
শেষ আপডেট: 13 March 2023 18:10
বাংলার রাজনীতিতে রুচি, হিতাহিত জ্ঞান, শালীনতা, সংবেদনশীলতা—এসব শব্দগুলি অতীত বলেই মনে করেন অনেকে। চাকরি দুর্নীতিতে হুগলির তৃণমূল (TMC) নেতা শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় (Shantanu Banerjee) গ্রেফতার হওয়ার পর গত দু'তিন ধরে যা চলছে তাতে সেই ব্যাপারটা বোধহয় আরও একবার প্রমাণ করে দিল।
একটি ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। এ ব্যাপারে মূলত দায়িত্ব নিয়েছে বাম-বিজেপির একাংশ কর্মী বা সমর্থক। তাতে কী আছে? একটি ফ্রেমের একদম বাঁদিকে দেখা যাচ্ছে এক মহিলা একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে। তাঁর পাশে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)। এবং অভিষেকের পাশে শান্তনু।
এই ফ্রেম ছড়ানোর উদ্দেশ্য কী তা স্পষ্ট। বিরোধীরা দেখাতে চেয়েছে, ধৃত শান্তনুর সঙ্গে অভিষেকের নিবিড় যোগ রয়েছে। এই ছবির রাজনীতি নতুন নয়। কিন্তু প্রশ্ন হল, ওই শিশুটি?
সিপিএমের অনেক উঁচুতলার নেতা থেকে শুরু করে অনেক কর্মী কিংবা বিজেপির লোকজন—শিশুটির ছবি মুখ স্পষ্ট রেখেই সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে দিয়েছেন।
অভিষেক যখন যুব তৃণমূলের সভাপতি তখন শান্তনু ছিলেন হুগলির জেলা সভাপতি। ফলে দু'জনের এক ফ্রেমে ছবি থাকাটা কোনও বিস্ময়কর ব্যাপার নয়, রহস্যেরও নয়। আবার এই বাজারে পুরনো ছবিকে নতুন মোড়কে প্রচার যে বিরোধীরা করবেন তাতেও কোনও অস্বাভাবিকতা নেই। কিন্তু দেখা গেল শিশু অধিকার, সংবেদনশীলতা কোনও কিছুর ধার ধারলেন না বিরোধীদের অনেকে। দলগতভাবে তা করা হয়েছে এমন নয়। কিন্তু এমন অনেককেই ছবিটি পোস্ট করতে দেখা গেল যাঁরা বিরোধী রাজনৈতিক দলের পরিচিত মুখ।
শিশু মনে এর কী প্রভাব পড়তে পারে?
বিশিষ্ট মনোরোগ বিশেষজ্ঞ শর্মিলা সরকার বলছেন, “রাজনৈতিক দিকটা বলছি না। কিন্তু একটা বাচ্চার ছবি এভাবে প্রকাশ্যে আনা ঠিক নয় বলেই মনে হয় আমার। কারণ বাচ্চাটি বড় হয়ে এই ছবি দেখলে এবং পরিস্থিতি জানলে তার মনে খারাপ প্রভাব তো পড়বেই।"
বিশিষ্ট ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট অনিন্দিতা মুখোপাধ্যায়ের মতে, “এই ছবিটা পুরোপুরি শিশু সুরক্ষা ও অধিকারের বিরুদ্ধে। বাচ্চার ছবি সামনে আনাটাই অপরাধ। আইনি দিক থেকে দেখতে হলে, শিশুর অধিকার সুরক্ষা কমিশনের নিয়ম ও নীতির পরিপন্থী। তার কিছু কারণ আছে”।
ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রথমত, শান্তনুর অপরাধ প্রমাণিত নয়। বিচারাধীন কারও পরিবারের ছবি প্রকাশ্যে আনা বেআইনি। কারণ, অপরাধী হোক বা অভিযুক্ত হোক, পরিবারকে টেনে আনা আইনত ও সামাজিক দিক থেকেও কখনওই কাম্য নয়। এতে পরিবারের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে।
দ্বিতীয়ত, ১৮ বছরের নীচে কোনও শিশু বা কিশোর যদি অপরাধীও হয় তাহলেও তাকে জেলে না পাঠিয়ে জুভেনাইল হোমে রাখা হয়। বাচ্চার পরিবার যদি অপরাধ করে বা অভিযুক্ত হয়, সেক্ষেত্রেও বাচ্চার নাম বা ছবি প্রকাশ্যে আনা আইনত অপরাধ। এই বাচ্চাটির বয়স যদি সাত বছরের নীচে হয় তাহলে বিষয়টা শিশু সুরক্ষা কমিশনের আওতায় অপরাধের মধ্যেই পড়ে।
তৃতীয়ত, সামাজিক দিক থেকে বিষয়টা অন্যায়ের। একটা সামান্য ছবিই পরবর্তী সময়ে ওই বাচ্চা ও তার পরিবারকে নানারকম জটিলতায় ফেলতে পারে। সমাজ তাদের একঘরে করে দিতে পারে, মানসিক দিক থেকে তারা হেনস্থার শিকার হতে পারে। বাচ্চাটি স্কুলে নানা বিরূপ পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে, নানা রকম বাঁকা কথা, তির্যক মন্তব্য শুনতে হবে। ‘বাবা অপরাধী’ এই কথাটাই বার বার শুনতে হবে, শিশু মনে যা ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলবে।
শিশু সুরক্ষা কমিশন এ ব্যাপারে কোনও পদক্ষেপ করবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। কমিশন স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে কিছু জানায়নি। তবে পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, যাঁরা কথায় কথায় সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতা আওড়ে নবজাতকের কাছে সুন্দর পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকার করেন তাঁদের কাছে ন্যূনতম এই সংবেদনশীলতা আশা করা যায়। নইলে সমাজে গভীর ও সুদূরপ্রসারী ক্ষত তৈরি হতে পারে।
'শান্তনুর ফোন সোনার খনি, আরও নাম শুনলে চমকে যাবেন', আদালতে বলল ইডি