স্কিজোফ্রেনিয়া কী, কেন হয়, কী লক্ষণ—জানুন এই গুরুতর মানসিক রোগের কারণ, প্রভাব ও চিকিৎসার বিস্তারিত।

শেষ আপডেট: 4 April 2026 13:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভয়টা কিছুতেই মন থেকে যাচ্ছে না। আড়াল থেকে কেউ যেন সবসময় ভয় দেখায়। চোখের সামনে বিচিত্র সব দৃশ্য। কল্পনায় ভেসে আসে কারও কণ্ঠস্বর। অবচেতনেও দেখা দিয়ে যায় কেউ, উত্ত্যক্ত করে (Schizophrenia)।
মনের এই জটিল অসুখের কারণ ও চিকিৎসা এখনও অনেকটাই অধরা। মনের যেসব জটিল অসুখ নিয়ে গবেষণা চলছে স্কিৎজোফ্রেনিয়া তার মধ্যে একটি। এই অসুখ নিয়ে যেমন স্বচ্ছ ধারণা নেই, তেমনি আর পাঁচটা মনোরোগীর সঙ্গে স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগীকে আলাদা করাও কঠিন। ভারতীয়দের মধ্য়ে এই রোগই বেড়ে চলেছে।
আগরা মেন্টাল অ্যাসাইলামের মনোবিদেরা বলছেন, হাসপাতালে যেসব মানসিক রোগীরা আসেন তাঁদের মধ্যে অনেকেই স্কিৎজোফ্রেনিয়ার শিকার। কিন্তু এই রোগ যেহেতু চিহ্নিত করা মুশকিল, তাই স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগীদের বাকি মানসিক রোগীর সঙ্গেই গুলিয়ে ফেলেন অনেকে। স্কিৎজোফ্রেনিয়া মনের এমন এক জটিল অবস্থা তার থেরাপি সাধারণভাবে হয় না। আর পাঁচজন মনোরোগীর সঙ্গে স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগীর পার্থক্য আছে, তাদের চিকিৎসাপদ্ধতিও আলাদা। গবেষণা বলছে, মনের রোগে ভুগছেন এমন ভারতীয়দের সাত শতাংশই নাকি স্কিৎজোফ্রেনিয়ার শিকার।
স্কিজোফ্রেনিয়া একটি গুরুতর মানসিক রোগ, যা মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও আচরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। বাস্তব আর কল্পনার সীমারেখা এখানে ঝাপসা হয়ে যায়। রোগীরা এমন কিছু শুনতে বা দেখতে পারেন, যা আসলে নেই—যাকে বলা হয় হ্যালুসিনেশন।
এছাড়া, অনেক সময় তারা মনে করেন কেউ তাদের ক্ষতি করতে চাইছে, বা তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে—এই ভ্রান্ত ধারণাগুলোই ডিলিউশন নামে পরিচিত।
এই রোগের লক্ষণ ধীরে ধীরে প্রকাশ পায়। শুরুতে আচরণে সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা যায়—অকারণে ভয় পাওয়া, মানুষের সঙ্গে মেলামেশা কমিয়ে দেওয়া, মনোযোগে ঘাটতি।
পরবর্তীতে হ্যালুসিনেশন, অদ্ভুত বিশ্বাস, এলোমেলো কথা বলা বা চিন্তার ধারাবাহিকতা হারিয়ে ফেলার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। অনেক সময় রোগী নিজের যত্ন নেওয়াও বন্ধ করে দেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
স্কিজোফ্রেনিয়ার নির্দিষ্ট কোনও একক কারণ নেই। জিনগত প্রবণতা, মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা, পরিবেশগত চাপ—সব মিলিয়ে এই রোগের ঝুঁকি তৈরি হয়।
গবেষকরা মনে করেন, পরিবারের কারও এই রোগ থাকলে ঝুঁকি কিছুটা বাড়ে। আবার দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ বা ট্রমাও ভূমিকা রাখতে পারে।
স্কিৎজোফ্রেনিয়ার নির্দিষ্ট কারণ এখনও খুঁজে পাননি বিজ্ঞানীরা। কোনও অভিজ্ঞতার ফলে অত্যধিক মানসিক চাপ থেকে এই সমস্যা হতে পারে। এ ছাড়াও বংশগত কারণ, মস্তিষ্কে রাসায়নিকের ভারসাম্যের অভাব, ভাইরাল ইনফেকশন বা ইমিউন ডিসঅর্ডার থেকে এই রোগ হতে পারে।
