Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
ফাঁকা স্টেডিয়ামে পিএসএলের আড়ালে ভারতের জ্বালানি সঙ্কট! নকভির ‘যুক্তি’তে হতভম্ব সাংবাদিকভোটের রেজাল্টে পর ফের ডিএ মামলার শুনানি শুনবে সুপ্রিম কোর্ট! ৬০০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, জানাল রাজ্যহরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের দাপট! মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বাধায় ফিরল বিদেশী ট্যাঙ্কারTCS Case: প্রথমে বন্ধুত্ব, তারপর টাকার টোপ! টিসিএসের অফিসে কীভাবে টার্গেট করা হত কর্মীদের‘ফোর্স ৩’ শুটিং জোরকদমে, পুরনো চরিত্রে ফিরছেন জন— নতুন চমক কারা?'মমতা চান না গোর্খারা শান্তিতে থাকুন, অধিকার ফিরে পান', দার্জিলিঙে ভিডিওবার্তা অমিত শাহেরগ্রাহকের পকেট বাঁচাতে ভারি খেসারত দিচ্ছে তেল কোম্পানিগুলি! প্রতিদিন লোকসান ১,৬০০ কোটিরইচ্ছেশক্তির বারুদে আগুন ধরাল ধোনির পেপ টক! নাইটদের বিঁধে দুরন্ত কামব্যাক নুর আহমেদেরময়মনসিংহে দীপুচন্দ্র দাসকে হত্যার প্রধান আসামিকে ১ বছরের অন্তর্বর্তী জামিন, কাঠগড়ায় বিচারপতিশয়তান বা কালু বলে আর ডাকা যাবে না! স্কুলের খাতায় পড়ুয়াদের নতুন পরিচয় দিচ্ছে রাজস্থান সরকার

সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় 'সফট আওয়ামী লিগ' তকমা‌ দিয়ে ধৃত সাংবাদিক, নিন্দা বিদ্ধ ইউনুস

সরকারের সমালোচনা বা পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় আওয়ামী লিগের দোসর কিংবা সব আওয়ামী লিগ তকমা দিয়ে সাংবাদিক গ্রেফতারের ঘটনার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ সংগঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ।

সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় 'সফট আওয়ামী লিগ' তকমা‌ দিয়ে ধৃত সাংবাদিক, নিন্দা বিদ্ধ ইউনুস

ধৃত সাংবাদিক

অর্পিতা দাশগুপ্ত

শেষ আপডেট: 16 December 2025 12:39

অমল সরকার

বাংলাদেশে একজন সিনিয়র সাংবাদিককে গ্রেফতার করা নিয়ে সমালোচনার সুনামির মুখে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।‌ নিন্দা বিদ্ধ প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুস (Journalist accused of speaking out against government)।‌ সে দেশের একাধিক সংগঠন এই গ্রেফতারের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদ। ‌ সরকারের ভূমিকার তীব্র নিন্দা করেছে একাধিক মানবাধিকার সংগঠন এবং ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ নামে সংগঠনটি। ‌যদিও প্রধান উপদেষ্টা মোহাম্মদ ইউনুসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম কয়েক মাস আগে মন্তব্য করেছিলেন, 'স্বাধীনতার পর গণমাধ্যমে এত বেশি স্বাধীনতা কেউ কোনও দিন এনজয় করেননি।'

সোমবার ধৃত সাংবাদিকের নাম আনিস আলমগীর ( Accused Journalist)। গত রবিবার সন্ধ্যায় ঢাকার ধানমন্ডির একটি জিম থেকে পুলিশ প্রথমে তাঁকে আটক করে। সোমবার সকালে তাঁকে সন্ত্রাস দমন আইনের গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পেশ করা হয়। ‌তার আগে গভীর রাতে জুলাই রেভল্যুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি সংগঠনের কেন্দ্রীয় সংগঠক আরিয়ান আহমেদ ঢাকার উত্তরার পশ্চিম থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আনিসের বিরুদ্ধে মামলা করেন। মামলায় সাংবাদিক আনিস আলমগীর, অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনসহ পাঁচজনকে আসামি করা হয়।‌

বিনা বিচারে এক বছরের বেশি জেল বন্দি সাংবাদিক দম্পতি সাকিল আহমেদ ও ফারজানা রুপা

প্রসঙ্গত অভিনেত্রী শাওন বাংলাদেশের (Bangladesh) জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী এবং বর্তমান আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের শাশুড়ি। শাওনকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। ‌তবে কয়েক মাস আগে প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসের (MD Yunus) প্রেস সচিব শফিকুল আলমের বিরুদ্ধে মুখ খোলায় শাওনকে পুলিশ তলব করেছিল বলে‌ অভিযোগ। প্রয়াত হুমায়ূন আহমেদের স্ত্রী সাওন প্রশ্ন তুলেছেন, বাংলাদেশ তবে বাক স্বাধীনতা কই। সমালোচনা করলেই কেন পুলিশ এসে দরজায় হাজির হবে?

