
ঐতিহাসিক ইডেন টেস্টের পিছনে স্রেফ ভগবানের আশীর্বাদ ছিল, বললেন সৌরভ।
শেষ আপডেট: 7 June 2024 15:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বলা হয়, টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসটাই এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিয়েছিল সেই ম্যাচ। আজও ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম গ্রেটেস্ট টেস্ট ম্যাচ বলে ধরা হয় তাকে। ২০০১ সালের মার্চে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে সেই ঐতিহাসিক ইডেন টেস্ট। রুদ্ধশ্বাস লড়াই করে ফলো-অন খেয়েও জিতে গিয়েছিল ভারত। কীভাবে হল অসাধ্যসাধন? কোন জাদুবলে চতুর্থ দিন একটাও উইকেট না হারিয়ে সারাদিন ব্যাট করে গেলেন রাহুল দ্রাবিড় ও ভিভিএস লক্ষ্মণ? প্রশ্নগুলো ভাবলে আজও চায়ের আড্ডায় মাথা চুলকোন বাঙালিরা। অনেকে বলেন, হয়েছিল সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের অধিনায়কত্বের জোরে। সেদিনের আগ্রাসী নেতা সৌরভ না থাকলে স্টিভ ওয়র অস্ট্রেলিয়াকে হারানো যেতে পারে, কেউ ভাবতে পারত?
মজার কথা, ভাবতে পারেননি সৌরভ নিজেও। রবিবার বেঙ্গল বিজনেস কাউন্সিলের এক জমজমাট অনুষ্ঠানে সলজ্জভাবে মহারাজ স্বীকার করেন, সবটা তাঁর হাতেও ছিল না। একটা সময় তিনিও কুলকিনারা পাননি, এই ম্যাচ কীভাবে জেতা যেতে পারে? নেহাত ভগবানের আশীর্বাদ ছিল বলেই শেষ অবধি জিততে পেরেছিল ভারত!
আজ তেরো বছর পার করেও ওই টেস্ট ম্যাচ বাঙালির মননে, আসমুদ্রহিমাচল ভারতীয় ক্রিকেট উন্মাদনার অন্যতম স্তম্ভ হয়ে রয়ে গিয়েছে। ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে 'বর্ডার-গাভাসকর' ট্রফির সেই সিরিজ খেলতে ভারতে আসে স্টিভ ওয়র তৎকালীন বিশ্বসেরা দল অস্ট্রেলিয়া। কে নেই তাতে? অ্যাডাম গিলক্রিস্ট, ম্যাথু হেডেন, রিকি পন্টিং, শেন ওয়ার্ন, গ্লেন ম্যাকগ্রা, জাস্টিন ল্যাঙ্গার! ওদিকে ভারতের নেহাতই তরুণ তুর্কির দল। তখনও ড্র করার জন্য টেস্ট খেলার অভ্যেস থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি ভারত। বিদেশে তো বটেই, ঘরের মাঠেও অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে টেস্ট জিতবে, এমন দুরাশা কারোর ছিল না। মুম্বইয়ে ওয়াংখেড়েতে প্রথম টেস্টেই দশ উইকেটে হেরে গেল ভারত। পরের টেস্ট ইডেনে। টসে জিতে ব্যাটিং নিল অস্ট্রেলিয়া। প্রথম ইনিংসে ৪৪৫ রানের বিরাট লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে দিল ব্যাগি গ্রিন ব্রিগেড। অধিনায়ক স্টিভ নিজেই সেঞ্চুরি হাঁকালেন!
অবশ্য স্টিভকে আউট করার পর ইডেন দেখেছিল সেই ঐতিহাসিক দৃশ্য। পর পর স্টিভ, গিলক্রিস্ট ও শেন ওয়ার্নকে আউট করে হ্যাটট্রিক করেন হরভজন সিং।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে ১৭১ রানেই সব উইকেট হারিয়ে ফেলে ভারত। অর্থাৎ, লজ্জার ফলো অন—তৃতীয় দিনে আবার ব্যাট করতে হবে সৌরভদের!
তখন কীভাবে ম্যাচ জেতার পরিকল্পনা করেছিলেন সৌরভ? বিশ্ববাংলা কনভেনশন সেন্টারে রবিবার সেই অনুষ্ঠানে এই প্রশ্নের জবাবে অকপটে প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক স্বীকার করলেন, তৃতীয় দিনে ব্যাট করতে নামার আগে তাঁদের কোনও পরিকল্পনাই ছিল না। তাঁর সোজাসাপ্টা কথা, 'দেয়ার ওয়াজ নো স্ট্র্যাটেজি। গড ওয়াজ কাইন্ড!' কিন্তু তারপরেই শোনালেন সেদিনের ম্যাচ জেতার আসল ‘কারিগর’ কে ছিলেন! বললেন, 'ফলো অন হয়ে গেছে। আমাদেরই ব্যাট করতে হবে। অস্ট্রেলিয়া কত এগিয়ে! কিন্তু কী জানেন? একটা গল্প শোনাই তাহলে। ওইদিন দুনিয়ায় কেবলমাত্র একজন জানতেন, ম্যাচটা আমরা জিতব। তিনি আমার শাশুড়ি। তৃতীয় দিনের শেষে ডোনা আর আমার শাশুড়ি আমার সঙ্গে দেখা করতে তাজবেঙ্গলে এসেছিলেন। শাশুড়ি দেখলেন, আমি খুবই হতাশ হয়ে বসে। জিজ্ঞেস করলেন, কী হয়েছে? বললাম, আমরা এই টেস্টও হারতে চলেছি। তিনি প্রথমে শুনে কিছু বললেন না। কিন্তু বেরনোর সময়, মানে, দরজা দিয়ে বেরোতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে তিনি ঘুরে বলে যান, 'তোমরা এই টেস্ট ম্যাচটা জিতবে!'
