সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা অভিযোগ করেন, আই-প্যাক (I-PAC)–এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে প্রমাণ সরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

শেষ আপডেট: 15 January 2026 18:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বাধীন তৃণমূল কংগ্রেসের সংঘাত ঘিরে কলকাতা হাইকোর্টে সৃষ্ট অশান্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। বৃহস্পতিবার শীর্ষ আদালত জানায়, এই ঘটনায় তারা “ভীষণভাবে বিচলিত” এবং বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর। আদালত এই মামলায় সংশ্লিষ্টদের নোটিস দিয়ে নিজ নিজ বক্তব্য জানতে চেয়েছে। বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র ও বিচারপতি বিপুল পাঞ্চোলি বেঞ্চ জানায়, আদালতের পরিবেশ কোনওভাবেই বিশৃঙ্খলার জায়গা হতে পারে না। শুনানির সময় আদালত মন্তব্য করে, “আবেগ হাতে বাইরে চলে যাওয়া উচিত নয়।”
ইডির অভিযোগ: ‘এটা চুরি’
কেন্দ্রীয় সংস্থার পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা অভিযোগ করেন, আই-প্যাক (I-PAC)–এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে প্রমাণ সরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, “এটা সরাসরি চুরির ঘটনা। এ ধরনের কাজ রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তাদের অপরাধে মদত দেওয়ার বার্তা দেয়।” এই যুক্তিতেই মেহতা পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ কর্তা রাজীব কুমার-সহ শীর্ষ পুলিশ আধিকারিকদের সাসপেনশনের আর্জি জানান। যদিও আদালত এ ব্যাপারে এদিন কোনও নির্দেশ দেয়নি।
‘এটা উন্মত্ত জনতার শাসন’
৯ জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্টে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা তুলে ধরে তুষার মেহতা বলেন, “এটা মোবোক্র্যাসি।” তাঁর অভিযোগ, মামলার সঙ্গে যুক্ত নন— এমন বহু আইনজীবী পরিকল্পিতভাবে আদালতে জড়ো হয়ে শুনানি ব্যাহত করেন। বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন, “হাইকোর্ট কি যন্তরমন্তরে পরিণত হয়েছিল?” মেহতার দাবি, একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ে আইনজীবীদের আদালতে হাজির হতে বলা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলের লিগ্যাল সেল এই ভিড় সংগঠিত করেছিল। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে সেই অভিযোগের সমর্থনে একাধিক হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটের স্ক্রিনশট পেশ করে ইডি। ইডির দাবি অনুযায়ী, ওইদিন মামলার শুনানি শুরু হওয়ার মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যেই আদালতের পরিবেশ এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে, বিচারক কার্যত এজলাস ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন।
‘কোর্ট নম্বর ৫-এ সবাই জড়ো হন’
সংবাদ মাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে টিভির হাতে আসা হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে দেখা যাচ্ছে, “Legal Minds” নামে একটি গ্রুপে বার্তা পাঠানো হয়— “সবাই কোর্ট নম্বর ৫-এ জড়ো হন, আইটেম নম্বর ১০।” এই বার্তার মাধ্যমে মামলার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন— এমন বহু আইনজীবীকেও নির্দিষ্ট সময়ে আদালতে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানানো হয় বলে ইডির অভিযোগ।
আদালত থেকে মিছিল— একই ডাক
চ্যাটে আরও একটি বার্তা ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে আইনজীবীদের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইডি-বিরোধী কর্মসূচিতে যোগ দিতে অনুরোধ করা হয়। বার্তায় লেখা ছিল— “আজ দুপুর ১টায় বি গেটে জমায়েত। সবাই আসুন। আমরা মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইডি অভিযানের বিরুদ্ধে র্যালিতে যাব। বাস ও গাড়ির ব্যবস্থা করা হয়েছে।” ইডির দাবি, এই দুই ডাকে স্পষ্ট— আদালতের ভিতরে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা এবং বাইরে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ভিড় জমানো— দু’টিই একই সূত্রে পরিচালিত হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পরে কলকাতা হাইকোর্ট মামলার সঙ্গে যুক্ত আইনজীবীদের ছাড়া অন্যদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টে তৃণমূলের আবেদন খারিজ হয়ে যায়। যদিও তৃণমূলের অভিযোগ, ইডি গোপন রাজনৈতিক নথি বাজেয়াপ্ত করেছে— যা ইডি অস্বীকার করেছে।
কপিল সিবালের প্রশ্ন: ভোটের আগে কেন তল্লাশি?
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিবাল প্রশ্ন তোলেন, বিধানসভা ভোটের আগে ইডির পশ্চিমবঙ্গে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। তিনি বলেন, “কয়লা কেলেঙ্কারি মামলায় শেষ অগ্রগতি হয়েছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। তাহলে ২০২৬ সালে হঠাৎ কেন এই তল্লাশি?” সিবালের দাবি, আই-প্যাক পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী কৌশল রূপায়ণের দায়িত্বে রয়েছে এবং তৃণমূলের সঙ্গে তাদের একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি রয়েছে। “ওখানে থাকা সমস্ত নির্বাচনী তথ্য অত্যন্ত গোপনীয়। সেই তথ্য রক্ষার অধিকার দলের চেয়ারপার্সন হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর রয়েছে,” বলেন তিনি। তবে বেঞ্চ স্পষ্ট জানায়, এই যুক্তিতে নোটিস জারি থেকে আদালত বিরত থাকতে পারে না। বিচারপতিরা বলেন, “আপনাদের ভোটের তথ্য নেওয়ার অভিপ্রায় থাকলে তারা তা নিয়ে নিত। কিন্তু তা হয়নি। আপনি আমাদের নোটিস জারি করতে বাধা দিতে পারেন না।” উত্তরে সিবাল বলেন, “নিশ্চয়ই পারি না, আমরা কেবল আপনাদের বোঝানোর চেষ্টা করছি।”
‘দু’টি আদালতে একসঙ্গে মামলা’
রাজ্য সরকারের ও ডিজিপির পক্ষে সওয়ালকারী অভিজ্ঞ আইনজীবী অভিষেক সিংভি অভিযোগ করেন, ইডি একই বিষয় নিয়ে কলকাতা হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্ট— দুই জায়গাতেই মামলা করছে। ৯ জানুয়ারির বিশৃঙ্খলার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সেদিন আবেগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়েছিল— তা মানছি। কিন্তু সেটাকে অজুহাত করে দু’টি আদালতে একসঙ্গে যাওয়া ঠিক নয়।” এর উত্তরে বেঞ্চ কড়া ভাষায় জানায়, “আবেগ বারবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে না।”
সব মিলিয়ে, ED vs TMC, I-PAC তল্লাশি, মোবোক্র্যাসি বিতর্ক এবং নির্বাচনের আগে কেন্দ্রীয় সংস্থার ভূমিকা— এই সব প্রশ্ন ঘিরে এখন নজর সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত নির্দেশের দিকে। আদালতের পরবর্তী পর্যবেক্ষণই ঠিক করবে, এই রাজনৈতিক-আইনি সংঘাত কোন দিকে মোড় নেয়। মামলার পরবর্তী শুনানি হবে দু সপ্তাহ পর।