ডিলিউশন বা মনগড়া অলীক বিশ্বাস ও হ্যালুসিনেশন বা এমন কিছু দেখা যার বাস্তবে কোনও অস্তিত্বই নেই--এই দুই উপসর্গই বেশি দেখা যায় স্কিৎজোফ্রেনিয়ার রোগীদের। মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১০০ জন মনোরোগীর ৭ শতাংশ এই রোগের শিকার। কিন্তু মুশকিল হল রোগটি নিয়ে স্বচ্ছ ধারণা নেই অধিকাংশ মানুষের। এমনকী মনোরোগের মধ্যে স্কিৎজোফ্রেনিয়াকে আলাদা করে চিহ্নিত করাও রীতিমত কঠিন কাজ। সাধারণত ১৬-৩০ বছর বয়সের মধ্যেই এই রোগের প্রথম লক্ষণ দেখা যায়।
ডিলিউশন হল এমন কোনও একটি বধ্যমূল ধারণা যা মাথার মধ্যে গেঁথে যায়। রোগী তখন সেই বিশ্বাস থেকে বাইরে আসতেই পারে না। যেমন রোগীর মনে হতে পারে, কেউ তার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে এবং তার জন্য নিজের পরিবারের বা আপনজনেদের মধ্যেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করতে পারে। যতই আপনজন হোক, রোগীর মনে হয় সেই তার শত্রু। আবার অনেকের মনে হয়, বাইরে কেউ তাকে নিয়ে সমালোচনা করছে, কেউ তার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। সে নিয়েও অযথা ভয় ও উদ্বেগ শুরু হয়।
হ্যালুসিনেশন হল কাল্পনিক কিছু দেখা বা শোনা। অডিটরি হ্যালুসিনেশন হলে, রোগীর মনে হবে বাইরে থেকে কোনও শব্দ বা কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে যেগুলির কোনও বাহ্যিক উৎস নেই। এরও নানা রকম প্রকাশ হতে পারে। মনে হতে পারে, এক বা একাধিক মানুষ তাঁকে নিয়ে সারা ক্ষণ কথা বলছে বা সমালোচনা করে চলেছে। বাইরে থেকে কেউ উত্যক্ত করছে, বা কেউ এমন আছে য়ে সারাক্ষণ তার সঙ্গে কথা বলছে।
এখনও পর্যন্ত এই নিরাময়ের কোনও উপায় বের করতে পারেননি মনোবিদরা। তবে ওষুধের সাহায্যে রোগের লক্ষণ ও প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তাই যত কম বয়সে রোগ ধরা পড়ে ও চিকিৎসা শুরু করা যায়, ততই ভাল।
এই অসুখের সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু তার উপসর্গ নয়—বরং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি। অনেকেই এটিকে “পাগলামি” বলে এড়িয়ে যান, ফলে রোগীরা চিকিৎসার বদলে অবহেলার শিকার হন।
ফলে একদিকে যেমন রোগ বাড়তে থাকে, অন্যদিকে সম্পর্ক ও সামাজিক জীবন ভেঙে পড়ে।
ভাল খবর হলো—স্কিজোফ্রেনিয়ার চিকিৎসা সম্ভব। ওষুধ, কাউন্সেলিং এবং সাইকোসোশ্যাল থেরাপির মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়, ততই রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন।
পরিবারের সমর্থনও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে বোঝা, ধৈর্য রাখা এবং নিয়মিত চিকিৎসার মধ্যে রাখা—এই তিনটি বিষয়ই সুস্থতার পথে বড় ভূমিকা নেয়।
দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র তথ্যভিত্তিক। এটি কোনও চিকিৎসা পরামর্শের বিকল্প নয়। সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য নানা মিডিয়ায় প্রকাশিত বক্তব্যের উপর ভিত্তি করে লেখা, যা আলাদা করে দ্য ওয়ালের তরফে যাচাই করা হয়নি।
Note: This report is intended for informational purposes only and is not a substitute for medical advice. It is based on statements published across social media and various other media platforms, which have not been independently verified by The Wall.