
শেষ আপডেট: 17 June 2023 15:49
পঞ্চায়েত ভোটে (Panchayat Election 2023) রাজ্যের সব জেলায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court)। সরকার যে সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) স্পেশাল লিভ পিটিশন দায়ের করবে তা দ্য ওয়াল সবার আগে লিখেছিল। শনিবার সেটাই হয়েছে। কিন্তু এরই আড়ালে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহও চলছে। পঞ্চায়েত ভোটে স্পর্শকাতর এলাকায় মোতায়েনের জন্য সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী চেয়ে পাঁচটি অবিজেপি শাসিত রাজ্যের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতর। তার মধ্যে তিন রাজ্যই সম্মতি জানিয়েছে।
কৌশলগত ভাবে এমন পাঁচ রাজ্যের কাছে নবান্ন অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী চেয়েছিল, যে রাজ্যগুলি আঞ্চলিক দল শাসিত। অর্থাৎ যেখানকার শাসক দলের বাংলায় তেমন কোনও রাজনৈতিক ফুটপ্রিন্ট বা স্বার্থ নেই।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন কৌশলগত?
তার কারণ বহুবিধ। পঞ্চায়েত ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে আদালত এই যুক্তিই দিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ নিরাপত্তা দিতে পারছে না। আবার শুভেন্দু অধিকারী ও অধীর চৌধুরীদের বক্তব্য, রাজ্য পুলিশ পক্ষপাতদুষ্ট। তারা শাসক দলের কথায় চলছে। তাই অবাধ নির্বাচনের জন্য কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হোক।
নবান্নের এক অফিসার দ্য ওয়ালকে এদিন বলেন, যদি নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্যই কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করতে হয়, তাহলে ভিন রাজ্যের সশস্ত্র পুলিশকে দিয়েও সেই কাজ চলতে পারে। নবান্নর আবেদনের ভিত্তিতে তামিলনাড়ু, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা সরকার পুলিশ বাহিনী পাঠানোর ব্যাপারে ইতিমধ্যে লিখিত সম্মতি জানিয়েছে।
এই তিন রাজ্যে তৃণমূল নেই। আবার তামিলনাড়ুর ক্ষমতাসীন দল ডিএমকে-র পশ্চিমবঙ্গে কোনও রাজনৈতিক ফুটপ্রিন্ট বা স্বার্থ নেই। একই ভাবে ওড়িশার ক্ষমতাসীন দল বিজু জনতা দলের পশ্চিমবঙ্গে কোনও রাজনৈতিক স্বার্থ নেই। ঝাড়খণ্ডের ক্ষমতাসীন দল ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার ক্ষেত্রেও তাই প্রযোজ্য।
নবান্নের ওই কর্তার বক্তব্য, বাংলার শাসক দলের কথায় যদি বাংলার পুলিশ বাহিনী প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে দিল্লির শাসক দলের কথায় কেন্দ্রীয় বাহিনী প্রভাবিত হওয়ার ঝুঁকিও থাকছে। বাংলার শাসক দল চাইলে সেই অভিযোগ তুলতেই পারে। বরং বিতর্কের উর্ধ্বে থাকতে স্পর্শকাতর এলাকায় তামিলনাড়ু বা ওড়িশার পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা যেতেই পারে।
সচিবালয় সূত্রের দাবি, সুপ্রিম কোর্টে রাজ্য সরকার এই যুক্তিই তুলে ধরবে। সেই সঙ্গে তামিলনাড়ু, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড সরকারের সম্মতিপত্রও দেখাবে।
ব্যাপারটা এখানেই থেমে নেই। সামান্য পিছনে হাঁটলে দেখা যাবে, পঞ্চায়েত মামলার রায়ে কলকাতা হাইকোর্ট প্রথমে শুধু স্পর্শকাতর এলাকায় আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছিল। প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানমের ডিভিশন বেঞ্চ রায়ে জানিয়েছিল, রাজ্য নির্বাচন কমিশন কিছু এলাকাকে স্পর্শকাতর বলে চিহ্নিত করেছে। সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হোক।
কিন্তু নবান্ন ও রাজ্য নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, তারা তখনও পর্যন্ত কোনও স্পর্শকাতর এলাকা চিহ্নিত করেননি। ভুল তথ্যের ভিত্তিতে এই রায় দেওয়া হয়েছে। তাই তা পুনর্বিবেচনা করা হোক। রাজ্যের এই যুক্তি শুনে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি টিএস শিবজ্ঞানম। বলেছিলেন, এরকম করলে গোটা রাজ্যেই কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দেব। তার পর চূড়ান্ত রায়ে সেই নির্দেশই দিয়েছিলেন।
তৃণমূলের স্পেশাল পঞ্চাশ, কোন্দল ও বিক্ষুদ্ধ সামলাতে ব্লকে ব্লকে যাবেন বড় নেতারা: নির্দেশ কালীঘাটের
হাইকোর্টের সেই রায় সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করার পাশাপাশি রাজ্য নির্বাচন কমিশন এবার জরুরি ভিত্তিতে অতিশয় স্পর্শকাতর ও স্পর্শকাতর বুথ চিহ্নিত করতে নেমেছে। শনিবার সকালে কমিশন সব জেলার জেলাশাসককে নির্দেশ পাঠিয়ে বলেছে, অবিলম্বে অতিশয় স্পর্শকাতর এবং খুব স্পর্শকাতর বুথ চিহ্নিত করে বা ম্যাপিং করে রিপোর্ট পাঠান। সরকার সম্ভবত সুপ্রিম কোর্টে এটাই দেখাতে চাইবে যে রাজ্যে নির্দিষ্ট করে এই সংখ্যক বুথ স্পর্শকাতর। সেগুলি পাহারা দেওয়ার জন্য ভিন রাজ্য থেকে পর্যাপ্ত সশস্ত্র পুলিশ চাওয়া হয়েছে।
আবার রাজ্য সরকার তথা রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতর সুপ্রিম কোর্টে এই যুক্তিও দেবে যে কেন্দ্রীয় বাহিনী সর্বরোগহর নয়। বিধানসভা ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনীর গুলিতে শীতলকুচিতে মানুষের প্রাণ গিয়েছে। মণিপুরে হিংসা থামাতেও কেন্দ্রীয় বাহিনী ব্যর্থ।
শাসক দলের এক শীর্ষ নেতা শনিবার বলেন, প্রকৃত ঘটনা হল কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন নিয়ে তৃণমূলের কোনও শঙ্কা নেই। একুশের বিধানসভা ভোটে আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করার পরেও তৃণমূল স্যুইপ করেছে। আসলে এবার ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করলে সেটাই দস্তুর হয়ে থাকবে। এর পর পাড়া ও ক্লাবের নির্বাচনেও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের দাবি উঠবে। স্বাভিমানী কোনও রাজ্য সরকার সেটা মেনে নিতে পারে না।
রাজ্যের এই সম্ভাব্য কৌশল নিয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী বলেন, ‘দুরাত্মার ছলের অভাব হয় না। আমরা আশাবাদী যে কলকাতা হাইকোর্টের মহামান্য বিচারপতিদের রায় বহাল রাখবে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।’