সংসার চালানো, সন্তানের যত্ন নেওয়া, পরিবারের পাশে থাকা, এমনকি স্বামীর চাকরি ও বদলির সঙ্গে নিজের জীবনকে মানিয়ে নেওয়া - সবই শ্রমের অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর কোনওটাই ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টে ধরা পড়ে না বা করযোগ্য আয় তৈরি করে না, তবুও এই অদৃশ্য কাঠামোর উপরই অসংখ্য পরিবার দাঁড়িয়ে থাকে, মন্তব্য আদালতের।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 23 February 2026 15:31
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গৃহবধূ মানেই তিনি “অলস” - (homemaker rights) এই ধারণাকে সরাসরি ভ্রান্ত বলে জানাল দিল্লি হাইকোর্ট (Delhi High Court)। আদালতের পর্যবেক্ষণ, সংসারের কাজকর্ম সামলানো স্ত্রীকে কোনওভাবেই নিষ্ক্রিয় বলা যায় না (Delhi High Court homemaker maintenance ruling)। বরং তাঁর আড়ালে লুকিয়ে থাকা শ্রমই উপার্জনকারী সঙ্গীকে কার্যকরভাবে জীবনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। তাই ভরণপোষণ নির্ধারণের সময় তাঁর অবদান (unemployed wife maintenance) অস্বীকার করা অন্যায় ও অবাস্তব।
সোমবার এক সর্বভারতীয় সংবাদসংস্থার সূত্রে জানা যায়, বিচারপতি স্বরণা কান্তা শর্মা স্পষ্টভাবে বলেন, স্ত্রী কর্মরত নন মানেই তিনি অলস বা ইচ্ছাকৃতভাবে স্বামীর ওপর নির্ভরশীল - এমন ভাবা আইনের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। ভরণপোষণ নির্ধারণের সময় শুধু আর্থিক আয় নয়, সংসার পরিচালনায় তাঁর শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্যও (value of domestic labour court ruling) স্বীকার করতে হবে।
১৬ ফেব্রুয়ারির রায়ে আদালত মন্তব্য করে, “উপার্জন করছেন না মানেই সঙ্গী অলস - এই ধারণা গৃহস্থালির অবদান সম্পর্কে ভুল বোঝাবুঝির ফল। কোনও কর্মক্ষেত্রে কর্মরত না থাকাকে অলসতা বলা সহজ, কিন্তু একটি সংসার টিকিয়ে রাখতে যে শ্রম প্রয়োজন, তা স্বীকার করা অনেক কঠিন।”
আদালত আরও জানায়, একজন গৃহবধূ বসে থাকেন না। বরং তিনি এমন কিছু কাজ করেন, যার ফলে উপার্জনকারী সঙ্গী নিজের দায়িত্ব দক্ষতার সঙ্গে পালন করতে পারেন। ভরণপোষণের দাবির বিচার করতে গিয়ে এই অবদানকে উপেক্ষা করা হলে তা অন্যায্য হবে।
মামলার প্রেক্ষাপট
গার্হস্থ্য হিংসা সংক্রান্ত আইনের অধীনে স্বামী-স্ত্রী আলাদা বসবাস করছিলেন এমন এক মামলায় স্ত্রীর ভরণপোষণের আবেদন শুনানির সময় এই পর্যবেক্ষণ করে আদালত।
এর আগে ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অন্তর্বর্তী ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেছিল। যুক্তি ছিল - স্ত্রী সুস্থ, শিক্ষিত এবং কাজ করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি করেননি। আপিল আদালতও তাঁকে কোনও স্বস্তি দেয়নি।
দম্পতির বিয়ে হয়েছিল ২০১২ সালে। অভিযোগ, ২০২০ সালে স্বামী তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের নাবালক সন্তানকে ছেড়ে চলে যান।
