এই চুক্তিগুলি সংশ্লিষ্ট সব তরফের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার পর সম্পাদিত হয়েছে। তার ফলে একটা ভারসাম্যের জায়গায় পৌঁছোনো গেছে – যেখানে উন্নত বিশ্বের পক্ষেও সংশ্লিষ্ট বোঝাপড়া যথেষ্ট লাভজনক।

পীযূষ গোয়েল
শেষ আপডেট: 23 December 2025 19:02
ভারত–নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট –এফটিএ) বাণিজ্য কূটনীতির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) উদ্যোগকে কৌশলগত দিক থেকে অনেক দূরে এগিয়ে দিলো। এর ফলে, কাজের সুযোগ ও বিনিয়োগের প্রসারের পাশাপাশি সারা দেশে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, কৃষক, মহিলা ও যুবাদের সামনে যুগান্তকারী সম্ভাবনার দরজা খুলে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী কিস্টোফার লাক্সন-এর ঘোষিত এই সমঝোতা এবছর ভারতের সম্পাদিত সপ্তম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। গুরুত্বের দিক থেকে ২০২৫ সালে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিগুলির মধ্যে এটি তৃতীয়। এর আগে এই বছরেই ব্রিটেন এবং ওমানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিগুলিও সর্বাত্মক দৃষ্টিকোন থেকে সব পক্ষের কাছেই অত্যন্ত লাভজনক। যে বিষয়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ তা হল এই সব মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে উন্নত দেশগুলির সঙ্গে – যেখানে মাথা পিছু আয় ভারতের তুলনায় অনেকটাই বেশি। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পরিসরে ভারতের গ্রহণযোগ্যতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে এই বিষয়টি।
এই চুক্তিগুলি সংশ্লিষ্ট সব তরফের সঙ্গে বিস্তৃত আলোচনার পর সম্পাদিত হয়েছে। তার ফলে একটা ভারসাম্যের জায়গায় পৌঁছোনো গেছে – যেখানে উন্নত বিশ্বের পক্ষেও সংশ্লিষ্ট বোঝাপড়া যথেষ্ট লাভজনক।
কাজের সুযোগ, উন্নয়ন এবং বিপণনের সুযোগ
নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে স্বাক্ষরিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে একটি বড় বিষয় হল কর্মসংস্থান। ভারতীয় রপ্তানির ১০০ শতাংশ ক্ষেত্রেই নিউজিল্যান্ড শূন্য শুল্কের হার প্রয়োগ করবে। ফলে, ভারতের বস্ত্রবয়ন, চর্ম, পোশাক-আশাক, সামুদ্রিক পণ্য, রত্ন ও অলঙ্কর, হস্তশিল্প, কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো শ্রম নিবিড় ক্ষেত্রগুলি বিশেষ সুবিধা পাবে। প্রত্যক্ষভাবে উপকৃত হবেন ভারতীয় কর্মী, কারুশিল্পী, মহিলা উদ্যোগপতি এবং যুবসমাজ। অণু-ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প ক্ষেত্রের সামনেও নতুন সুযোগের দরজা খুলে যাবে।
বিপণন এবং পরিষেবা ক্ষেত্রেও ভারতের রপ্তানিতে গতি আসবে আরও অনেকটাই। এখানে টেলিযোগাযোগ, নির্মাণ, তথ্য প্রযুক্তি, পর্যটন সহ ১১৮ ধরনের পরিষেবার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখ্য। কাজের সুযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি ভারতীয় পেশাদার এবং ব্যবসায়ীরা নিজেদের তুলে ধরার নতুন সুযোগ পাবেন।
পেশাদার, শিক্ষার্থী এবং তরুণ প্রজন্মের সামনে সুযোগ
এই চুক্তির বলে ভারতীয় পেশাদার এবং শিক্ষার্থীদের নিউজিল্যান্ডে যাওয়া ও থাকার পথ আরও সুগম হবে। পড়ুয়ারা পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ করে উপার্জনের সুযোগ পাবেন। পড়াশোনার পর কর্মজগতে প্রবেশ করা তাদের পক্ষে আরও সহজ হবে। এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে উপযুক্ত ভিসা কাঠামোর ব্যবস্থা হয়েছে।
