কুলথি ডাল এখন প্রাচীন ঘরোয়া খাবার থেকে উঠে এসেছে আধুনিক সুপারফুডের তালিকায়। পুষ্টিবিদরা কেন ডায়েটে কুলথি ডাল রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন, জেনে নিন তার উপকারিতা।

কুলথি বা কুলত্ত কলাই
শেষ আপডেট: 3 February 2026 12:02
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গ্রামবাংলার হাঁড়িতে কুলথি ডাল বা কুলত্ত কলাই (Horse gram বা Kulthi dal) নতুন কিছু নয়। খরার জমিতে জন্মানো এই ডাল বহুদিন ধরেই কৃষক পরিবারে শক্তির উৎস। কিন্তু সাম্প্রতিক পুষ্টিবিজ্ঞান বলছে, কুলথি শুধু লোকজ খাবার নয়—এটা একেবারে ‘নিউ এজ’ সুপারফুড। প্রোটিন, ফাইবার, আয়রন, ক্যালসিয়াম আর অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টে ঠাসা এই ডাল শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যায় কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে।
ভারতের কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র এবং উত্তরপ্রদেশের কিছু অংশে কুলথির চাষ হয়। কম জলেই টিকে থাকার ক্ষমতার জন্য এই ডাল টেকসই কৃষিরও বড় উদাহরণ। তবে প্রশ্ন একটাই—খেলে শরীরের ঠিক কী উপকার হয়?
হজম, কিডনি ও ওজন: ভিতর থেকে কাজ করে কুলথি
কুলথি ডালের সবচেয়ে বড় শক্তি তার উচ্চ ফাইবার (Dietary fibre)। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে খেলে অন্ত্রের গতি স্বাভাবিক থাকে, কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমে। জার্নাল অব ফার্মাকগনোসি অ্যান্ড ফাইটোকেমিস্ট্রি (Journal of Pharmacognosy and Phytochemistry) জানাচ্ছে, কুলথি ডাল মাঝারি মাত্রায় খেলে হজমশক্তি উন্নত হয় এবং আলসার সংক্রান্ত উপসর্গও হালকা হতে পারে। একই সঙ্গে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব নিউট্রিশন (Indian Journal of Nutrition)-এর গবেষণায় উঠে এসেছে, এই ডাল বিপাকক্রিয়া (Metabolic regulation) ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
কিডনির ক্ষেত্রেও কুলথির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (Chronic Kidney Disease) দ্রুত বাড়ছে বলে জানিয়েছে অ্যাডভান্সেস ইন কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড হেলথ (Advances in Kidney Diseases and Health)। গবেষণায় দেখা গেছে, এশিয়ান জার্নাল অব ডেয়ারি অ্যান্ড ফুড রিসার্চ (Asian Journal of Dairy and Food Research) অনুযায়ী কুলথি ডাল কিডনি স্টোন প্রতিরোধে সহায়ক হতে পারে এবং মূত্রনালীর স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
ওজন নিয়ন্ত্রণেও এই ডাল কার্যকর। কুলথি শরীরে ফ্যাট জমা কমাতে সাহায্য করে এবং শক্তি মুক্তির গতি নিয়ন্ত্রণ করে। একই জার্নালের রিপোর্ট অনুযায়ী, এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখে। আবার জার্নাল অব ফুড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড ন্যানোটেকনোলজি (Journal of Food Chemistry and Nanotechnology) বলছে, কুলথিতে থাকা পলিফেনল (Polyphenols) ও অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট বিপাক বাড়িয়ে স্থূলতার ঝুঁকি কমাতে পারে।
হৃদ্যন্ত্র, হাড় ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা
হৃদ্রোগ এখন ভারতের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (Indian Council of Medical Research) ও এইমস, দিল্লির (AIIMS New Delhi) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৫–৩০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক হৃদ্রোগের ঝুঁকিতে। কুলথি ডালের কোলেস্টেরল কমানোর ক্ষমতা এখানে কাজে আসে। পাশাপাশি কমপ্রিহেনসিভ রিভিউস ইন ফুড সায়েন্স অ্যান্ড ফুড সেফটি (Comprehensive Reviews in Food Science and Food Safety) জানাচ্ছে, এতে থাকা ক্যালসিয়াম ও আয়রন হাড়ের ঘনত্ব ও শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ক্ষেত্রেও কুলথি উপকারী। এতে থাকা প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে মজবুত করে। ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশনাল সায়েন্সেস (International Journal of Food and Nutritional Sciences) অনুযায়ী, কুলথির পুষ্টিগুণ শরীরকে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করে। আবার জার্নাল অব ফার্মাকগনোসি অ্যান্ড ফাইটোকেমিস্ট্রি বলছে, এর অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি গুণ রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
সব উপকারের মাঝেও সতর্কতা জরুরি। অতিরিক্ত কুলথি ডাল খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা বা উচ্চ অক্সালেট (Oxalates) জনিত সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে যাঁদের কিডনি সমস্যা রয়েছে, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। নতুন করে খাদ্যতালিকায় কুলথি যোগ করলে ধীরে শুরু করাই ভাল।
সব মিলিয়ে, কুলথি ডাল কোনও অলৌকিক ওষুধ নয়। কিন্তু সঠিক মাত্রায়, নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখলে এটি হজম থেকে হৃদযন্ত্র, ওজন নিয়ন্ত্রণ থেকে রোগপ্রতিরোধ—শরীরের একাধিক স্তরে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। প্রাচীন খাবারই যে ভবিষ্যতের পুষ্টির চাবিকাঠি, কুলথি ডাল তার জ্বলন্ত উদাহরণ।