রাষ্ট্রপতি শাসন মানে রাজ্য সরকারের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকার তথা দিল্লির শাসন জারি। সাধারণভাবে রাজ্যপালের সুপারিশ ক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি ভবন রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের বিজ্ঞপ্তি জারি করে থাকে। তবে জমানা নির্বিশেষে রাজ্যপালদের অন্ধকারে রেখে সরাসরি দিল্লির ইচ্ছায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারির একাধিক দৃষ্টান্ত আছে।

শেষ আপডেট: 8 March 2026 17:11
পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন (Presidential Rule) জারির সম্ভাবনা নিয়ে বিগত কয়েক মাস যাবত তৃণমূল (TMC) ও বিজেপির (BJP) অন্দরে আলোচনা চলছে। সাধারণভাবে মনে হতে পারে, শুধু বিজেপিই রাষ্ট্রপতি শাসন প্রত্যাশা করে। রাজনৈতিক বাস্তবতা মেনে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসেরও রাষ্ট্রপতি শাসনের প্রত্যাশা অসম্ভব নয়। অতীতে একাধিক রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসনের সুবাদে শাসক দল ভোটের বাক্সে শহিদের মর্যাদার ষোলআনা লাভ তুলেছে। ধর্মতলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) ধর্ণা কর্মসূচি (Protest) তেমন সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি বলা চলে। সত্যিই রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে তৃণমূলের গোটা রাজ্য অচল করে দেওয়া অসম্ভব নয়।
রাষ্ট্রপতি শাসন মানে রাজ্য সরকারের পরিবর্তে কেন্দ্রীয় সরকার তথা দিল্লির শাসন জারি। সাধারণভাবে রাজ্যপালের সুপারিশ ক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের মতামতের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি ভবন রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের বিজ্ঞপ্তি জারি করে থাকে। তবে জমানা নির্বিশেষে রাজ্যপালদের অন্ধকারে রেখে সরাসরি দিল্লির ইচ্ছায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারির একাধিক দৃষ্টান্ত আছে।
পশ্চিমবঙ্গে যদি সত্যিই অদূর ভবিষ্যতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয় তবে সেক্ষেত্রে সরাসরি দিল্লির সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা দুটি কারণে কম। এক. পশ্চিমবঙ্গে সিভি আনন্দ বোসের জায়গায় দিল্লি যাঁকে রাজ্যপাল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেই আরএন রবি রাজ্য সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতার নজির করেছেন তামিলনাড়ুতে। এজন্য তিন তিনবার সুপ্রিম কোর্টের ভৎসর্নার মুখে পড়েছেন এই অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস। দক্ষিণের ওই রাজ্যটিতে তার একাধিক সিদ্ধান্ত ছিল ব্যতিক্রমী, বিতর্কিত এবং রাজ্যপাল পদের জন্য বেমানান। সেই তিনি বাংলার রাজ্যপাল হয়ে আসছেন শুনে অনেকের মধ্যেই রাষ্ট্রপতি শাসনের শঙ্কা জেগেছে।
ধরে নেওয়া যায় দায়িত্বভার নেওয়ার পর নতুন রাজ্যপাল প্রথমেই রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর অভিযোগ নিয়ে রাজ্য সরকারের জবাবদিহি চেয়ে সংঘাতের পথে অগ্রসর হতে পারেন। উত্তরবঙ্গ সফরে রাষ্ট্রপতির প্রতি রাজ্য প্রশাসনের ব্যবস্থাপনা প্রশাসনিক বিধিসম্মত তথা সঠিক ছিল না। রাষ্ট্রপতির অমর্যাদা হয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই
একই সঙ্গে বলতে হয়, রাষ্ট্রপতির প্রতিক্রিয়া সাংবিধানিক পদমর্যাদার সঙ্গে মানানসই ও শিষ্টাচার সম্মত ছিল না। এই ব্যাপারে প্রশাসনিক স্তরেই রাষ্ট্রপতি ভবন রাজ্য সরকারকে রাষ্ট্রপতির অসন্তোষের কথা জানিয়ে দিতে পারত। রাষ্ট্রপতির মত পদাধিকারীর ক্ষেত্রে প্রোটোকল বা নিয়মবিধির সামান্য বিচ্যুতিও গ্রাহ্য করা হয় না। আমার মনে আছে শঙ্কর দয়াল শর্মা রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন কলকাতা সফর শেষে তিনি ফিরে যাওয়ার সময় বিমানবন্দরে রাজ্য পুলিশের ডিজি উপস্থিত ছিলেন না। ডিজির অনুপস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবন পরদিনই রাজ্যের মুখ্য সচিবকে চিঠি দিয়ে নির্দেশ দিয়েছিল পুলিশ কর্তাকে যেন সতর্ক করা হয়। কিন্তু রাষ্ট্রপতি ভবন প্রকাশ্যে এ নিয়ে টুঁ শব্দটি করেনি। আমার মতে দ্রৌপদী মুর্মু সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হেঁটে রাষ্ট্রপতি পদকে বিতর্কে জড়িয়েছেন। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে যখন নির্বাচন আসন্ন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্য সরকারের বিবাদ তুঙ্গে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতেই সাংবিধানিক প্রধানদের স্বকীয়তার পরিচয় দিতে হয়।
