শোভন চক্রবর্তী: ভাল নেই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ফুসফুসের সমস্যা ছিলই। কিন্তু তাকেও এখন ছাপিয়ে গিয়েছে চোখের সমস্যা। ডাক্তার দেখান না। ভর্তি হতে চান না হাসপাতালে। সিপিএম-নেতারা বারবার বুঝিয়েও কিছু করতে পারেননি। এক সিপিএম নেতার কথায়, ‘জেদ করে করে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছেন বুদ্ধদা।’
সিওপিডি’র সমস্যার জন্য অনেক বছর ধরেই যান না দিল্লি বা বাইরের রাজ্যের সভায়। পলিটব্যুরো সদস্য থাকার সময় একাধিকবার শুধুমাত্র তাঁর জন্য কলকাতায় অনুষ্ঠিত হয়েছে কেন্দ্রীয় কমিটি বা পলিটব্যুরোর সভা। ফুসফুসের সমস্যার কারণে বিমানে ওঠাও বারণ অনেক বছর। কিন্তু এখন বুদ্ধবাবুর মূল সমস্যা চোখ।
কোনওকালেই তাঁর জীবনযাপনে আড়ম্বর ছিল না। বালিগঞ্জের পাম অ্যাভিনিউর সরকারি আবাসনের ছোট্ট ফ্ল্যাটেই দিনগুজরান। ইদানীং সেখানে অন্ধকারের জীবন কাটাচ্ছেন এই সিপিএম নেতা। দিনের বেলাতেও বন্ধ রাখেন দরজা-জানলা। আলো পড়লেই জ্বালাপোড়া হয় চোখে। সিপিএম-এর একটি সূত্রের মতে বাঁ চোখে কিছুই আর দেখতে পান না বুদ্ধবাবু। ইদানীং ডান চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা হচ্ছে।
ঠিক কী সমস্যা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর?
জানা গিয়েছে সমস্যা রেটিনায়। চোখের বিভিন্ন শিরার রস শুকিয়ে যাচ্ছে তাঁর। আর সেই কারণেই দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছেন তিনি।
আগেরবার রাজ্যকমিটি এবং সম্পাদকমণ্ডলীতে থাকলেও এ বার তাঁরই অনুরোধে তাঁকে অব্যাহতি দিয়েছে দল। গত মার্চ মাসে সিপিএম-এর রাজ্য সম্মেলনে একদিন এসেছিলেন। কিন্তু ঘণ্টা দেড়েক পরেই ফিরে যান তিনি। শ্বাস কষ্ট বাড়ায় সিপিএম নেতারাই বাড়ি পাঠিয়ে দেন তাঁকে।
এখন বুদ্ধবাবু পড়তে পারেন না। লিখতে পারেন না। তাঁর ঘনিষ্ঠমহলের মতে, যে লোকটার বই ছিল জীবন তিনিই এখন বইহীন দিন কাটাচ্ছেন। সিপিএম-এর পক্ষ থেকে তাঁর উপর দায়িত্ব পড়েছিল দলীয় দফতরে না আসলেও তিনি যেন একটি দলিল লেখেন। সে দলিলের বিষয় ছিল ‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ।’ দলের মধ্যে যে তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা নিয়ে, তার অবসানের জন্যই এই দলিল দলে গ্রহণ করতে চায় সিপিএম। কিন্তু শুরু করেও থমকে গিয়েছে সেই কাজ।
প্রসঙ্গত, কয়েকমাস আগে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও দেখতে গিয়েছিলেন তাঁকে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলেও রাজি হননি বুদ্ধবাবু। গত ১৮ জুলাই নেলসন ম্যান্ডেলার জন্মশতবর্ষ নিয়ে একটি সেমিনারে বক্তৃতা দিতে কলকাতায় এসেছিলেন সিপিএম পলিটব্যুরোর সদস্য প্রকাশ কারাট। বুদ্ধবাবুর শারীরিক অবস্থার কথা শুনে তিনি তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কারাটের সেই বন্ধু দক্ষিণ ভারতের একটি নামী হাসপাতালের রেটিনা বিশেষজ্ঞ। তাঁকে কলকাতায় এনে দেখাতেও চেষ্টা করেন কারাট। কিন্তু আগ্রহ দেখাননি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী।
বাড়িতে বিশেষ কেউ যান সেটাও তাঁর পছন্দ নয়। একটা সময় চোখের চিকিৎসা করাতে ফিদেল কাস্ত্রোর কিউবায় গিয়েছিলেন বুদ্ধবাবু। সিপিএম-এর কলকাতা জেলার এক নেতার কথায়, ‘বুদ্ধ দা যেভাবে দিন কাটাচ্ছেন তা চোখে দেখা যায় না।’