শুধু বিশেষজ্ঞরাই নন সাধারণ মানুষও তাদের প্রাথমিক প্রত্যাশা হিসেবে এই দুটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। ঢাকার অভিজাত এলাকা উত্তরার এক ব্যবসায়ীর কথায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সব কিছুতেই অনিশ্চয়তা বিরাজ করেছে।

ফাইল ছবি
শেষ আপডেট: 14 February 2026 07:27
বাংলাদেশে নতুন সরকারের (Bangladesh Elections) শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের দিন এখনও চূড়ান্ত হয়নি। ১৭ কিংবা ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হবে বলে এখনও পর্যন্ত ঠিক আছে। শনিবার বিকালে ভাবি প্রধানমন্ত্রী তথা বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান (Tarique rahman) তাঁর সরকার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে প্রথম দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সামনে মুখ খুলবেন।
ইতিমধ্যে চর্চা শুরু হয়েছে নতুন সরকারের সামনে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ গুলি নিয়ে। মনে করা হচ্ছে তারেক রহমান ওই বিষয়গুলিতে আজ তার ও দলের অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন।
বাংলাদেশ সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে বিএনপি (BNP) জোট পেয়েছে ২১২ আসন। এর মধ্যে বিএনপি একাই ২০৯ আসনে বিজয়ী হয়েছে। এটাই দলের সবচেয়ে ভাল ফল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই ফলাফলে মধ্যে বিএনপি'র জন্য দুটি বার্তা আছে। এক. বাংলাদেশের মানুষ স্থিতিশীল সরকার চেয়েছিল। সেই কারণে বিএনপি'র কোন ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব তারা রাখেনি। সাবেক শাসক দলটি যাতে বিরোধী পক্ষের সমর্থন ছাড়াই সরকার গড়তে পারে সে ব্যাপারে স্পষ্ট রায় দিয়েছেন মানুষ। দুই. এই রায় আরও স্পষ্ট মানুষ তাদের অপ্রাপ্তি পূরণে বিএনপিকে বেছে নিয়েছে। সেই কারণে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে ধানের শীষের প্রতীকের প্রার্থীদের তারা বিজয়ী করেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের একাধিক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন তারেক রহমানের (Tarique rahman) নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারকে তাৎক্ষণিকভাবে দুটি চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। একটি হল আর্থিক পরিস্থিতি। অপরটি আইনশৃঙ্খলা। এর মধ্যে প্রথমটি অত্যন্ত জরুরি বিষয় হলেও দ্রুত সেই ব্যাপারে পরিবর্তন আনা সরকারের পক্ষে সহজ হবে না। কারণ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আর্থিক পরিস্থিতি অনেকটা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। ভারত সহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক মজবুত করার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে তুলতে খানিক সময় লাগবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এক্ষেত্রেও বছরখানেকের বেশি সময় পাবে না নতুন সরকার।
নির্বাচনী ইস্তাহারে বিএনপি সব হাতে কাজ এবং বেকার ভাতা চালু করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সেই সঙ্গে গরিব পরিবার গুলিকে ফ্যামিলি কার্ডের মারফত নানা ধরনের সুবিধা প্রদানের কথা বলা হয়েছে দলের ইস্তাহারে। এগুলি বাস্তবায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন। বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার জানিয়েছে সরকারি কর্মচারীদের বর্ধিত বেতন বাবদ প্রয়োজনীয় অর্থ তারা আলাদা করে বরাদ্দ রেখেছে। বিএনপি'র এক শীর্ষ নেতার কথায়, দল সরকার গঠন না করা পর্যন্ত এই বিষয়টি স্পষ্ট হবে না। কিন্তু বিপুল জনসমর্থন ধরে রাখতে এই প্রতিশ্রুতি গুলি বাস্তবায়নে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন।