স্রেফ এইটুকুতেই প্রেক্ষাগৃহে যা হাততালি পড়ল, বোঝা গেল, আজও ওই টেস্টের উত্তেজনার ফল্গুধারা বাঙালির শিরায় বয়ে চলেছে। সৌরভ বললেন, 'আমি তো অবাক। প্রথমে ডোনাকে ফোন করিনি। শাশুড়িমা গাড়িতে বসে আছেন। পরে বাড়ি ফেরার পরে আমি ডোনাকে ফোন করে বেজায় বিরক্ত হয়ে বলি, 'আরে তোমার মা কি খেলাধুলো বোঝেন না নাকি? কীসব বললেন। ক্রিকেটের তো কিছুই বোঝেন না। আমরা ফলো অন খেয়ে গিয়েছি, অস্ট্রেলিয়া অত এগিয়ে। দ্যাখো, আমরা এটাও হারব, তুমি কিন্তু পরেরবার থেকে ওঁকে এনো না। কোনও ধারণাই নেই ওঁর ক্রিকেট নিয়ে।'
হতাশা বা রাগ চেপে বসলে তখন এরকমই হয়। কিন্তু তারপরের ঘটনা সত্যিই ইতিহাস। বস্তুত, ইতিহাসেও যার তুলনা বিরল। ৪ উইকেটে ২৫২ করা ভারতের হয়ে চতুর্থদিনে নামেন রাহুল দ্রাবিড় ও ভিভিএস লক্ষণ। তৃতীয়দিনেই আউট হয়ে গিয়েছেন শিবসুন্দর দাস, সদগোপ্পন রমেশ, শচীন তেণ্ডুলকর ও সৌরভ নিজে। কিন্তু চতুর্থদিন একটাও উইকেট না হারিয়ে সারাদিন ব্যাট করে গেলেন দ্রাবিড়-লক্ষণ জুটি। ক্রিকেট ইতিহাসের রেকর্ড বই তছনছ করে দেওয়া ইডেন টেস্টের চতুর্থ দিনের শেষে লক্ষ্মণ তোলেন ২৮১, দ্রাবিড় ১৮০। তারপর একেবারে উঠেপড়ে নামে ভারত। শুরু হয় সৌরভের কিংবদন্তী অধিনায়কত্ব। মাত্র ৬৮ ওভারে ২১২ রানে অল-আউট হয়ে যায় দুর্দান্ত অজি ব্যাটিং। একাই ছয় উইকেট নেন হরভজন। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী তোলপাড় করে সেই ম্যাচ জিতে যায় ভারত। কলকাতার রাস্তায় উৎসব শুরু হয়।
পঞ্চম দিন ম্যাচ জেতার পরে গোটা দলকে বেহালার বাড়িতে নেমন্তন্ন করেন সৌরভ। সেখানেই অবশ্য সৌরভকে যা জবাব দেওয়ার দিয়ে দেন সৌরভের শাশুড়ি স্বপ্না রায়। সৌরভ বলেন, 'আমার শ্বশুরবাড়ি একদম আমার বাড়ির পাশেই। বাস এল, পুলিশ দাঁড়িয়ে পুরো এলাকায়, ক্রিকেটাররা সব একে একে বাস থেকে নামছে, ভিড় জমে গিয়েছে। এদিকে আমার শাশুড়ি দেখি ওই অবস্থাতেও ব্যালকনি থেকে হাত নাড়ছেন আর চিৎকার করছেন, 'কী, বলেছিলাম তো জিতবে?' আমাকে সতীর্থরা জিজ্ঞেস করল, উনি কী বলছেন? আমি বললাম, উনিই একমাত্র যিনি তৃতীয় দিনে বলে গিয়েছিলেন, আমরা এই ম্যাচটা জিতব! উনি সেদিন এত খুশি হয়েছিলেন যে কী বলব!'
সেদিন অবধি ক্রিকেটীয় ব্যাপারে শাশুড়ির মতামতকে তেমন গুরুত্ব দিতেন না মহারাজ। তবে স্বীকার করলেন, সেদিনের পর থেকে কিন্তু ভীষণ গুরুত্ব দিয়েই শাশুড়ি যা যা বলতেন, শুনেছেন। বললেন, 'দেয়ার ওয়াজ নো স্ট্র্যাটেজি। কখনও অনেক কিছু এমনিই হয়ে যায়। তোমার কাছে ভাল দিন আর খারাপ দিনের পিছনে কোনও ব্যাখ্যা থাকে না। ওই ম্যাচটা ছিল ওরকমই। কিন্তু আমাদের আমূল বদলে দিয়েছিল ওই ম্যাচ। আমরা বিশ্বাস করতে শিখেছিলাম, আমরাও পারি। আমাদের দ্বারাও সম্ভব!'