দ্য ওয়াল ব্যুরো: চারশো বছর ধরে চলে আসা রীতিতে ছেদ পড়ল করোনার জেরে। গোপীবল্লভপুরের রথ এবার টানা হল না। স্থানীয় কাপাসিয়া এলাকায় মাসির বাড়িও গেলেন না জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা। মন্দির প্রাঙ্গণের মধ্যে এবার তৈরি করা হয়েছে মাসির বাড়ি। শুধুমাত্র মন্দিরের সেবাইতরাই রথ টানলেন। সাধারণ মানুষ এবার আর রথ টানতে পারলেন না।
বৈষ্ণবসাধন ক্ষেত্র শ্রীপাট গোপীবল্লভপুরের রথযাত্রার বয়স প্রায় চারশো বছর। জনশ্রুতি অনুযায়ী এই রথযাত্রা উৎসব সুষ্ঠু ভাবে পালনের জন্য প্রতি বছর স্বর্ণমুদ্রা পাঠাতেন মোগল সম্রাট জাহাঙ্গির। এখানে বৈষ্ণবক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠাতা বৃন্দাবনের পরমবৈষ্ণব শ্যামানন্দ গোস্বামী। তাঁর উদ্যোগে আনুমানিক ১৬২০ খ্রিস্টাব্দে গোপীবল্লভপুরে রথযাত্রা উৎসবের সূচনা হয়েছিল। জানা গেছে, সুষ্ঠু ভাবে উৎসব পালনের জন্য মোগল রাজত্বের সুশাসনের প্রার্থনায় সপ্তদশ দশকের গোড়ায় শ্যামানন্দ গোস্বামীকে প্রতি বছর একটি করে স্বর্ণমুদ্রা পাঠাতেন তিনি। শ্যামানন্দের জীবতত্ত্বের ব্যখ্যা শুনে অত্যন্ত অত্যন্ত খুশি হয়ে বৈষ্ণব ক্ষেত্র গোপীবল্লভপুরের বার্ষিক উৎসবের জন্য তিনি টাকা পাঠাতে শুরু করেন।
গোপীবল্লভপুরের আগের নাম ছিল কাশীপুর। সে নাম বদলে গোপীবল্লভপুর নাম রাখেন শ্যামানন্দ স্বয়ং। কৃষ্ণের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। সেই মন্দিরের নাম রাধাগোবিন্দজিউ মন্দির। সপ্তদশ শতক জুড়ে এক উল্লেখযোগ্য বৈষ্ণবক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে গোপীবল্লভপুর। তখন এলাকাটি ওড়িশার ময়ূরভঞ্জের রাজার অধীনে ছিল। শ্যামানন্দের উদ্যোগে এখানে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে নিত্য সেবা শুরু হয়। শুরু হয় বার্ষিক রথ উৎসব। জনশ্রুতি, প্রতি বছর পুরীতে রথ উৎসবে জগন্নাথ দর্শনে দলবল নিয়ে যেতেন শ্যামানন্দ। একবার নীলাচলে যাওয়ার পথে বয়সের ভারে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। তিনি স্বপ্ন দেখেন, জগন্নাথ তাঁকে বলছেন, ভক্তকে দেবতার কাছে আসতে হবে না। দেবতাই ভক্তের কাছে থাকবেন। স্বপ্নাদেশ পেয়ে পরের বছর গোপীবল্লভপুরে নিমকাঠের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করে তিনি রথযাত্রা উৎসবের সূচনা করেন। তারপর থেকে এই রথযাত্রায় অসংখ্য মানুষের ভিড় হয়।
প্রতি বছর এই রথ মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে গোপীবল্লভপুর মূল বাজার হয়ে কাপাসিয়া এলাকায় মাসির বাড়িতে যেত কিন্তু করোনা পরিস্থিতিতে এবার রথ টানার অনুমতি দেয়নি পুলিস-প্রশাসন। তাই এবার মন্দির প্রাঙ্গণেই তৈরি হয়েছে মাসির বাড়ি। সেখানে থাকবে রথ। গোপীবল্লভপুরে বর্তমান মহন্ত কৃষ্ণকেশবানন্দ দেবগোস্বামী বলেন, “এই রথ পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে দ্বিতীয় প্রাচীনতম রথ। সামাজিক দূরত্ব মেনে রথ নিয়ে যাওয়া হবে ঠিক করা হয়েছিল। শুধুমাত্র মন্দিরের সেবকরাই রথকে নিয়ে যেতেন। কিন্তু পুলিস-প্রশাসন অনুমতি না দেওয়ায় মন্দিরের প্রাঙ্গণে মাসির বাড়ি করা হয়েছে। সেখানেই থাকবে রথ।”
গোপীবল্লভপুরের প্রাচীন রথের পাশাপাশি ঝাড়গ্রাম জেলা জুড়ে রাস্তায় কোনও রথ নামেনি এবছর। ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির রথ, লালাগড় রাজবাড়ির রথ এবং বেলপাহাড়িতে প্রতি বছর পুলিশের উদ্যোগে যে রথ বের হয় তাও করোনা পরিস্থিতির জন্য এবছর বন্ধ রাখা হয়েছে।