
শেষ আপডেট: 25 March 2019 14:08
এখন যেমন, লাদাখের প্রত্যন্ততম এলাকায়, লে থেকে ৪২০ কিলোমিটার দূরের হাজার বছরের পুরনো এক গ্রাম, 'শাদে'-তে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে এলেন তাঁরা।
তাঁদের এই অভিযানের নাম, 'গ্লোবাল হিমালয়ান এক্সপিডিশন'।
কয়েকশো কিলোমিটার পাহাড়ি পথ গাড়িতে উজিয়ে পার করে, ১২৫ কিলোমিটার ট্রেক করেছেন তাঁরা। দু'দিন লেগে থেকেছেন, পাঁচটা সোলার প্যানেল নিয়ে। শীতের সঙ্গে, হাওয়ার সঙ্গে, উচ্চতার সঙ্গে লড়াই করে, ঠিক ভাবে লাগিয়ে ফেলেছেন সেগুলি। শাদে গ্রামের মানুষের জীবনে আলো এনেছেন লাগাতার চেষ্টায়। তাঁদের দাবি, এই নিয়ে লাদাখের ৮২টি গ্রামে আলো জ্বালালেন তাঁরা। তাঁদের জ্বালানো আলোয় উপকৃত হলেন ৩৫ হাজারেরও বেশি মানুষ।
সরকারি সূত্রের খবর, গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে আছে লাদাখ। বহু বিদ্যুৎ সংস্থার উদ্যোগে, বহু গ্রামে পৌঁছেছে বিদ্যুৎ। কিন্তু এই পরিষেবা থেকে বাদ পড়ে গিয়েছে এমন কয়েকশো গ্রাম, যেগুলিতে পৌঁছনোর রাস্তা নেই। একমাত্র পায়ে হাঁটা পথই যে গ্রামগুলিকে জুড়েছে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে। গাড়ি চলাচলের রাস্তা থেকে কয়েক দিন ধরে হাঁটার পরে ওই গ্রামগুলিতে পৌঁছনো যায়। গুগল ম্যাপেও অস্তিত্ব নেই সেই গ্রামগুলির। এমনই কিছু গ্রামের দায়িত্ব নিয়েছে এই গ্লোবাল ইন্ডিয়া এক্সপিডিশন প্রকল্প।
তবে এই প্রকল্পের পিছনে আছেন তিন অভিন্নহৃদয় বন্ধু। পরিচিত মহলে 'থ্রি ইডিয়টস' বলেও পরিচিত তাঁরা। তাঁরা হলেন পরশ লুম্বা, জয়দীপ এবং বরুণ লুম্বা। নিজেদের উদ্যোগে অন্ধকারকে আলোয় ভরিয়ে দিয়েছেন এই তিন জন৷ সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে, লাদাখের বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা আলোকিত করেছেন তাঁরা৷
পরশ জানালেন, তাঁর বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন। সেই সূত্রেই তিনি ছোটোবেলা থেকে উত্তর-পূর্ব ভারতের এবং জম্মু ও কাশ্মীরের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় থেকেছেন। সেই সঙ্গেই, বাড়িতে বরাবর শিখেছেন দেশের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য নেওয়ার পাঠ। সেই জায়গা থেকেই, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পরে তাগিদ অনুভব করেন, নিজের মেধা ও শিক্ষাকে কী ভাবে কাজে লাগানো যায় দেশের জন্য।
"স্কুল শেষ হওয়ার পরে আমি লাদাখে এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গেছিলাম। ১৩ হাজার ফুট উচ্চতার একটি গ্রামে ওর বাড়ি ছিল। দু'দিন ট্রেক করে গিয়ে পৌঁছেছিলাম আমরা। ছবির মতো সুন্দর একটা গ্রাম, নাম সুমদা চেনমো। গ্রামটা অপূর্ব সুন্দর। কিন্তু দিনের আলো ফুরোলেই অন্ধকারে ডুবে যায়। আমি কথা বলে জানতে পারি, গ্রামটি হাজার বছরের পুরনো। কিন্তু তারা এত দিন বিদ্যুতের আলো দেখেনি। এই ঘটনাটা সাংঘাতিক নাড়া দিয়েছিল আমায়। ভাবতেই পারিনি, কী করে বছরের পর বছর আলো ছাড়া রয়েছেন মানুষ!"-- অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন পরশ।
দেখুন ভিডিও।
https://www.youtube.com/watch?v=g8XMEzuhSMY