সাংবাদিক আনিস আলমগীর সম্প্রতি বিভিন্ন টকশোতে ইউনুস সরকারের একাধিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। আওয়ামী লিগকে নির্বাচনের অংশ নিতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও মুখ খোলেন তিনি। বিদেশে অবস্থানকারী বেশ কয়েকজন সরকার ও জামাত-বিএনপিপন্থী ইউটিউবার আনিসকে গ্রেপ্তারের দাবিতে জোরদার প্রচার শুরু করে। তাঁরা অভিযোগ তোলে টক শো'তে এই সাংবাদিক যে কথা বলছেন তাকে আওয়ামী লিগের নেতাকর্মী সমর্থকেরা নাশকতায় উৎসাহ পাচ্ছে। সংসদ নির্বাচন বানচাল করার উদ্দেশ্যে এটা করা হচ্ছে। তাই অবিলম্বে এই সাংবাদিককে সন্ত্রাস দমন আইনে গ্রেফতার করা দরকার বলে ওই ইউটিউবাররা দাবি তোলেন।

পাশাপাশি দেশেও বেশ কয়েকজন ইউটিউবার তাতে গলা মেলান। সরব হয় আওয়ামী লিগ বিরোধী একাধিক সংগঠন। যদিও ওয়াকিবহাল মহলের বক্তব্য সাংবাদিক আমি আলমগীর কখনই আওয়ামী লিগের পক্ষে সরাসরি কোনও বক্তব্য প্রচার করেননি। তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনাকে মুছে ফেলার চেষ্টার বিরুদ্ধেই মূলত সরব ছিলেন। সেই সঙ্গে প্রশ্ন তোলেন, দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করলে তা কতটা যুক্ত সংগত হবে।

ফোনের মামলায় দ্রুত দুই সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু, ও শ্যামল দত্ত এবং বিশিষ্ট লেখক ও সমাজকর্মী শাহরিয়ার কবির।

সরকারের সমালোচনা বা পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলায় আওয়ামী লিগের দোসর কিংবা সব আওয়ামী লিগ তকমা দিয়ে সাংবাদিক গ্রেফতারের ঘটনার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ সংগঠিত হচ্ছে বাংলাদেশ। রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগে এক সাংবাদিককে গ্রেফতার করেছিল ঢাকার পুলিশ। সাড়ে তিন মাস জেলে থাকার পর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট তাঁকে জামিন দেয়। তিনিও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আলোচনা চক্রে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন।

আনিস আলমগীর সহ সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের ঘটনার বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের অন্যতম মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র। ‌তারা বলেছে, এ ধরনের গ্রেফতার 'ভিন্নমত দমনের একটি বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।' প্রসঙ্গত বাংলাদেশের প্রায় দেড় শতাধিক সাংবাদিক এই মুহূর্তে জেল বন্দি। তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই একাধিক খুনের মামলা দেওয়া হয়েছে। ‌দিনের পর দিন চেষ্টা চালিয়েও তাঁরা জামিন পাচ্ছেন না। এই সাংবাদিকদের মধ্যে বেশ কয়েকজন গুরুতর অসুস্থ। যেমন বাংলাদেশ এডিটর গিল্ডের সভাপতি সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ক্যান্সারে আক্রান্ত। ‌ গুরুতর অসুস্থ সাংবাদিক শ্যামল দত্ত এবং ফারজানা রুপা। এই মহিলা সাংবাদিককে একটি কনডেমড সেল বা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের রাখার জায়গায় বন্দি রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ।

