পাকিস্তানের এহেন অবস্থানের প্রথম ভুক্তভোগী ক্রিকেটাররা। বিশ্বকাপ মানে নিজেকে প্রমাণ করার মঞ্চ। সেই সুযোগ কেড়ে নেওয়া হল।

মহসিন নকভি
শেষ আপডেট: 2 February 2026 17:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: শুধু খেলা নয়, মাঠে না নামার সিদ্ধান্তও কখনও কখনও মুখোশ খুলে দেয়। আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের (Pakistan) ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ বয়কট করার সিদ্ধান্তে ঠিক সেটাই হয়েছে। বাইরে থেকে যা ‘নীতি’ বলে সাজানো, ভেতরে তাকালেই বোঝা যাচ্ছে—এটা নীতির লড়াই নয়, বরং ভয়, অসহায়তা আর আত্মঘাতী রাজনীতির মিশেল।
টিম ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে ময়দানে নামলে কী হত? বর্তমান ফর্মে সূর্যকুমার যাদবদের (Suryakumar Yadav) কাছে পাকিস্তানের হার প্রায় অনিবার্য। হয়তো আড়াইশোর উপর রান, দ্রুত অলআউট—সব মিলিয়ে একপেশে ম্যাচ। তবু খেলাটা হলে অন্তত ক্রিকেটটা বাঁচত। পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা শিখত, সমর্থকরা দেখত আর বিশ্বকাপ বয়ে চলত তার স্বাভাবিক ছন্দে। কিন্তু পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (Pakistan Cricket Board) সাম্প্রতিক দর্শনে ‘পরাজয় থেকে শেখা’ নয়—হার এড়ানোই মূলমন্ত্র!
‘নীতি’র আড়ালে সুবিধাবাদ
পাকিস্তানের যুক্তি—বাংলাদেশের (Bangladesh) ম্যাচ ভেন্যু নিয়ে আইসিসির (International Cricket Council) সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে তারা ভারতের বিরুদ্ধে নামছে না। নিজেদের তুলে ধরছে ‘আঞ্চলিক সহানুভূতি’র রক্ষক হিসেবে। শুনতে মহৎ। কিন্তু ইতিহাস জানলে এই অবস্থান রীতিমতো সমালোচনার যোগ্য। একাত্তরের ক্ষত আজও বাংলাদেশের জনমানসে তাজা। গণতান্ত্রিক রায় মানতে অস্বীকার করে যে রাষ্ট্র সামরিক দমন চালিয়েছিল, সেই পাকিস্তান আজ হঠাৎ করে বাংলাদেশের স্বার্থরক্ষক! এই নাটকীয় সহানুভূতি আসলে ঢিলেঢালা অজুহাত—ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ এড়ানোর ছুতো। নীতির চাদরের নিচে লুকিয়ে রাজনৈতিক ভণ্ডামি!
বাছাই বয়কট: নীতি নয়, ভয়
যদি আইসিসির সিদ্ধান্তে সত্যিই আপত্তি থাকত, তাহলে একটাই সোজা পথ ছিল—পুরো টুর্নামেন্ট থেকেই সরে দাঁড়ানো। সেটাই হত নীতিগত প্রতিবাদ। কিন্তু পাকিস্তান তা করেনি। পাকিস্তান অন্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে খেলবে, আইসিসির অর্থ নেবে, হোটেল-ভ্রমণের সুবিধা ভোগ করবে—শুধু ভারতের (India) বিরুদ্ধে নামবে না! এই বাছাই করা বয়কট আসলে স্পষ্ট বার্তা দেয়: নীতি নয়, পিসিবি আসলে হিসেব কষে এগোয়। পুরো টুর্নামেন্ট ছাড়লে আইসিসির রাজস্ব বন্ধ হয়ে যাবে, বোর্ডের আর্থিক ভিত ভেঙে পড়বে, ভবিষ্যতের ইভেন্টেও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি থাকবে। তাই ‘নীতি’র নামে নিরাপদে পালানোর রাস্তা বেছে নেওয়া।
ক্রিকেটের নজরে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত
পাকিস্তানের এহেন অবস্থানের প্রথম ভুক্তভোগী ক্রিকেটাররা। বিশ্বকাপ মানে নিজেকে প্রমাণ করার মঞ্চ। সেই সুযোগ কেড়ে নেওয়া হল। দ্বিতীয় ক্ষতি সমর্থকদের—যাঁরা টাকা খরচ করে ম্যাচ দেখতে আসতেন। আর তৃতীয়, সবচেয়ে বড় আঘাত নামতে চলেছে পাকিস্তানের ক্রিকেট কাঠামোয়।
আইসিসির সদস্য চুক্তি অনুযায়ী ম্যাচ না খেললে আইনি জটিলতা তৈরি হবে। সম্প্রচারকারী সংস্থাগুলোর ক্ষতিপূরণ বাবদ বড় অঙ্কের দাবি আসতে পারে। সেই দায় শেষ পর্যন্ত এসে পড়বে পিসিবির ঘাড়েই। আইসিসি থেকে যে বার্ষিক অর্থ আসে, তার বড় অংশ আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়বে ঘরোয়া ক্রিকেট, খেলোয়াড়দের বেতন, স্টেডিয়াম রক্ষণাবেক্ষণ—সর্বত্র!
ভারতের অবস্থান, পাকিস্তানের সংকীর্ণতা
তুলনাটা এখানে স্পষ্ট। পহেলগেম সন্ত্রাসী হামলার পরেও ভারত বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ায়নি। নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলতে রাজি হয়েছে, যাতে বিশ্ব ক্রিকেটের স্বার্থ রক্ষা পায়। আগের এশিয়া কাপেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে এবং বারবার জিতেছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কথা তুলে ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচ বয়কট পাকিস্তানের অবস্থানকে আরও ছোট করে দেয়। এটা নীতি নয়, সংকীর্ণ রাজনীতি—ক্রিকেটকে ঢাল বানিয়ে নিজের দুর্বলতা ঢাকার চেষ্টা।
শেষ কথা
ক্রিকেটের ইতিহাসে এই বয়কট কোনও গৌরবের অধ্যায় হয়ে থাকবে না। বরং, মনে রাখা হবে এক সুযোগ হারানোর নিদর্শন হিসেবে। পাকিস্তান আজ একা দাঁড়িয়ে, উচ্চগ্রামে কিছু বলছে—কিন্তু মাঠে খেলাটা চলছে, বিশ্বকাপ এগোচ্ছে। বাছাই বয়কটে নৈতিকতার পাঠ দেওয়া চলে না। এতে জেতাও নেই, শেখাও নেই। রয়েছে শুধু অনুশোচনা আর ধীরে ধীরে ক্রিকেট মানচিত্রে আরও একধাপ পিছিয়ে পড়ার সমস্যা।