এর পরে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হন পরশ। কলেজ শেষ করে, পরশ তাঁর সেই দুই বন্ধুর সঙ্গে বেরিয়ে পড়েছিলেন লাদাখের জাঁসকারে একটা ছোট্টো ট্রেকে। ঠিক করাই ছিল, জাঁসকারের পাদুমের কাছে ফুকতাল গুম্ফা নামের একটা ছোট্ট গুম্ফায় সোলার মাইক্রো গ্রিডস ইনস্টল করবেন তাঁরা৷ আর তাই দিয়েই আলো ঝলমলে হয়ে ওঠে শতাব্দী প্রাচীন ফুকতাল মঠ৷ বিশ্বের প্রাচীনতম মঠগুলির মধ্যে একটি হল এই মঠ৷ অনেক পর্যটকের কাছে এখনও এই গুম্ফা অজানা হলেও, স্থানীয় লামারা নিয়মিত যাতায়াত করেন৷ তাঁদের বিশ্বাস, সেখানে ঈশ্বর বাস করেন। আর ঈশ্বরের বাসস্থান আলোকিত হলে, সভ্যতার উন্নতি ঘটে৷ তাই গুম্ফায় আলো জ্বলে ওঠায় উচ্ছ্বসিত স্থানীয় বাসিন্দারা প্রাণ ভরে ধন্যবাদ জানিয়েছেন পরশ ও তাঁর বন্ধুদের৷
“আমরা প্রথমে স্থানীয় 'চাহ্' গ্রামে আলো আনতে চেয়েছিলাম৷ কিন্তু স্থানীয়রাই বলেন, বৈদ্যুতিক আলো সবার আগে মঠেই জ্বলুক৷”-- বলেন পরশ। তাঁদের পরবর্তী লক্ষ্য ছিল গোটা গ্রামকে বৈদ্যুতিক আলোয় উজ্জ্বল করে তোলা৷ তিন বন্ধুর পাশাপাশি এই কৃতিত্বের অধিকারী ড্যানিশ ইঞ্জিনিয়ার রল্ফ পালগার্ড ও মাজ বেলড্রিং৷ পরে কাজের পরিধি বাড়লে, আমেরিকা, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইংল্যান্ড, নেপাল, স্লোভাকিয়া, গ্রীস, অস্ট্রেলিয়া, চিলি, হল্যান্ডেরও এই প্রোজেক্টে যোগ দেয়৷
প্রথম জীবনে পড়াশোনা শেষ করে, গুরগাঁওয়ে একটি মাল্টিন্যাশনালে কাজও করেছিলেন কিছু দিন। কিন্তু তার মনের খিদে মেটাতে পারছিল না সেই ছাপোষা চাকরি। শেষতক ইস্তফাই দিয়ে দিয়েছিলেন পরশ লুম্বা। হিমালয়ের কোলে গিয়ে শুরু করলেন নিজের প্রতিষ্ঠানের কাজ। সেই উদ্যোগই এখন হিমালয়ের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে বসেছে সৌর প্যানেল, যার দৌলতে দিব্যি আলোকিত অগণিত গ্রামবাসী।
শুধু তা-ই নয়। সৌরবিদ্যুতে চলার জন্য বিশেষ এলইডি বাতি তৈরি করেছেন ৩০ বছরের পরশ। বেশি উচ্চতায় আলো দেওয়ার উপযোগী সেগুলি। তাঁর বানানো সৌরকোষের প্যানেলগুলি একটানা ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। দিনের আলো ফুটলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয় ভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।
এখানেও শেষ নয়। গ্রামবাসীদের সৌরকোষের প্যানেল কেনার ব্যাপারেও সহায়তা করেছেন পরশ। প্রথমে পরশের পরামর্শে প্রতিটি গ্রাম একটি করে ব্যাঙ্কের হিসেব-খাতা খোলে। প্রতি মাসে সেখানে গ্রামে থাকা প্রত্যেক পরিবার ১৫০ থেকে ২০০ টাকা করে জমা করতে থাকে। এ ছাড়া, ট্রেকিং করতে আসা পর্যটকদের বাড়িভাড়া দিয়েও পরিবারগুলোর আয় মন্দ হতো না। তিন বছর পর দেখা যায়, অ্যাকাউন্টে জমা টাকা দিয়ে সহজেই কেনা যাচ্ছে সৌরকোষের জন্য প্রয়োজনীয় নতুন ব্যাটারি।
এর পরেই গাড়ি ও ট্রাকে করে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ইত্যাদি নিয়ে পৌঁছতে থাকেন পরশ ও তাঁর দলবল। যত পর্যন্ত গাড়ি যায়, তার পর থেকে জিনিসপত্র গ্রামবাসীরা নিয়ে যান গাধা বা ঘোড়ার পিঠে। নিজেরাও বয়ে নিয়ে যান কিছু। পরশ ও তাঁর দলের সদস্যদেরও হাত খালি থাকে না। এ ভাবেই, কখনও দু'দিন কখনও বা তিন দিন হেঁটে তাঁরা পৌঁছে যান গন্তব্যে, আলোকিত করেন গ্রাম।
