সংসারের চিটচিটে কলহপ্রিয়া রূপে তিনি পরিচিতি পেলেও তাঁর প্রতিভার কদর সে যুগে হয়নি। মীনাক্ষী গোস্বামী ছিলেন একজন অসাধারণ নৃত্যশিল্পী।

আধুনিকা উচ্চশিক্ষিতা মীনাক্ষী
শেষ আপডেট: 23 May 2025 15:05
'শোনো বড় বউ, আমি আগেও বলেছি আবারও বলছি,
যার স্বামীর যেমন রোজগার, তার ঘরে ঠিক তেমনি খাওয়া দাওয়া হবে।
এরপরেও যদি ছেলে হরলিক্স খেতে চায়, বাজার থেকে কুড়ি পয়সা দিয়ে হরলিক্স বিস্কুট এনে দিও কেমন।'
বিখ্যাত 'ছোট বউ' ছবির আইকনিক সংলাপ। যা এখন সামাজিক মাধ্যমেও বিশাল হিট। যে দজ্জাল শাশুড়ি এই সংলাপ বলেছিলেন তিনি অভিনেত্রী মীনাক্ষী গোস্বামী। ২১ মে ছিল যাঁর জন্মদিন।

'হা কপাল, এত বড় ধাড়ি মেয়ে হয়েচ এখনও মোচা কাটতে পারো না?' ... এমন সংলাপে 'ছোট বউ' ছবির দজ্জাল শাশুড়ি হয়েই তিনি এ প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয়। অথচ আশির দশকে তাঁর মতো আধুনিকা অভিনেত্রী খুব কমই এসেছিলেন টালিগঞ্জ পাড়ায়। তিনি মীনাক্ষী গোস্বামী। বানিজ্যিক ছবির অভিনেত্রীদের কদর কোনওদিন করেনি ফিল্ম সোসাইটি। কিন্তু দর্শকের মনে এঁদের স্থান সবার ওপরে। কারণ সংসারের চেনা ছন্দের এই চরিত্রগুলি মানুষের মনে গেঁথে আছে যে।
সংসারের চিটচিটে কলহপ্রিয়া রূপে তিনি পরিচিতি পেলেও তাঁর প্রতিভার কদর সে যুগে হয়নি। মীনাক্ষী গোস্বামী ছিলেন একজন অসাধারণ নৃত্যশিল্পী। তিনি 'ওয়াটার ব্যালে' নাচের যে ফর্ম নিয়ে এসেছিলেন বাংলা সংস্কৃতিতে, তা একেবারেই অভিনব।

আধুনিকা উচ্চশিক্ষিতা মীনাক্ষী অসম্ভব ভাল সুইমিং করতেন। জলের মধ্যে সাঁতার কেটে তিনি নাচের ছন্দ রচনা করেন। নব্বই দশকে তাঁর পরিচালনায় ওয়াটার ব্যালে দেখানো হত দূরদর্শনে। অ্যান্ডারসান ক্লাবে জলের মধ্যেই 'ওয়াটার ব্যালে'তে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শ্যামা', 'শাপমোচন' করতেন তাঁরা।
এছাড়াও তিনি 'ভলিবল প্লেয়িং' ও 'কার রেসিং' এ ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। কিন্তু প্রতিভাময়ী মীনাক্ষীর এই দিকটা একেবারেই আজ আলোচনার বাইরে।
মীনাক্ষী গোস্বামী আজ সোশ্যাল মিডিয়ার হাসির খোরাক,ট্রোল আইটেম, মিম আইটেম হয়ে গেছেন। এই অভিনেত্রীকে প্রকৃত ভাবে জানে ক'জন?

