দ্য ওয়াল ব্যুরো: রামুয়ারই পিস্তল দিয়ে রামুয়াকে গুলি করে খুনের পরিকল্পনা করেছিল তার ছেলে-বৌ। এমনটাই জানালেন তদন্তকারীরা। এমনকী ওই পরিকল্পনা কার্যকর করার জন্য, রামুয়ার ছেলে সমীর তিন জনকে এক লক্ষ টাকার সুপারিও দিয়েছিল। তদন্তে জানা গিয়েছে, তিন জনই অন্য রাজ্যের বাসিন্দা। তারা ১৩ জানুয়ারি রাতে, সোদপুরে রামুয়ার ফ্ল্যাটে ঢুকে তারই পিস্তল থেকে গুলি চালিয়ে তাকে খুন করে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনার সাত দিনের মাথায় সমীর ও সমীরের ওই তিন বন্ধুকে এবং রামুয়ার স্ত্রী কাজলকে গ্রেফতার করেছে খড়দহ থানার পুলিশ।
প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানিয়েছে, রামুয়া কাজলকে সন্দেহ করত। তার দাবি ছিল, অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে কাজলের। এই সন্দেহে কাজলকে নিয়মিত মারধর করত সে। সেই অত্যাচারের মাত্রা ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায় এবং পরিবারের অভাব-অনটন নিয়ে রামুয়ার কোনও হেলদোল না থাকায়, অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল কাজল। শেষমেশ ছেলের সঙ্গে পরিকল্পনা করে রামুয়াকে মেরে ফেলবে বলে ঠিক করে কাজল।
পুলিশ সূত্রের খবর, বারবার কাজল ও সমীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে বয়ানে অসঙ্গতি মিলেছিল। তার পরেই শেষ ১৫ দিন দু’জনের গতিবিধি এবং তারা কার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিল, তা খতিয়ে দেখেন তদন্তকারীরা। সূত্র মিলতেই দফায় দফায় দু’জনকে জেরা করায় খুনের কথা তারা কবুল করে। স্বীকার করে আরও তিন বন্ধুর জড়িত থাকার কথাও।
পুলিশ জানিয়েছে, সমীরের ওই তিন বন্ধুর কাছ থেকে সুপারি হিসেবে থাকা এক লক্ষ টাকার মধ্যে ৩০ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে, বাকিটা ওরা খরচ করে ফেলেছে। ওই তিন জনের নাম শ্যামসুন্দর রাও, বিশাল মেনন ও প্রশান্ত সিং। শ্যামসুন্দরের বাড়ি অন্ধ্রপ্রদেশের ভাইজ্যাগে। বাকি দু'জন টাটানগরের বাসিন্দা। প্রশান্ত দুর্গাপুরের একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। খুনে ব্যবহৃত রামুয়ার পিস্তলটিও উদ্ধার করা হয়েছে। ওদের মধ্যে দু'জনকে টাটানগর থেকে এবং আর এক জনকে দুর্গাপুর থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
পুলিশ জানিয়েছে, বারবার পুলিশের হাতে রামুয়া ধরা পড়ায় ঘনঘন বাড়িও পরিবর্তন করতে হত। যার জেরে আট বছরের মেয়ের পড়াশোনা হচ্ছিল না বলে জানিয়েছে কাজল। অন্য দিকে, এমবিএ পড়া বন্ধ করে সমীরকে বেআইনি কাজে নামতেও চাপ দিচ্ছিল রামুয়া। পরিস্থিতি অসহ্য হয়ে উঠলে খুনের ছক কষে কাজল ও সমীর।
রামুয়ার দুর্ব্যবহার ও অত্যাচারে গত কয়েক বছর ধরেই তিতিবিরক্ত ছিল তার স্ত্রী ও ছেলে। শেষ বার জেল খাটার সময়ে রামুয়া কথা দিয়েছিল, জেল থেকে ফিরে সে অপরাধ-দুনিয়া ত্যাগ করবে। সেই জন্যই হাওড়া ছেড়ে বেরিয়ে কাজল ও সমীর ফ্ল্যাটও ভাড়া নেয় সোদপুরে। কিন্তু অভিযোগ, জেল থেকে বেরিয়ে কিছু দিন ঠিক থাকলেও, ফের হাওড়ার পুরনো লোকদের সোদপুরে ডেকে প্রোমোটারদের হুমকি দিতে শুরু করে রামুয়া। এমনকী একটি ৭.৬২ এমএম পিস্তলও কেনে। সেই সঙ্গে বেড়ে চলে সন্দেহ। প্রায় রোজ রাতেই মদ্যপ অবস্থায় বাড়ি ফিরে কাজলকে মারধর করত রামুয়া। সেই সঙ্গে বেড়ে চলে আর্থিক অনটন।
জেরায় সমীর পুলিশকে জানিয়েছে, তখনই বাবাকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করে সে। সম্মতি দেয় কাজল। প্রথমে পরিকল্পনা করেছিল রামুয়ার ভোজালি দিয়েই তাকে গলা কেটে খুন করবে। তা না পেরে ছোটবেলার বন্ধু শ্যামসুন্দর রাওয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমীর। শ্যামসুন্দর যোগাযোগ করিয়ে দেয় প্রশান্ত সিংয়ের সঙ্গে, প্রশান্ত আবার তার এক বন্ধু বিশাল মেননকে সঙ্গে নেয়। রবিবার ভাইজ্যাগ থেকে বিমানে তারা কলকাতা বিমানবন্দরে নামে। সেখান থেকে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করে সোদপুরে রামুয়ার ফ্ল্যাটে পৌঁছে যায় রাত একটা নাগাদ। ঘরেই ছিল সমীর। তারা পৌঁছলে সমীরই দরজা খুলে দেয়। পিস্তলও হাতের কাছে রেখেছিল সে-ই। এর পরে ওই তিন জন ফ্ল্যাটে ঢুকে রামুয়ার পিস্তল থেকেই ঘুমন্ত রামুয়ার ডান কানে গুলি করে। মাথা এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় হয়ে যায় তার।
এর পরেই দুষ্কৃতী হানার গল্প ফেঁদে আত্মীয়দের খবর দেয় কাজল। আত্মীয়দের পরামর্শে বাথরুমে পড়ে আঘাত পাওয়ার কথা বলে হাসপাতালে নিয়ে যায়। চিকিৎসকেরা তা মানতে চাননি।
এত দিনে ফাঁস হল আসল সত্যি। পুলিশ জানিয়েছে, কাজল ও সমীরকে দশ দিনের পুলিশি হেফাজত দিয়েছে আদালত। এর পরে ধৃতদের পাঁচ জনকে একসঙ্গে বসিয়ে জেরা করা হবে।