দুই কক্ষের একটিরও সদস্য না হলেও ভারতের সংসদের শীর্ষে অবস্থান করেন রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর নতুন সংসদ ভবনের উদ্বোধন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্রৌপদী মুর্মু প্রশ্ন তুললে বরং রাষ্ট্রের সাংবিধানিক প্রধানের মর্যাদা আরও সমুন্নত হতো। কিন্তু সংসদ ভবনের শিলান্যাসে ডাক না পেয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দও প্রশ্ন তোলেননি। এগুলি ছিল গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন। যে প্রশ্নগুলি উত্থাপন করে রাষ্ট্রপতি পদের প্রতি যথার্থ মর্যাদা জ্ঞাপন হতে পারত।
শনিবার উত্তরবঙ্গ সফরে দ্রৌপদী মুর্মুর প্রকাশ্যে অসন্তোষ ব্যক্ত করার ঘটনা নিয়ে অনেককেই বলতে শুনেছি, এরপর রাষ্ট্রপতি শাসনই বাংলার ভবিতব্য। গত শতকের সত্তরের দশক পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি শাসন জারিতে প্রথম পাঁচটি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নাম থাকত।
এরাজ্যে এখনও পর্যন্ত পাঁচ বার প্রেসিডেন্ট রুল জারি হয়েছে। শেষবার হয়েছিল সত্তরের দশকের শেষে। তারপর বিহার, উত্তরপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক, তামিলনাড়ু, জম্মু-কাশ্মীর এবং উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলি-সহ একাধিক রাজ্যে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার প্রথম পাঁচ বছর রাষ্ট্রপতি শাসন জারির আশঙ্কা প্রচার করেই নিরাপদে ক্ষমতায় টিকে গিয়েছিল। গনিখান চৌধুরীসহ কংগ্রেসের তৎকালীন নেতারা বামফ্রন্ট সরকারকে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করার কথা বললেও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করে সিপিএমকে শহিদ হওয়ার সুযোগ দেননি।
তারপর গঙ্গা যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। বিগত কয়েক বছর যাবত রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ঘটনা এক প্রকার বিক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত। তবে তা কেন্দ্রের বদান্যতা নয়। একাধিক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির মতো পদক্ষেপ হতে হবে নিতান্তই নিরুপায় পরিস্থিতিতে। নরেন্দ্র মোদী সরকারের সুপারিশ মেনে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মত সংবিধান ও প্রশাসন বিশেষজ্ঞ রাষ্ট্রপতি পর্যন্ত বিধি বহির্ভূতভাবে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির কারণে সর্বোচ্চ আদালতের সমালোচনার মুখে পড়েন।
অতীতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে মূলত রাজনৈতিক হিংসা সহ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি, শাসক দলে বিভাজন এবং দলবদলজনিত করে পরিস্থিতি মোকাবিলায়। পশ্চিমবঙ্গে এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির মতো কেন্দ্রের হাতে এই জাতীয় কোন ধারালো অস্ত্র নেই। ২০২১ এর বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী হিংসাত্মক পরিস্থিতি তুলনায় এবার ভোটের ঠিক মুখে অবস্থা তুলনামূলকভাবে অনেকটা ভাল।
তারপরও জোর দিয়ে বলার অবকাশ নেই যে পশ্চিমবঙ্গে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হবে না। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বাংলায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তাতে নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। যে ষাট লাখ ভোটারের ভোটদান ঘিরে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে তারা আইনি পথে ভোটাধিকার আদায় করতে চাইলে আদালত রাজ্যে পুরো এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ না করে ভোট স্থগিত রাখার নির্দেশ দিতে পারে।