বিজ্ঞান – প্রযুক্তি – ইঞ্জিনিয়ারিং – গণিতে স্নাতক ভারতীয়রা ৩ বছর পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডে কাজের সুযোগ পাবেন। গবেষকরা এই সুযোগ পাবেন ৪ বছর ধরে। সারা বিশ্বের হাল-হকিকত জেনে উপযুক্ত কর্মজীবন বেছে নেওয়া অনেক সহজ হবে তাদের পক্ষে। অস্থায়ী কাজের জন্য নিউজিল্যান্ডের ভিসা পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠায় ভারতীয় পেশাদাররাও আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন সুলুক-সন্ধান খুঁজে নিতে পারবেন অধিকতর দক্ষতার সঙ্গে।
উপকৃত হবেন কৃষকরা
প্রধানমন্ত্রী মোদীর দৃষ্টিভঙ্গি একেবারে স্পষ্ট : আন্তর্জাতিক আঙিনায় ভারতীয় কৃষকদের অর্থবহ ভূমিকা নিশ্চিত করতেই হবে। এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সেই দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।
এই চুক্তির বলে দুদেশের মধ্যে গড়ে উঠবে কৃষি উৎপাদনশীলতা অংশীদারিত্ব – যার আওতায় থাকছে আপেল, কিউই এবং মধুর মতো পণ্য। উৎপাদনশীলতা বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে কৃষকের আয়। বাসমতি চালের জিআই-স্তরীয় সংরক্ষণেও দায়বদ্ধ থাকার কথা জানিয়েছে নিউজিল্যান্ড – যা ভারতের ধান চাষীদের কাছে খুশির খবর।
যে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হল ভারত ধান – গম – সয়া চাষ কিংবা দুগ্ধ উৎপাদন সহ গুরুত্বপূর্ণ কৃষি পণ্য ক্ষেত্রকে সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। দেশের অভ্যন্তরে কৃষকদের জীবিকা উপার্জনের পথে যাতে কোন সমস্যা না এসে পড়ে সেদিকে উপযুক্ত নজর রাখা হয়েছে।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির নতুন অর্থ এবং বিনিয়োগ সংক্রান্ত দায়বদ্ধতা
ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলির পরিসর ও প্রভাব এখন নিছক শুল্ক হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কৃষক, মহিলা, তরুণ প্রজন্ম, ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের সামনে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দেওয়ার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখার দিকটিও এর মধ্যে এসে পড়েছে।
বিভিন্ন চুক্তির সুবাদে ভারতীয় রপ্তানি তাৎক্ষণিক অথবা দ্রুত শুল্ক হ্রাসের সুবিধা পেয়েছে, কিন্তু ভারতের বাজার উন্মুক্ত করা হচ্ছে অনেক ভেবে-চিন্তে এবং ধীরে ধীরে। নিউজিল্যান্ড আগামী ১৫ বছরে প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ হিসেবে ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঢালার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইউরোপীয় ফি ট্রেড অ্যাসোসিয়েশনের অন্তর্ভুক্ত সুইৎজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড এবং লিকটেনস্টাইনের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রেও এই ধরনের শর্ত রয়েছে।
এর ফলে নিউজিল্যান্ডের দিক থেকে ভারতে বিনিয়োগ একলাফে অনেকটাই বেড়ে যাবে। বিগত ২৫ বছরে ভারতে ৬৪৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ এসেছে নিউজিল্যান্ড থেকে। নতুন বোঝাপড়া অনুযায়ী আগামী ১৫ বছরে বিনিয়োগ হবে ১.৮ লক্ষ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, ওই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার কিংবা শর্ত ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগও থাকছে ভারতের হাতে। এই বিনিয়োগের একটা বড় অংশ যাবে কৃষি, দুগ্ধ উৎপাদন, ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প, শিক্ষা, ক্রীড়া প্রভৃতি খাতে। ফলে, সর্বাত্মক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বিকাশের পথ প্রশস্ত হবে আরও।
এই প্রথম মহিলাদের তত্ত্বাবধানে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করলো ভারত
