কোনটা বেশি উপভোগ করেন? অমিত: অবশ্যই মাচা। মাচার শো'র মতো আনন্দ কোথায়? দর্শকদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। আপনার সঙ্গীত শিক্ষার গুরু কে? অমিত: আসলে আমি গানের পরিবেশে বড় হয়েছি। আমার বাবা শান্তিনাথ গাঙ্গুলি ছিলেন একজন সঙ্গীতশিল্পী। বঙ্গীয় সঙ্গীত পরিষদের উনি পরীক্ষক ছিলেন। প্রচুর গান কম্পোজিশনও করেছেন। ছেলেবেলা থেকেই আমাদের বাড়িতে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়, মান্না দে, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দীপঙ্কর চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের আনাগোনা ছিল। তখন এতটাই ছোট ছিলাম যে গান আমার জীবিকা হবে ভাবিনি। তবে গান আমাকে খুবই আকর্ষণ করত। প্রথমে আমি পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ীর ছেলে পণ্ডিত শ্যামল লাহিড়ীর কাছে ক্লাসিক্যাল শিখেছি। এরপর পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর ভাই সঞ্জয় চক্রবর্তীর কাছে ভোকাল ট্রেনিং নিয়েছি। তবে আমার সঙ্গীত শিক্ষাগুরু হলেন গিটারিস্ট এবং বিখ্যাত কম্পোজার বুদ্ধদেব গঙ্গোপাধ্যায়।কিশোরকণ্ঠী হওয়ার পেছনে কারণ কী? অমিত: দেখুন অল্প বয়স থেকে আমি মান্না দের গান গাইতাম। আমার কলেজের বন্ধুরা যাঁরা এখন অনেকেই সঙ্গীত জগতের মানুষজন তাঁরা আমায় বলেছিলেন যে কিশোর কুমারের গান গাইতে। কারণ কিশোরকুমারের গলার সঙ্গে আমার গলা মেলে। তারপর থেকেই কিশোর কুমারের গান গাইতে শুরু করি। আমি ওঁকে অনুসরণ করি, কিন্তু অনুকরণ নয়। ওঁকে নকল করা যায় না। সেই ধৃষ্টতা আমার নেই। উনি মহাগায়ক। আমি নিজের মতো করেই গান গাই। এবার শ্রোতাদের যদি মনে হয় যে ওঁর মতো গাইছি সেটা তো শ্রোতাদের ব্যাপার। কখনও আপনার মনে হয়নি নিজস্ব গায়ন ভঙ্গিতে গান করার কথা? অমিত: অবশ্যই। কিশোরকুমার আমার আইডল। নিশ্চয়ই ওঁর গান গাই। কিন্তু নিজস্ব ভঙ্গিতে। এছাড়াও আমি অনেক আধুনিক গান, রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছি। ইন্দ্রাণী সেনের সঙ্গে আমার রবীন্দ্র সঙ্গীতের অ্যালবাম রয়েছে। আপনার গানের ভক্ত তো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা? অমিত: (মুচকি হেসে) আসলে বেশ কয়েক বছর আগে বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তুতোভাই শেখ হাফিজুর রহমানের সুরে ও কথায় আমি গান গেয়েছিলাম। গানটি শুনে খুব ভাল লেগেছিল শেখ হাসিনার। বাংলাদেশের অনেক জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম সেই সময় আমার এই গানটি নিয়ে লেখালেখি করেছেন এবং চ্যানেলে প্রচারিতও হয়েছে। আপনার ডেবিউ বলিউড ছবি 'সল্ট ব্রিজ'-এর গান অস্কার নমিনেশনের জন্য শর্ট লিস্টেড হয়েছিল? অমিত: হ্যাঁ, এই ছবির ৭ টি গান ৮৮তম অস্কার নমিনেশনের জন্য শর্ট লিস্টেড হয়েছিল। যার মধ্যে দুটি গান ছিল আমার গাওয়া। প্রথমটি 'কাঁপনে লাগে তুম,' দ্বিতীয়টি হল 'না জানে কিতনি দূর'। শুনেছি এমনও দিন গেছে একদিনে আপনি পাঁচটা মাচার শো করেছেন- অমিত: (হেসে) হ্যাঁ, ঠিকই বলছেন। সেসব দিন আলাদা ছিল। সন্ধে ছটায় বেরোতাম, পরের দিন ভোর সাতটায় ফিরেছি। সকাল ছটায় যখন লাস্ট শো করছি, তখন অনেক মানুষকে দেখেছি দাঁত ব্রাশ করতে করতে আমার গান শুনতে এসেছেন।আপনি তো কুমার শানুর অনেক জনপ্রিয় হিট গান শো-তে পারফর্ম করেন? অমিত: হ্যাঁ, অবশ্যই করি। 'কুছ না কহো 'গানটি গাই। আমার অত্যন্ত প্রিয় শিল্পী শানু দা, আমাকে খুব স্নেহ করেন। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'কিশোরকুমার জুনিয়র' ছবির প্রমোশনের সময় আমি, শানুদা, গৌতমদা (ঘোষ) একসঙ্গে নজরুল মঞ্চের স্টেজে পারফর্ম করেছি। এমনকি আমি সোলো ৫-৬ টি গানও গেয়েছিলাম। শানুদা ছাড়াও কবিতা কৃষ্ণমূর্তি, উদিত নারায়ণ, হরিহরণ, অলকা ইয়াগ্নিক, অভিজিৎ প্রমুখ নামজাদা অনেক শিল্পীর সঙ্গেই স্টেজ পারফর্ম করেছি।   একজন কণ্ঠীশিল্পীর ব্যক্তিগত অনেক স্ট্রাগল থাকে, আপনার ক্ষেত্রে ঠিক কীরকম স্ট্রাগল ছিল? অমিত: (কিছুক্ষণ চুপ থেকে) মারাত্মক। প্রথমদিকে অনেক আয়োজক আমাকে ভুলভাবে ব্যবহার করেছেন। প্রচুর আঘাত দিয়েছেন। ডেকে নিয়ে গিয়ে সারারাত বসিয়ে রেখেছেন, তবুও স্টেজে গান গাইতে দেননি। বাংলা ছবির এক বিখ্যাত পরিচালক, তিনি আজ আর বেঁচে নেই, তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে তিন চারদিন ধরে তাঁর বাড়িতে রিহার্সাল করিয়ে ফাইনালের দিন একই গান অন্য শিল্পীকে দিয়ে গাইয়েছেন। শিল্পী হতে গেলে অনেক মনের জোর, কষ্ট করার ক্ষমতা দরকার। এই পথ খুব মসৃণ নয়। লাইমলাইটে আসতে গেলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। শিল্পীর জীবন খুবই কষ্টের। আপনি তো কল্যাণজি আনন্দজি নাইটে আনন্দ জির সামনে পারফর্ম করেছিলেন। কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা? অমিত: হ্যাঁ। কল্যাণজি তো আর ইহলোকে নেই। আনন্দজি সস্ত্রীক কলকাতায় এসেছিলেন। আমার শিল্পী জীবনে যা বিরাট প্রাপ্তি। কলকাতায় এই অনুষ্ঠান হয়েছিল। আমার কণ্ঠে 'জিন্দেগি কা সফর' গানটি শুনে আনন্দজি কেঁদে ফেলেছিলেন। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে বলেছিলেন, 'ভবিষ্যতে সুযোগ এলে তোমাকে মুম্বই ডেকে নেব। খুবই আশীর্বাদ করেছেন আমাকে। দীর্ঘ সময় ধরে মাচার শো বন্ধ, কীভাবে সময় কাটছে ? অমিত: খুব ভালো প্রশ্ন। ঠিক, আমারও প্রশ্ন অন্য শিল্পীরা কীভাবে দিন কাটাচ্ছেন? আসলে আমি প্রতিদিন নিজেকে কাজের মধ্যে ব্যস্ত রাখি। নিয়ম করে রেওয়াজ ও শরীরচর্চা করি। আর যে কাজটা কোনওদিন আমি পারতাম না বা করিনি সেই রান্না করাও শিখে গেছি। বাড়িতে সময় কাটাতে রান্না করি। আর কিছুটা সময় ঈশ্বরের সেবায় মনোনিবেশ করি। দীর্ঘ সময় ধরে মাচার শিল্পীদের রোজগার বন্ধ, আপনি কি বিকল্প কোনও চিন্তা-ভাবনা করেছেন? অমিত: হ্যাঁ। কিছুদিন আগেই দেখলাম রূপঙ্কর সিরিয়ালে অভিনয় করছেন। আমার খুব ভালো লাগল। তখন থেকেই ভাবছি যে আমাকেও একটা কিছু করতে হবে, যেটা আমার পক্ষে সম্ভব। কনসেপচুয়ালাইজ যদি কিছু করা যায় সেই চিন্তাভাবনা করছি। যদি নিজেই একটা ব্যবসা শুরু করি, সেক্ষেত্রে তো বিরাট অঙ্কের টাকার প্রয়োজন। আর শিল্পীদের তো ব্যাঙ্ক লোন দেয় না। কী ফেলে এসেছি, কী হারিয়েছি- সেই চিন্তা-ভাবনা নিয়ে এখন বসে থাকলে চলবে না। বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে, নচেৎ চলবে না। আমি ভেবেছি মিউজিক্যাল ইনস্টিটিউশন করব। তারই পরিকল্পনা করছি। দেখা যাক কী হয়! যদিও এর আগে কোনওদিন গান শেখাইনি। আমার মতো যাঁরা মাচার শিল্পী তাঁদের প্রত্যেককেই আমি বলব যার যেরকম সামর্থ্য পুরোনো কথা ভুলে কিছু একটা কাজ করার। তার জন্য আমি মাছ বা সবজি বিক্রি করতে বলছি না। তবে একথাও ঠিক, অন্ধকারের পর আলো আসবেই। আর গান ছাড়া মানুষ কোনদিনও বাঁচতে পারে না। সঙ্গীত মানুষের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে। ঈশ্বরের কাছে এখন একটাই প্রার্থনা, গীতিকার গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের জনপ্রিয় গানের কথা ধার করে বলি 'অন্ধকারে আলো দিতে পুজোর প্রদীপ হয়ে জ্বলো'।

```