দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলায় এসে এর আগেও চিটফান্ড, তোলাবাজি, সিন্ডিকেট চক্র নিয়ে চাঁচাছোলা সমালোচনা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। কিন্তু কোথাও যেন একটা লক্ষ্মণ রেখা টেনে রেখেছিলেন। শনিবার সেটাও মুছে দিলেন গেরুয়া শিবিরের প্রধান সেনাপতি। উনিশের ভোটের আগে দড়াম ধাক্কা মারলেন ঠিক সেই জায়গাটিতে, যেখানে ধাক্কা লাগলে টলে যেতে পারে গোটা তৃণমূল পরিবার।
দুর্গাপুরে বিজেপি-র জনসভা ছিল। সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে কুর্তার হাতা গুটিয়ে নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদী তৃণমূলের দুর্নীতির সাতকাহন শোনাতে গিয়ে বললেন, “চিটফান্ড, পেন্টিং, সারদা--- সারে তার একহি দরওয়াজে পে যাতে হ্যায়।”
চিটফান্ড দুর্নীতি নিয়ে তৃণমূলের একাধিক নেতা, মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আগেই অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি সিবিআই দাবি করেছে, চিটফান্ডের টাকা ব্যবহার হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রীর আঁকা ছবি কিনতে। সন্দেহ নেই, সে বিষয়টিকেই এ দিন খুঁচিয়ে তুলতে চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
মোদীর কাছে যেন এটাই শুনতে চাইছিলেন দুর্গাপুর-আসানসোল ও সংলগ্ন অঞ্চলের বিজেপি কর্মী, সমর্থকরা। লড়াই এ বার হোক সেয়ানে সেয়ানে। সরাসরি। কোনও আড়াল নয়। মোদীও যেন তাঁদের মনের কথা আগেই পড়ে ফেলেছিলেন। বললেন, “বাংলায় সিবিআইকে ঢুকতে দেবে না বলেছেন দিদি। আরে দিদি এত ভয় কীসের? এতো ভয় কেন রে!” সেই সঙ্গে বলেন, ইউপিএ জমানায় তিনি যখন গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী, তখনও সিবিআইয়ের অপব্যবহার করে তাঁকে ৯ ঘন্টা বসিয়ে জেরা করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ভয় পাননি। রীতিমতো ছাতি চাপড়ে তিনি বলেন, “সততার সঙ্গে থাকলে তো ভয় পাওয়ার কথাই নয়! আমি তো কখনওই ভয় পাইনি।”
দুর্গাপুরে মোদীর সভাকে নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছিল। কোন মাঠে সভা হবে তা নিয়ে প্রশাসন ও পুলিশ টালবাহানা করেছে বলে অভিযোগ। সেই সঙ্গে আসানসোলের সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয় শুক্রবার রাতেই অভিযোগ করেছিলেন, বিজেপি কর্মীদের বেধড়ক মেরেছে তৃণমূল কর্মীরা। তাদের কয়েকজনকে হাসপাতালেও পাঠাতে হয়েছে। সেই রিপোর্ট এ দিন মঞ্চে ওঠার আগেই পেয়েছেন মোদী।
ফলে দুর্গাপুরে মঞ্চে ওঠার আগে মঞ্চ যেন প্রস্তুত ছিল। হাতে মাইক নেওয়ার পর মুহূর্ত থেকেই আগ্রাসন যেন ঝরে পড়ে মোদীর শরীর থেকে। তিনি বলেন,বাংলার মাটি পবিত্র মাটি। সিপিএমকেও ছাড়েনি। তৃণমূলও পার পাবে না। এদের বিদায় আসন্ন। তাঁর কথায়, “মেরে বাত লিখকে রাখিয়ে, ইনকা যানা ত্যায় হ্যায়।” এও বলেন, "আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, বাংলায় পরিবর্তন হচ্ছে।"
আরও পড়ুন:
মমতা আর আঁচড় কাটছেন না কেন? কেনার লোক নেই তাই! কাঁথির মঞ্চে খোঁচা মুকুলের
বাংলায় রাজনৈতিক হিংসা নিয়ে তৃণমূলের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি দুর্নীতি প্রশ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে আক্রমণ করাকে এ দিন পাখির চোখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, বাংলায় এখন কলেজে ভর্তি হতে গেলেও ট্রিপল টি দিতে হয় ছেলেমেয়েদের। কী সেই ট্রিপল টি? নিজেই ব্যাখ্যা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "ট্রিপল টি হল, তৃণমূল তোলাবাজি ট্যাক্স। সেই ট্যাক্স না দিলে ছেলেমেয়েরা কলেজে ভর্তি হতে পারে না। একই ভাবে স্কুলে চাকরি পায় না চাকরি প্রার্থীরা। বাংলায় সেই জগাই-মাধাইয়ের জমানা তথা সিন্ডিকেট রাজ খতম করতে আমি এখানকার মানুষের পাশে রয়েছি।"
দুর্নীতি প্রশ্নেই তৃণমূলের সাম্প্রতিক ব্রিগেড সমাবেশ নিয়ে খোঁচা দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, কলকাতায় কদিন আগে সবাই এক হয়েছিল। চার বছর আগেও এরা একে অন্যকে জেলে পোরার কথা বলতেন। এদের কারও ভাইয়ের বিরুদ্ধে, কারও ছেলের বিরুদ্ধে, কারও নিজের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা রয়েছে। যারা কালো টাকার কারবারি, যারা চিটফান্ড থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষায় দালালি করে, তারা মোদীকে ভয় পায়।
দুর্গাপুরের আগে এ দিন বনগাঁর ঠাকুরনগরেও সভা করেন প্রধানমন্ত্রী। স্বাভাবিক ভাবেই মোদীর এই দুই সভার পর বিজেপি শিবির যারপরনাই উজ্জীবিত। পরে রাজ্য বিজেপি-র সভাপতি দিলীপ ঘোষ জানান, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হলেই বাংলায় ফের ধারাবাহিক জনসভা করবেন সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।