মীনাক্ষী গোস্বামী এলহাবাদের মেয়ে। ২১শে মে ১৯৩৩ সালে জন্ম। মঞ্চ থেকে তিনি উঠে আসেন। উত্তমকুমারের নায়িকা হবার সৌভাগ্য না হলেও, 'লোলা বোস' হয়ে তিনি উত্তমের সহ-অভিনেত্রী রূপে সবার পছন্দের। উত্তমের শেষ ছবি 'ওগো বধূ সুন্দরী'তে তিনি উত্তমকুমারের সাথে স্ক্রিন শেয়ার করে তাক লাগিয়ে দেন। তিনি কিন্তু ইতিবাচক রোল প্রথম দিকে করতেন, যেমন 'দক্ষযজ্ঞ' ছবিতে দক্ষ-পত্নী মেনকা হয়েছিলেন তিনি। তবে জনপ্রিয়তা পাননি।
মীনাক্ষী গোস্বামীকে দজ্জাল শাশুড়ি বানিয়েছিলেন অঞ্জন চৌধুরী তাঁর 'ছোট বউ' ছবি দিয়ে। তাঁর আগে মীনাক্ষী অনেক ছবি করলেও সেখানে তাঁর উপস্থিতি সিনেমাহল হাউসফুল করেনি। হিট এল অঞ্জন চৌধুরীর সংলাপে 'যার স্বামী যেমন রোজগার করবে তার ঘরে ঠিক তেমনি খাওয়া-দাওয়া হবে। এরপরও যদি ছেলে হরলিক্স খেতে চায়, ২০ পয়সা দিয়ে ছেলেকে হরলিক্স বিস্কুট এনে দিও কেমন!'

ঠাকুমার যে স্নেহময়ী রূপে আমরা পরিচিত তার থেকে একদম অন্য রূপের বিষাক্ত ঠাকুমা চরিত্রে মীনাক্ষী ঝড় তোলেন। আর এই হিট ওঁকে বাংলা ছবির ঘেরাটোপের ফাঁদে ফেলে দেয়। সেই এক ফর্মুলা ধরে 'ঘরের বউ' থেকে 'শ্বেত পাথরের থালা'র দজ্জাল শাশুড়ি তিনি। তাঁর পুত্রবধূর রোল করেছেন সন্ধ্যা রায় থেকে অপর্ণা সেন, যারা মীনাক্ষী গোস্বামীর থেকে টালিগঞ্জ পাড়ার সময়ের খতিয়ানে অনেক সিনিয়র। অনেক বেশী হিট মুখ তাঁরা। তবু তাঁদের পাশে ম্লান হয়নি মীনাক্ষীর অভিনয়। তাঁদের চুলের মুঠি ধরতে বাস্তবে মীনাক্ষীর বুক দুরু দুরু করলেও, পর্দা কাঁপত মীনাক্ষীর দাপটে।
'শিক্ষিতা বউ ঘরে এনে যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে! ছেলের বউয়ের প্রভাবে আমাদের মেয়ে কলির বারোটা বাজছে। আগে আমার সামনে কলি মুখে রা কাটত না! এখন কী চোপা হয়েছে। ওঁর বিয়ে দাও তাড়াতাড়ি।'
বহু চর্চিত 'চৌধুরী পরিবার' ছবিতে সংঘমিত্রা ব্যানার্জীর মায়ের চরিত্রে মীনাক্ষীকে কেউ ভুলতে পারবে! যিনি জামাইয়ের ব্যাঙ্কের পাশ বই চেক করতেন। জামাইয়ের মাকে তেলাপিয়া রাঁধার অপরাধে অপমান করে জামাইয়ের টাকাতেই রেস্টুরেন্টের বিল পেমেন্ট করতেন।

আধুনিকা থেকে আটপৌরে সব ভূমিকাতেই দুর্দান্ত ছিলেন মীনাক্ষী। তবে ওঁর মতো দক্ষ অভিনেত্রী উন্নতমনস্কা নারী সেই এক বাঁধা গতের বাইরে কাজ পাননি। মূল্যায়ন হয়নি প্রতিভার। একেবারেই টাইপকাস্ট হয়ে গিয়েছিলেন তিনি।
নয়ের দশকে অনেক দূরদর্শনের ধারাবাহিকে কাজ করেছেন তিনি। দূরদর্শনের প্রথম যুগে 'কলকাতার কাছে' ধারাবাহিকের পরিচালিক ছিলেন মীনাক্ষী গোস্বামী। তাঁকে শেষ দেখা গিয়েছিল ‘আলেয়ার আলো’ ছবিতে।

মীনাক্ষী গোস্বামীর প্রয়াণেও তোলপাড় হয়নি টলিউড ২০১২ সালে। নিভৃতে বিদায় নেন শিল্পী। খবরের কাগজে ছোট্ট বক্সে স্থান পায় এই প্রতিভাময়ী শিল্পীর শোকসংবাদ।