মৃন্ময় পান,বাঁকুড়া: একটা দুর্ঘটনাই যে জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে, তা কখনও ভাবতেও পারেননি, বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলের দুই কন্যা। ঘটনার আচমকা অভিঘাতে এভাবে প্রায় ভিআইপি বনে যাওয়ার ঘোর যেন এখনও কাটছে না রীতা-অনিতার।
সোমবার আরও অনেকের সঙ্গেই প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ শুনতে পশ্চিম মেদিনীপুরে বিজেপির কিষাণ কল্যাণ জনসভায় গিয়েছিলেন রানীবাঁধের দুই বোন, রীতা এবং অনিতা মুদিও। এ যেন উৎসবের মতোই ছিল ওঁদের কাছে। ঘরের কাছে প্রধানমন্ত্রী এসেছেন বলে কথা! এ সুযোগ কি ছাড়া যায়! কিন্তু এত আনন্দ নিয়ে যাওয়ার সময়ে ভাবতেও পারেননি কী বিপদ অপেক্ষা করে আছে।
ভাষণ চলাকালীন, সভার মাঝপথে আচমকা ঘটে যায় বিপর্যয়। মঞ্চ সংলগ্ন একটি সামিয়ানা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। সেখানেই ছিলেন রীতা-অনিতা। গুরুতর আহত হন দু'জনেই। আরও অনেকের সঙ্গে মেদিনীপুরের হাসপাতালে ভর্তি করা হয় বাঁকুড়া সারদামণি মহিলা মহাবিদ্যালয়ের এই দুই ছাত্রীকেও।
আর এর পরেই বাকি ছিল ম্যাজিক। সভা শেষ করেই সটান হাসপাতালে পৌঁছে যান প্রধানমন্ত্রী নিজে। কথা বলেন প্রায় সকলের সঙ্গে, খোঁজ নেন কেমন আছেন তাঁরা। কিন্তু রীতা-অনিতার জন্য অপেক্ষা করছিল আরও কিছু। প্রধানমন্ত্রী খোঁজ তো নিলেনই, সেই সঙ্গে বেশ স্নেহের সঙ্গে হাত বুলিয়ে দিলেন দু'জনের মাথায়। দ্রুত সুস্থতা কামনা করলেন এই দুই বোনের, আশীর্বাদ করলেন আন্তরিক ভাবে।
ব্যস! শত যন্ত্রণা আর কষ্টের মধ্যেও যেন এই মুহূর্তটাই সোনার ফ্রেমে বাঁধানো রুপোলি স্বপ্ন! তবে স্বপ্নের ঘোরে ভুল হয়নি কাজে। এত কাছে দেশের প্রধানমন্ত্রীকে পেয়ে, তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে, অটোগ্রাফ নিয়ে নিতে ভুল করেনি জঙ্গলমহলের এই দুই কন্যা।
আর এই খবর জানাজানি হতেই অভিনন্দনের ঢল নামে রীতা-অনিতার উপরে। দেশ ও রাজ্যের বিভিন্ন প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয় ঘটনাটি। জঙ্গলমহলের রীতা-অনিতার প্রধানমন্ত্রীর স্পর্শ পাওয়ার খবর জেনে যায় সকলে। রানীবাঁধের এই দুই বোনকে চিনতে ভুল হয়নি তাঁদের সহপাঠী, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী থেকে আশপাশের গ্রামে কারওই। তাই হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে বাড়ি ফিরতেই এই দুই বোনের বাড়িতে ভিড় জমাচ্ছেন সকলে। সবার একটাই প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী যখন ঠিক পাশেই ছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তের কেমন অনুভূতি ছিল। তাঁর সঙ্গে কথাই বা কী হয়েছিল।
অতি উৎসাহে অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর অটোগ্রাফ রীতা-অনিতার খাতা থেকে ক্যামেরায় বন্দী করছেন। কেউ আবার সেই অটোগ্রাফ আর দুই বোনকে নিয়ে মোবাইল ক্যামেরায় সেলফিও তুলছেন।
বুধবার রানীবাঁধের বাড়িতে বসে রীতা আর অনিতা সাংবাদিকদের বলেন, "ঐ মুহূর্তটা ভাষায় বোঝাতে পারবো না। সামিয়ানা ভেঙ্গে যাওয়ার ফলে মা আর পিসিকে নিয়ে আমরাও বেরিয়ে আসতে চাইছিলাম। কিন্তু মায়ের শাড়ি কোনও একটা বাঁশে আটকে যায়। মাকে নিয়ে আমরা ভিড়ের মধ্যে পড়ে গেলে অনেকেই প্রাণ বাঁচাতে আমাদের উপর দিয়ে দৌড়তে শুরু করেন। পরে আমাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।"
দুই বোনই অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন। চোখ খুলেই বিস্ময়ে হতবাক! প্রধানমন্ত্রী তাঁদের বেডের সামনেই দাঁড়িয়ে। "হিন্দিতে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা কেমন আছি। তার পরে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, 'তাড়াতাড়ি ভাল হয়ে যাও'। এই মুহূর্তটা চিরস্মরণীয়।"
রীতা মুদি আরও বলেন, সকালে সভায় যাওয়ার আগে অনেক বন্ধুই ইয়ার্কি করে বলেছিল, 'প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সেলফি তুলবি, অটোগ্রাফ নিবি।' জানতাম এটা অসম্ভব। তবে একটা দুর্ঘটনা যে এভাবে সব ইয়ার্কি সত্যি করে দেবে, তা যেন ভেবেই পাচ্ছেন না জঙ্গলমহলের দুই ছাত্রী।
সভা শেষে দিল্লি ফিরে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। প্রাত্যহিক প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত হয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু রাজ্যের জঙ্গলমহলের এই দুই ছাত্রীর মাধ্যমে তাঁর রেশ রয়ে গিয়েছে এখনও।