সে ক্ষেত্রে, রাজ্য বিধানসভা এবং রাজ্য সরকারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া অসম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি শাসনই একমাত্র বিকল্প। এবং সেই সিদ্ধান্তকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বলার অবকাশ তেমন একটা থাকবে না।
বিজেপি তথা কেন্দ্রীয় সরকার এমন কৌশল নিয়ে এগোতে পারে এই আশঙ্কা তৃণমূলের মধ্যে আছে। সেই কারণেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অতীতের সিপিএম তথা বামফ্রন্টের মতন বাংলার বিরুদ্ধে দিল্লির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে সরব।
অতীতে অনেক রাজ্যেই এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির নজির আছে। এর মধ্যে দুটি রাজ্য বিহার এবং ত্রিপুরায় সরকার ও বিধানসভার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সময় সেখানে থাকার সুযোগ হয়েছিল আমার। বিহারে ১৯৯৫ এর বিধানসভা ভোটে তৎকালীন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টিএন শেসন প্রথমে দু দফায় ভোট ঘোষণার পর শেষ পর্যন্ত নির্বাচন করিয়েছিলেন পাঁচ পর্বে। এক পর্যায়ে রাজ্য সরকার ও বিধানসভার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। আমার বেশ মনে আছে মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদব কীভাবে নির্বাচন কমিশন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লোক খেপিয়ে ছিলেন। যদিও ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি শেসনের সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করছিলেন। কারণ, লালু প্রসাদ বুঝেছিলেন, রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অপশাসনের সব অভিযোগ মুহূর্তে চাপা পড়ে যাবে। তিনি শহিদের মর্যাদা পেয়ে যাবেন। বাস্তবে তাই হয়েছিল। দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে ফের মুখ্যমন্ত্রী হন তিনি।
ত্রিপুরার ঘটনাটি খানিক পৃথক। ১৯৯৩-এ সেখানে কংগ্রেসের সমীর রঞ্জন বর্মনের সরকার। ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকার আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েনের জন্য লম্বা সময় ধার্য করে। ফলে স্থগিত ভোট ফের করার আগে সরকার ও বিধানসভার মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। ভোট হয় রাষ্ট্রপতি শাসনাধীনে। সমীর বর্মন অবশ্য সরকার টেকাতে পারেননি। ক্ষমতায় ফিরেছিল সিপিএম।
বিহার ও ত্রিপুরার রাষ্ট্রপতি শাসনে বিধানসভা ভোটের পর বিগত তিন সাড়ে তিন দশকে পরিস্থিতির অনেক বদল ঘটে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পিছিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করলে তৃণমূল কংগ্রেস যেমন শহিদের মর্যাদা পেতে পারে, তেমনই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অন্তত মাস ছয়েক বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকার আয়ুষ্মান ভারত সহ দিল্লির জনমুখী কর্মসূচিগুলি পশ্চিমবঙ্গে মিশন মোডে বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। ১০০ দিনের কাজ এবং আবাস ও সড়ক যোজনায় বিপুল অর্থ বরাদ্দ করে বাংলায় সরকার গড়ার আগেই রাজ্যবাসীকে খুশি করার সুযোগ তারা হাতছাড়া করবে না। কেন্দ্রের কাছে সবচেয়ে বড় সুবিধা হল, বিধানসভা ও সরকারের মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হলে আদালতে সমস্যায় পড়ার সম্ভাবনা কম। কারণ রাষ্ট্রপতি শাসন জারি তখন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা।
তবে এই সবকিছুই নির্ভর করবে এসআইআর এবং সন্দেহভাজন ৬০ লক্ষ ভোটারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আদালত কী অবস্থান নেয় তার ওপর। আদালত গোটা প্রক্রিয়ার মীমাংসা শেষে নির্বাচনের রায় দিলে ভোট পিছতে বাধ্য। তৃণমূলের অন্দরে অনেকেই মনে করছেন এমন পরিস্থিতি আঁচ করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘুঁটি সাজিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হলে তিনি কংগ্রেসসহ বিজেপি বিরোধী প্রায় সব দলকেই পাশে পেয়ে যাবেন হয়তো এই অঙ্ক বিবেচনায় রেখেই তৃণমূল কংগ্রেস লোকসভার স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।