হাইকোর্টে স্বামীর দাবি ছিল, স্ত্রী কাজ করতে সক্ষম, তাই শুধুমাত্র “অলস” থেকে ভরণপোষণ দাবি করতে পারেন না। তিনি আরও জানান, সন্তানের পড়াশোনার খরচ তিনিই বহন করছেন।
উপার্জনের ক্ষমতা আর বাস্তব আয় এক নয়
এই যুক্তি খারিজ করে আদালত স্পষ্ট করে দেয়, উপার্জনের সম্ভাবনা আর বাস্তব আয় এক জিনিস নয়। শুধু কাজ করার ক্ষমতা আছে - এই কারণ দেখিয়ে ভরণপোষণ অস্বীকার করা যায় না।
আদালত বলে, মহিলারা কাজ করতে চাইলে তাঁদের উৎসাহ দেওয়া উচিত। কিন্তু শুধুমাত্র তিনি উপার্জন করতে পারেন, এই যুক্তিতে ভরণপোষণ বন্ধ করা ভুল দৃষ্টিভঙ্গি।
সংসার চালানো, সন্তানের যত্ন নেওয়া, পরিবারের পাশে থাকা, এমনকি স্বামীর চাকরি ও বদলির সঙ্গে নিজের জীবনকে মানিয়ে নেওয়া - সবই শ্রমের অন্তর্ভুক্ত। এগুলোর কোনওটাই ব্যাঙ্ক স্টেটমেন্টে ধরা পড়ে না বা করযোগ্য আয় তৈরি করে না, তবুও এই অদৃশ্য কাঠামোর উপরই অসংখ্য পরিবার দাঁড়িয়ে থাকে, মন্তব্য আদালতের।
সামাজিক বাস্তবতা ও আইনের অবস্থান
আদালত আরও জানায়, ভারতীয় সমাজে এখনও অনেক ক্ষেত্রে বিয়ের পর মহিলাদের চাকরি ছাড়ার প্রত্যাশা করা হয়। কিন্তু বিবাহ সংক্রান্ত বিরোধে একই স্বামীরাই আবার “উচ্চশিক্ষিত অথচ ইচ্ছাকৃতভাবে বেকার” - এই অভিযোগ তুলে ভরণপোষণ দিতে অস্বীকার করেন। এই অবস্থানকে উৎসাহ দেওয়া যায় না। পরিবার গড়ে তুলতে যিনি সময়, শ্রম ও জীবনের বহু বছর ব্যয় করেছেন, তাঁকে আর্থিকভাবে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখা যাবে না।
এছাড়া আদালত স্বীকার করে, বিয়ে বা পারিবারিক দায়িত্বের জন্য দীর্ঘদিন পেশা থেকে দূরে থাকা কোনও মহিলা পরবর্তীতে আগের মতো চাকরি, বেতন বা পেশাগত অবস্থান ফিরে পাবেন - এমন আশা সবসময় বাস্তবসম্মত নয়।
রায়ের ফলাফল
বর্তমান মামলায় স্ত্রীর অতীত বা বর্তমান কোনও উপার্জনের প্রমাণ আদালতের সামনে ছিল না। সেই কারণেই তাঁকে ৫০ হাজার টাকা ভরণপোষণ দেওয়ার নির্দেশ দেয় আদালত।
ভরণপোষণ মামলা ও তিক্ততা
বিচার প্রক্রিয়ায় সরাসরি আলোচনা কঠিন হয়ে পড়ে - এ কথাও উল্লেখ করে আদালত। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী মাসিক খরচ বাড়িয়ে দেখান, আর স্বামী আয় কম দেখান বা আর্থিক অক্ষমতার দাবি করেন, এই প্রবণতাও আদালত তুলে ধরে।
সেই প্রসঙ্গে আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করে জানায়, ভরণপোষণ সংক্রান্ত মামলা প্রায়ই তীব্র বিরোধপূর্ণ হয়ে ওঠে, যা দীর্ঘমেয়াদে দম্পতি বা তাঁদের নাবালক সন্তানের কারও স্বার্থেই সহায়ক নয়। তাই মামলা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার বদলে বরং মধ্যস্থতা বা আলোচনা বেশি কার্যকর পথ হতে পারে। এতে উভয় পক্ষের প্রয়োজন ও সক্ষমতা বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করা যায় এবং পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়।