দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান: অন্যান্য বছর এই সময় থেকেই ব্যস্ততা বাড়তে শুরু করে কুমোরপাড়ায়। বর্ষা নামলে মাটিতে টান ধরানো শক্ত। তাই গ্রীষ্মের মরসুমেই শুরু হয়ে যায় কাজ। অনেক শিল্পীই চাপ কমাতে আগেভাগেই প্রতিমা গড়ে রাখেন। তাই বেশ কিছু দুর্গা প্রতিমা মোটামুটি তৈরিও হয়ে যায়। কোনও কোনও ঘরে লক্ষ্মী ও কালী প্রতিমার গায়েও পড়ে যায় মাটির প্রলেপ। পুজোর সময় সময় সেই প্রতিমাগুলি রং করে ক্রেতাদের চাহিদা মতো হাতে তুলে দেওয়া হয়। এবার পরিস্থিতি অন্য। বরাত নেই। তাই কোন ভরসায় কাজ করবেন? ব্যস্ততার বদলে কাজ না থাকার যন্ত্রণা ফুটে উঠছে শিল্পীদের চোখে মুখে। রোজকার দিনযাপনের যন্ত্রণা, কাজ হারানোর যন্ত্রণা হার মানাচ্ছে করোনা ভাইরাসের আতঙ্ককেও।
বর্ধমান শহরের উদয়পল্লী, কাঞ্চননগর, শ্যামলাল, বিসি রোড সহ বিভিন্ন জায়গায় তৈরি হয় প্রতিমা। নীলপুর কমলা দিঘিরপাড়ের পালপাড়া শহরের সবথেকে বড় কুমোরপাড়া। মাস পাঁচেক পরেই দুর্গাপুজো। তার আগেই রয়েছে বিশ্বকর্মা পুজো। কুমোরপাড়া যেন ভুলেই গেছে তা। মৃৎশিল্পীরা জানাচ্ছেন দুর্গা, লক্ষ্মী, কালীমূর্তি কিছুটা তৈরি হওয়ার পর বিশ্বকর্মা পুজো চলে আসে। তখন তারা অর্ডার অনুয়ায়ী বিশ্বকর্মা ঠাকুর তৈরি করেন। কিন্তু এবার এখনও সেভাবে দুর্গা প্রতিমার বরাত আসেনি। যারা বরাত দিয়েছিলেন তারাও কাজ বন্ধ রাখার কথা বলেছেন। কারণ লকডাউন পরবর্তী সময়ে বড় বাজেটের পুজো করা যাবে কি না, সে নিয়ে পুজো উদ্যোক্তারা ধন্দে রয়েছেন। বরাত মেলেনি বিশ্বকর্মা পুজোরও।
পালপাড়ার মৃৎশিল্পী তারকচন্দ্র পাল বলেন, ‘‘চৈত্র এবং বৈশাখ মাসে বহু জায়গায় দেবী শীতলার পুজো হয়। ফি বছরই প্রতিমা তৈরির বরাত পাই আমরা। কিন্তু এ বার লকডাউন পরিস্থিতিতে সমস্ত বরাত বাতিল হয়েছে।’’ তারকবাবু জানালেন, অন্যান্যবার ফাল্গুন মাস থেকেই দুর্গা প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন তিনি। এই সময়ের মধ্যে ১০ থেকে ১২ টি দুর্গাপ্রতিমার অনেকটাই তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু এবার এখনও পর্যন্ত একটিও দুর্গা ঠাকুরও তৈরি করেননি। কারণ এখনও পর্যন্ত তাঁর কাছে কোনও বরাত আসেনি। গত কয়েক বছরে বর্ধমান শহরে বিশ্বকর্মা পুজো এবং গণেশ পুজোর উন্মাদনাও বেড়েছে। সেই পুজোতেও এবার কাঁচি পড়বে বলেই তাঁর ধারণা।
একই দাবি, পালপাড়ার আরেক মৃৎশিল্পী শিবনাথ পালের। তিনি বলেন, ‘‘পয়লা বৈশাখের জন্য আমি অনেকগুলি লক্ষী-গনেশ মূর্তি তৈরি করেছিলেন। সেই প্রতিমা বিক্রি না হওয়ার কারণে তা গোডাউনে পড়ে রয়েছে। প্রতিবছর যারা নিয়মিতভাবে দুর্গা-লক্ষ্মী অথবা কালী প্রতিমার অর্ডার দিতে আসেন, তাঁদের এখনও দেখা নেই। তাই ১০ জন কর্মীকে ছুটিতে পাঠিয়ে দিয়েছি। নিজেও শূন্যহাতে বসে রয়েছি।’’

বর্ধমান শহরের কাঞ্চননগর পূর্ব পাড়ার বলরাম পাল, উদয়পল্লি বাজারের গোবিন্দ পাল, জয়ন্ত পাল, নীলপুরের সঞ্জীব পালরাও জানান, ফাল্গুন মাস থেকে তাঁদের টানা কাজ চলে। কালী প্রতিমা বানিয়ে তবেই মেলে দম ফেলার ফুরসৎ। মাটি, রং, কাঠামো, খড়, শ্রমিক খরচা মিলিয়ে এক একজন মৃৎশিল্পী প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ করেন। সেই টাকা দিয়ে প্রতিমা বানিয়ে তারপর তা বিক্রি করে ঋণ শোধ হয়। বাকি টাকায় চলে সংসার। অনেক শিল্পী এবারও ঋণ নিয়ে রেখেছেন। কিন্তু বরাত না মেলায় এখন শুধু সুদ গুনতে হচ্ছে।
লকডাউন উঠে গিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও এবার বড় বাজেটের পুজো আর হবে না বলেই আশঙ্কা করছেন তাঁরা। তাই ভরা মরসুমেও আঁধার গাঢ় হচ্ছে বর্ধমান শহরের কুমোরপাড়াগুলিতে।