শুধু বিশেষজ্ঞরাই নন সাধারণ মানুষও তাদের প্রাথমিক প্রত্যাশা হিসেবে এই দুটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। ঢাকার অভিজাত এলাকা উত্তরার এক ব্যবসায়ীর কথায়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সব কিছুতেই অনিশ্চয়তা বিরাজ করেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে দোকানপাট ব্যবসা-বাণিজ্য চালানোই কোনও শৃঙ্খলা রক্ষা করা যায়নি। গোলমাল এর আশঙ্কায় কখনো একবেলা কখনও গোটা দিন দোকান বন্ধ রাখতে হয়েছে। কখন কি হয় এই আশঙ্কায় মালপত্রের অর্ডার দিতে গিয়ে ১৪ বার ভাবতে হয়েছে। ফলে দিনের পর দিন ক্রেতারা ফিরে গিয়েছেন। কার ওপর কখন আক্রমণ হয় এই আশঙ্কায় সন্ধ্যা নামতেই দোকানপাট বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মনিরুল ইসলামের কথায়, শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ করতে হবে। বিগত ১৮ মাসে সব কিছু ওলট-পালট হয়ে গিয়েছে। তার উপর নতুন সরকার আসার আগেই বিগত ১৮ মাসের নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্তারা অনেকেই সরে যাওয়ার আভাস দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভোটের আগের দিনই বলেছেন তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে আবার ক্লাসরুমে অধ্যাপনার কাজে ফিরে যেতে চান। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি বিভাগের প্রধানের বক্তব্য, গণঅভ্যুত্থানের পর লক্ষাধিক পড়ুয়া রাজনৈতিক কারণে শিক্ষাঙ্গনে ফিরতে পারেনি। তাদের পড়াশোনার সুযোগ করে না দিলে ভবিষ্যতে এই ছেলে মেয়েরা বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। সেটা সরকারের জন্য মঙ্গলদায়ক হবে না। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শৃঙ্খলা ফেলানো অত্যন্ত জরুরি।
সব মহলই মনে করছে আইনশৃঙ্খলার উন্নতির ব্যাপারে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ করতে হবে। যদিও এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা আবার বাংলাদেশ পুলিশ। ওয়াকিবহাল মহল বলছে গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে বাহিনী সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি হয়েছে তা এখনও কাটিয়ে ওঠা যায়নি। পুলিশবাহিনী এখনও পর্যন্ত পুরোপুরি সক্রিয় হওয়ার মতো মানসিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সেই কারণেই পুলিশের ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা সেনাবাহিনীকেও দেওয়া হয়েছিল। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেনা সেই ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশের নির্বাচনের ময়দানে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি নতুন নয়। তবে অতীতের নির্বাচনগুলিতে তারা মূলত স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে থাকত। প্রয়োজনের সিভিল প্রশাসন তাদের ব্যবহার করেছে। এবার পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনিও একইভাবে ভিড় নিয়ন্ত্রণ বুথ পাহারা দেওয়া এবং গণনা কেন্দ্রের সুরক্ষা দেওয়ার কাজ করেছে।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক মহলের একাধিক ব্যক্তি মনে করছেন, সেনাবাহিনী ক্যান্টনমেন্টে ফিরে যাওয়ার পর আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কতটা পারদর্শিতার পরিচয় দিতে পারবে তা নিয়ে সংশয় আছে। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিএনপির তরফে কোন বিজয় মিছিল করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দলের সাধারণ নেতাকর্মী সমর্থকেরা কতদিন সংযমের পরিচয় দেবেন তা স্পষ্ট নয়। রাজনৈতিক বৈরিতা শুরু হলে পুলিশকে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কতটা সম্ভব হবে সে প্রশ্ন বিএনপি নেতৃত্বকে ভাবাচ্ছে। আবার দিনের পর দিন সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা একটি নির্বাচিত সরকারের জন্য মোটেই স্বস্তিদায়ক হবে না। এই পরিস্থিতি তারেক রহমান কীভাবে মোকাবিলা করেন তা নিয়ে সব মহলের কৌতুহল রয়েছে।
বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেশের নানা জায়গায় পিটিয়ে হত্যা, তৌহিদি জনতার আস্ফলন, নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার প্রবণতা যেভাবে মাথাচাড়া দিয়েছিল তা নিয়ন্ত্রণ করা নতুন সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে।
সরকার গড়ার সুযোগ না পেলেও জামাইয়েতে ইসলামীর জোট এই নির্বাচনে শুধু ৭৭টি আসন পেয়েছে তাই নয়, তারা ভাল ভোট পেয়েছে। ফলে সংসদে তাদের মোকাবিলা করা যতটা সহজ হবে মাঠে ময়দানে রাজনীতিতে তা নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। ভোটের পরদিন শুক্রবারে জামাইকে ইসলামী ও তাদের জোট নেতারা সাংবাদিক বৈঠক করে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, নতুন সরকার সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়নসহ ঘোষিত প্রতিশ্রুতি পালনে ব্যর্থ হলে তারা বসে থাকবে না। এর পাশাপাশি বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হল ইসলামিক দলগুলিকে মোকাবিলা করে প্রশাসন পরিচালনা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশন, বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, নতুন সরকারের সামনে আইন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং একই সঙ্গে দেশ শাসন ও রাজনীতির ক্ষেত্রে পুরনো সংস্কৃতির পরিবর্তন করে দেশবাসীর আস্থা অর্জন করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিএনপি'র সামনে আর একটি বড় চ্যালেঞ্জ হল, সংস্কার প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন। গণভোটের 'হ্যাঁ'-এর পক্ষে বিপুল সমর্থনের কারণে সংবিধানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারগুলি বাস্তবায়ন করার পথ খুলে গিয়েছে। কিন্তু সংস্কারের সব বিষয়ে বিএনপি নেতৃত্ব পুরোপুরি সহমত নয়। জুলাই সনদে দল বেশকিছু ক্ষেত্রে তাদের আপত্তির কথা নথিভুক্ত করেছে। এছাড়া সনদে অন্তর্ভুক্ত আরও কয়েকটি বিষয়ে দল খুব একটা আগ্রহী নয়। এবারের নির্বাচনে বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের মর্যাদা রক্ষার কথা বলে মানুষের কাছে ভোট চেয়েছিল। জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হলে ১৯৭২ সালের প্রথম সংবিধানের আমূল পরিবর্তন করতে হবে। অতীতে বিএনপি'র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সংবিধানে বড় ধরনের পরিবর্তন করেছিলেন। পরবর্তীকালে তার অনেকগুলিই আদালতের রায়ে খারিজ হয়ে যায়। বিএনপি নেতৃত্ব এখন মনে করছে আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এমন কোনও সংস্কারের পুনরাবৃত্তি না করাই ভাল।
তারেক রহমানের সরকারের সামনে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলি নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে ব্রাসেলস ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা 'ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ'। তারা নতুন সরকারের জন্য অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে। ওই সংস্থা আবার 'আওয়ামী লিগকে ঘিরে রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছে। দলের হুইপ অমান্য করে আওয়ামী লিগের একাংশ এবার বিএনপিকে সমর্থন করেছে তা নিয়ে কোন সংশয় নেই। নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটিকে স্বাভাবিক রাজনীতিতে ফিরতে দেওয়া হবে কিনা সেই বিষয়ে বিএনপি নেতৃত্বকে গভীর ভাবনা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই ব্যাপারে তাদের সামনে বড় বাধা জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট। বৃহস্পতিবার ভোট শেষ হওয়ার পর থেকেই জামাত নেতারা বিএনপি'র নাম না করে অভিযোগ করতে শুরু করেছেন, একটি দল প্রত্যাখ্যাত ফ্যাসিস্টদের (পড়ুন আওয়ামী লিগ) পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে। সূত্রের খবর শুক্রবার ফলাফল কষ্ট হওয়ার পর দেশের বহু জায়গায় আওয়ামী লিগের বন্ধ অফিস ঘরে তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী সেগুলিতে তালা লাগিয়েছিল বলে বিএনপির অভিযোগ।
অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ তাদের রিপোর্টে বলেছে,
দুর্বল প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে পোশাক রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ধীরগতির অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবসহ একগুচ্ছ চ্যালেঞ্জ নতুন প্রশাসনকে মোকাবেলা করতে হবে। সামলাতে হবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ইস্যুসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চিনের লড়াইয়ের প্রভাব থেকে নিজেদেরও মুক্ত রেখে রোহিঙ্গা ইস্যুসহ জটিল বিদেশ নীতির বিভিন্ন দিক সামলানো।