দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গত সোমবার নতুন প্রকল্প ঘোষণা করেছেন, ‘পাড়ায় পাড়ায় সমাধান’। ওদিকে রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়ও তখন যেন পাড়ায় পাড়ায় নেমে পড়েছেন। আজ বুধবার তিনি গিয়েছেন, বেহালার শখের বাজারে। সেখানে মা চণ্ডীর মন্দিরে পুজো দিয়েছেন।
তাঁর বেহালা যাওয়া নিয়ে অবশ্য তৃণমূল কিছু বলেনি। কিন্তু এদিন পষ্টাপষ্টি ভাবে তৃণমূল অভিযোগ করেছে, সাংবিধানিক সীমা লঙ্ঘন করছেন বর্তমান রাজ্যপাল।
দলের মুখপাত্র তথা রাজ্যসভায় তৃণমূলের উপ দলনেতা সুখেন্দুশেখর রায়ের কথায়, “চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারি থেকে শুরু করে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র গোপালকৃষ্ণ গান্ধী—বাংলার রাজভবনের যে সুমহান ঐতিহ্য রয়েছে, তার থেকে দৃশ্যত ব্যতিক্রমী জগদীপ ধনকড়। গত বছর জুলাই মাসে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল পদে নিযুক্ত হয়েছেন তিনি। প্রথম দিন থেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সরকারকে বিব্রত করে যাচ্ছেন। দেখে বোঝা যাচ্ছে দিল্লির শাহেনশাহদের কথায় চলছেন রাজ্যপাল”।
সুখেন্দুবাবু জানান, তিনি প্রতিদিন, নিয়মমাফিক রাজ্য সরকারের আমলা ও পুলিশ অফিসারদের বিরুদ্ধে যে অসত্য ও ভিত্তিহীন অভিযোগ করছেন, তাতে এ বার ধৈর্য্য ও সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে। যে সাংবিধানিক এক্তিয়ার অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিরই একমাত্র অধিকার রয়েছে রাজ্যপালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার, তাই তাঁর কাছে জগদীপ ধনকড়ের বিরুদ্ধে একটি স্মারকলিপি পেশ করছি আমরা।
অনেকের মতে, অপ্রিয় হলেও রাজ্যপাল কিছু প্রশ্ন তুলেছেন তা সঙ্গত। রাজনৈতিক বিরোধীদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো, রেশনে দুর্নীতি, আমফানের টাকা লুঠ ইত্যাদি বিষয়ে তিনি অভিযোগ করেছেন, সে ব্যাপারে সমস্ত বিরোধী দল একমত। কিন্তু এও ঠিক, এ সব ব্যাপারে রাজ্যপালের ধারাবাহিকতা, তাঁর শব্দচয়ণ, ইঙ্গিত ইত্যাদিতে মনে হচ্ছে যে তাঁর সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। অনেকের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তিনি বিজেপির লোক। এমনকি এই যে বুধবার তিনি বেহালার শখের বাজারে গিয়েছেন, তা দেখে পর্যবেক্ষকদের একাংশের মত হল, পাড়ায় পাড়ায় জনসংযোগে নেমে পড়েছেন ধনকড়। আর তার মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে চাইছেন মানুষের মনে।
হয়তো এখানেই আপত্তি তৃণমূলের। সুখেন্দুবাবু পেশায় আইনজীবী ছিলেন। এদিন সাংবাদিক বৈঠকে সাতের দশকের একটি মামলার রায়ের প্রসঙ্গ টেনে আনেন তিনি। বলেন, সামসের সিং বনাম পাঞ্জাব সরকার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছিল, রাজ্যপাল রাজ্য সরকারের পরামর্শক্রমে কাজ করবেন। তাঁর কোনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার বা নির্দেশ দেওয়ার অধিকার নেই।
এমন নয় রাজ্যপালকে ওই মামলার রায়ের কথা প্রথম বার স্মরণ করাচ্ছে তৃণমূল। এর আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যপালকে দীর্ঘ চিঠি লিখে এগুলো উল্লেখ করেছিলেন। সেই সঙ্গে বলেছিলেন, ভুলে যাবেন না আপনি মনোনীত রাজ্যপাল, আর আমি নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী। তা ছাড়া তৃণমূলের মুখপাত্ররা কখনও তাঁকে নাম করে, কখনও নাম না করে ব্যক্তি আক্রমণও করেছেন। এমনকি জোকার পর্যন্ত বলেছেন।
কিন্তু তাতে রাজ্যপালকে দমানো যায়নি। তিনিও সংবিধান ও পুরনো মামলার রায়ের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, আমি এক্তিয়ার লঙ্ঘন করিনি। সাংবিধানিক শর্তের মধ্যে থেকেই কাজ করছি।
প্রসঙ্গত, ধনকড়ের সঙ্গে এখন তৃণমূলের যে নিত্ত নৈমিত্তিক ঝগড়া—এতটা অতীতে কখনও হয়নি। তবে এটা ঠিক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জমানায় এর আগে যে দু’জন রাজ্যপাল ছিলেন, তাঁদের সঙ্গেও খুব যে বনিবনা ছিল তা নয়। দ্বিতীয় ইউপিএ জমানায় তৎকালীন রাজ্যপাল এম কে নারায়ণন রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বারবার কেন্দ্রকে রিপোর্ট দিয়েছিলেন। একবার তো রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে ফোন করে মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, নারায়ণনকে তুলে নেওয়া হোক। তার পর বিভিন্ন বিষয়ে রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠির সঙ্গেও নবান্নের সংঘাত বেধেছে। এখন তা নতুন উচ্চতা পেয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, তৃণমূল হয়তো আশাও করে না যে এর কোনও বিহিত হবে। তবে তারা নিশ্চয়ই বাংলার মানুষের মনে এই ধারণা গেঁথে দিতে চাইছে যে দিল্লির নির্দেশে রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যাপারে নাক গলাচ্ছেন রাজ্যপাল। এ হল অনাচার। এরও জবাব দিক মানুষ।