কারাবন্দি গুরুতর অসুস্থ চার সাংবাদিক ফারজানা রূপা, শাকিল আহমেদ, মোজাম্মেল বাবু ও শ্যামল দত্তকে দীর্ঘদিন ধরে বন্দি করে রাখায় 'গভীর উদ্বেগ' প্রকাশ করে তাঁদের মুক্তি দিতে সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা -কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে)। প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুসকে লেখা এক চিঠিতে এই সংগঠন বলেছে, তাঁদের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে বর্তমানে চারজন সাংবাদিক হত্যা মামলায় আটক আছেন, যে অভিযোগগুলোর পক্ষে 'বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই' এবং তাদের 'সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে' তাঁদের এসব মামলায় জড়ানো হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

বাংলাদেশের 'কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী বাংলাদেশের গণমাধ্যম পরিস্থিতি' নিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। ‌ওই সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ডঃ ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, 'যে যুক্তিতে মি.আলমগীরকে আটক করা হোক না কেন এটি প্রশ্নবিদ্ধ। সরকার ভুল বার্তা দিচ্ছে।'

তাঁর কথায়, 'মুক্ত গণমাধ্যম, বাকস্বাধীনতা ও ভিন্নমত দমনে অব‍্যাহত বলপ্রয়োগ, আইনের অপপ্রয়োগ ও রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার অপব্যবহারের দায় অন্তর্বর্তী সরকার কোনওভাবেই এড়াতে পারেনা।

রাগ করেছি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪-এর ৫ অগস্টের পর থেকে চলতি বছর ১ নভেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে কমবেশি ৪৭৬টি ঘটনায় ১০৭৩ জন গণমাধ্যম কর্মী হামলা, মামলা, হত্যা, হয়রানিসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।

ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের এ সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পর হত্যা ও সহিংসতা মামলার বেড়াজালে জড়িয়ে আছে অন্তত ২৯৬ জন সাংবাদিকের নাম।'

মামলাগুলো বিশ্লেষণ করে পত্রিকাটি মন্তব্য করেছে: 'বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুলাইয়ে নিহতদের ত্যাগের বিচার প্রতিষ্ঠার বদলে মামলাগুলো এখন রাজনৈতিক লড়াইয়ের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।'

অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৫২৩টি সাংবাদিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে।

বাংলাদেশের জনপ্রিয় সাংবাদিক, মানবজমিন-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, চব্বিশের পরিবর্তনের পরে এমন পরিস্থিতি তিনি আশা করেননি।

তিনি বলেছেন, 'আশা করেছিলাম মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। স্বাধীনতার নামে হঠকারিতা যেন না করি তাও খেয়াল রাখতে হবে। তবে এসব ঘটনা আমাকে আতঙ্কিত করে। কেন জানি মনে হয় আগের পরিস্থিতিতির দিকেই যাচ্ছি আমরা। আমার মনে হয় সরকার প্রধান দৃষ্টি না দিলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।'

সম্পাদক পরিষদ বলেছে, 'এ ধরনের আচরণ অতীতের স্বৈরাচারী শাসনামলে সাংবাদিকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের স্মৃতি উসকে দেয়।' একজন সাংবাদিককে অভিযোগ ছাড়াই ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া, সেখানে আটকে রাখা, পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেফতার দেখানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

সাংবাদিক আনিস আলমগীর বাংলাদেশের অত্যন্ত পরিচিত মুখ। ‌জনপ্রিয় বাংলা দৈনিক আজকের কাগজ এর সাংবাদিক হিসেবে ২০০৩ সালে ইরাক যুদ্ধ কাভার করতে গিয়ে দেশজুড়ে পরিচিতি পান তিনি।‌ বর্তমানে তিনি সাংবাদিকতার শিক্ষকতাকে বেছে নিয়েছেন।

সম্পাদক পরিষদের বিবৃতিতে বলা হয়, ১৪ ডিসেম্বর কোনও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়াই সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে ডিবি কার্যালয়ে ডেকে নেওয়া হয়। তাঁকে সেখানে আটকে রেখে পরদিন তাঁর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করা হয় এবং গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এ ধরনের আচরণ অতীতের স্বৈরাচারী শাসনামলে সাংবাদিকদের প্রতি রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের স্মৃতি উসকে দেয়। এ ধরনের চর্চা তারা অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও দেখেছে। সেই সময় সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, হয়রানি ও নির্বিচার গ্রেপ্তার ছিল নিয়মিত ঘটনা। বর্তমান ঘটনাটি সেই দুঃখজনক বাস্তবতারই পুনরাবৃত্তি।


```