এই চুক্তি ঐতিহাসিক : সম্পূর্ণভাবে মহিলাদের তত্ত্বাবধানে ভারত এই প্রথম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদন করলো। এদেশের পক্ষে আলোচনাকারী দলের প্রধান থেকে শুরু করে পণ্য, পরিষেবা, বিনিয়োগ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিনিধিদের সকলেই মহিলা। নিউজিল্যান্ডে আমাদের রাষ্ট্রদূতও ভারতকন্যা। প্রধানমন্ত্রীর বিকাশ যজ্ঞে অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বপ্রদানে ভারতীয় নারীশক্তির অবদান ধারাবাহিক ভাবে ঊর্ধ্বমুখী।
মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশল
ভারত – নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এদেশের কৌশলগত অবস্থান আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে : উন্নত দেশের সঙ্গে অংশীদারিত্বের সুবাদে তাদের বাজার ভারতের শ্রমনিবিড় শিল্পের কাছে খুলে যাবে কিন্তু ভারতীয় পণ্যকে প্রতিযোগিতায় অন্যায্য অবস্থানে থাকতে হবে না।
আসলে মোদী সরকারের আমলে সম্পাদিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিগুলি প্রচলিত অর্থে নিছক আদান-প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না – মূল লক্ষ্য হল দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ এবং দেশের মানুষের, বিশেষত দরিদ্রের মধ্যে দরিদ্রতমদের, জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন। এই নীতির সুবাদেই ভারত ২০১৪-য় ‘ভঙ্গুর পাঁচ’ এর তালিকা থেকে বহুদূর উঠে এসে বর্তমানে বিশ্ব উন্নয়নের চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত। ভারত আজ একটি দৃঢ় অবস্থান থেকে আলোচনায় অংশ নেয় – দেশের কৃষি সহ সংবেদনশীল ক্ষেত্রগুলির স্বার্থ থাকে সুরক্ষিত। পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত হলে তবেই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
বাণিজ্য প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তন
ভারতের বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গী আগের তুলনায় একেবারেই আলাদা। অতীতের বাণিজ্য কৌশল কম দামি পণ্যের আমদানির আঘাতে জর্জরিত করে তুলতো ভারতের বাজারকে। পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই বিভিন্ন সমঝোতার ধাক্কায় কাজ হারাতেন বহু মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হতেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। প্রধানমন্ত্রী মোদীর দৃঢ় নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক আঙিনায় আলাপ-আলোচনার ক্ষেত্রে ভারতের মর্যাদা এবং গুরুত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছে।
ভারত – নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে অকুন্ঠ সাধুবাদ জানাচ্ছে এদেশের শিল্পমহল। ২০১৪ পর থেকে প্রশাসনে ইতিবাচক রূপান্তরের জন্যই এই ধরনের সমঝোতায় উপনীত হতে পেরেছে আমাদের দেশ।
পণ্য, পরিষেবা, বিনিয়োগ, যাতায়াত – সব দিকগুলিকেই সমন্বিত ও সংযুক্ত করে, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে যে চুক্তি ভারত সম্পাদিত করেছে তাতে আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ভারসাম্য যুক্ত বাণিজ্য কূটনীতির ছাপ স্পষ্ট। ভারত এবং নিউজিল্যান্ডের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পরিসর ক্রমবর্ধমান। এই প্রেক্ষিতে বাজারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি মানব কেন্দ্রিক বিকাশ এবং সর্বাত্মক উন্নয়ন সম্ভব করে তোলার দিশা নির্দেশ করেছে এই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি।
লেখক কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত।