
শেষ আপডেট: 16 July 2022 09:05
বিশ্বাসঘাতকতা, দুর্নীতিবাজ, নাটকীয়তা, ভণ্ডামি, অযোগ্য, মিথ্যা, গুণ্ডা, গাধা, মাফিয়া, টাউট, ডাইনি ইত্যাদি শব্দগুলি সংসদে অসংসদীয় শব্দের (Dilip Ghosh on Unparliamentary Word) তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই রকম আরও পঞ্চাশটি শব্দকে চিহ্নিত করেছে লোকসভার সচিবালয়, যেগুলি কোনও সদস্য প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করলে স্পিকার চাইলে তা কার্যবিবরণী থেকে বাদ দিতে পারেন। ওই সব শব্দ ব্যবহার না করতে পরামর্শ দিয়েছে সংসদ।
এই নির্দেশিকার পরিপ্রেক্ষিতে কী করবেন খড়্গপুরের বিজেপি সাংসদ তথা দলের সর্ব ভারতীয় সহ-সভাপতি দিলীপ ঘোষ? বেফাঁস মন্তব্য করার জন্য একাধিকবার দল ও জনতার কাঠগড়ায় উঠতে হয়েছে তাঁকে। সংসদেও বারে বারে তিনি বাংলার শাসক দল তৃণমূলকে আক্রমণে বিতর্কিত শব্দ প্রয়োগে সীমা ছাড়িয়েছেন। এছাড়া বাংলার মাঠে-ময়দানের রাজনীতি তো আছেই। তৃণমূলকে ধারালো আক্রমণে দলে তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।
সংসদের নয়া শব্দবিধি নিয়ে কী বলছেন সেই দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)? তাঁর কথায়, "আমি সংসদে সর্বদা রীতি মেনে চলি। আপত্তিজনক শব্দ ব্যবহার করিনি। আগামীদিনেও করব না।"
সেই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, "সংসদের বাইরে তো শব্দগুলি বাতিল হয়নি! সেখানে যাঁর সম্পর্কে যে কথা খাটে তাঁকে তাই বলব। সংসদের বিধিনিষেধের কারণে রাজনৈতিক আক্রমণের ধার কমে যাবে, আমি তা মনে করি না।"
আবার দলের অস্বস্তি বাড়িয়ে তাঁর দাবি, সংসদে অসংসদীয় বলে চিহ্নিত শব্দগুলি বাংলার বিধানসভাতেও বাতিল হওয়া দরকার। অর্থাৎ তাঁর দল বিজেপি রাজ্য বিধানসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবাজ, বিশ্বাসঘাতক ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগ করুক, চান না দিলীপ। তাঁর বক্তব্য, "বিধানসভার বাইরেও সরকারকে চেপে ধরার অনেক জায়গা আছে।"
বিজেপি প্রার্থীকে সমর্থনের ঢল, জনজাতি দ্রৌপদী কি দলিত নারায়ণনকে ছাপিয়ে যেতে পারবেন
বিজেপির বিধায়ক দল এবং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) কথায় কথায় রাজ্যপালের দ্বারস্থ হওয়া বরাবরই দিলীপের না-পসন্দ। অতীতে একাধিকবার বলেছেন, লড়তে হবে রাজপথে। আর আমাদের লড়াই আমাদেরই লড়তে হবে। রাজ্যপাল আমাদের লড়াই লড়বেন না। লক্ষণীয়, এই অভিমতে অবিচল দিলীপ রাজ্য বিজেপির প্রথমসারির একমাত্র নেতা যাঁকে দলের রাজভবনে যাওয়া প্রতিনিধি দলে দেখা যায় না।
এদিন ‘দ্য ওয়াল’-এর সঙ্গে কথা বলার সময় বিরোধীদের নিশানা করতে গিয়ে সংসদের অসংসদীয় শব্দের তালিকাভুক্ত একটি শব্দ বারে বারে ব্যবহার করেছেন দিলীপ। তিনি বলেন, 'এখনকার বিরোধীরা সংসদে ‘নাটক’ করতে যান। সরকারের সঙ্গে পেরে না উঠে সংসদের উঠোনে বসে ধরণা, অনশন করেন। এ সব নাটক নয়তো কী? সংসদ অবস্থান, বিক্ষোভে নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত সমর্থন করে তাঁর বক্তব্য, দিনের পর দিন কি এসব চলতে দেওয়া যায়?'
এরপরই বিতর্ক অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ। তিনি বলেন, "সংসদ সংসদের কাজ করেছে। কিন্তু বাংলার দিদিমণির মুখে লাগাম পরাবে কে? উনি আমাদের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেছেন, কোথাকার কে হরিদাস পাল’। আমাদের সভাপতির নাম নিয়ে ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ করেছেন। জেপি নাড্ডার নাম মুখে না নিয়ে বলেছেন, নাড্ডা ফাড্ডায় এসব কী কথা! উনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চেহারা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। বলেছেন, হোঁদল কুতকুত।" দিলীপের বক্তব্য, "এসব শব্দ কি কেউ কারও সম্পর্কে প্রকাশ্য মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলতে পারেন? উনি আরও অনেক কথা বলেছেন যা বলা কারও সম্পর্কে অনুচিত।"
‘মিস্টার হিটলার, এটা জার্মানি নয়…’ সংসদে ‘শব্দে বেড়ি’ নিয়ে মোদীকে তীব্র আক্রমণ কমল হাসানের
প্রসঙ্গত, গত বছর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রচারে দুই কাণ্ডারি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। স্বভাবতই তৃণমূলের কাণ্ডারি মুখ্যমন্ত্রী মমতার আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যও ছিলেন বিজেপির এই দুই শীর্ষ নেতা। অমিত শাহকে হোঁদল-কুতকুত বলা ছাডাও একটি সভায় তাঁকে রাক্ষসের সঙ্গে তুলনা করেন তৃণমূল নেত্রী (Mamata Banerjee)। আবার একটি সভায় প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে বলেন কিম্ভুত কিমাকার।
দিলীপের এই বক্তব্য নিয়ে একদা নরেন্দ্র মোদী মন্ত্রিসভার সদস্য তথা অধুনা বালিগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক বাবুল সুপ্রিয় বলেন, "দিলীপবাবুর কথার জবাব দিয়ে সময় নষ্ট করার কোনও মানে হয় না।" তৃণমূলের জাতীয় মুখপাত্রের কথায়, "দিলীপবাবু এসব বলতে থাকুন। উনি মুখ খুললেই এন্টারটেইনমেন্ট।"
যদিও বঙ্গ-রাজনীতিতে এই মুহূর্তে বেঁফাস মন্তব্যের জন্য কুখ্যাতদের তালিকায় একেবার শীর্ষে আছেন বিজেপি নেতা দিলীপই। দিন কয়েক আগেই একটি টেলিভিশন চ্যানেলে আপত্তিজনক মন্তব্য করেছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে। গত বছর বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের প্রচারের অন্যতম স্লোগান ছিল, ‘বাংলা নিজের মেয়েকে চায়।’ টিভির আলোচনায় দিলীপ বলেন, "উনি বাংলায় বলেন বাংলার মেয়ে। গোয়ায় গিয়ে বলেন, গোয়ার মেয়ে। বাপ-মায়ের ঠিকানা নেই না কি! যেখানে যা ইচ্ছা বলে দেবেন এটা হয় না কি?"
দিলীপের ওই মন্তব্যের প্রতিবাদের পথে নেমেছে গোটা তৃণমূল পরিবার। দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রধানমন্ত্রীকে ট্যাগ করা টুইটে বলেছেন, 'এই কি বিজেপির রুচি?' মন্ত্রী ব্রাত্য বসুর নেতৃত্বে তৃণমূলের এক প্রতিনিধিদল রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড়ের সঙ্গে দেখা করে দিলীপের বিরুদ্ধে নালিশ ঠুকেছে। দিলীপের গ্রেফতারি দাবি করেছে বাংলার শাসক দল।
বিধানসভার ওই ভোটেই ভাঙা পা নিয়ে প্রচার করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রচার সভায় তিনি ব্যান্ডেজ করা অংশ দেখিয়ে বলেছেন, কীভাবে নন্দীগ্রামে তাঁর উপর হামলার চেষ্টা হয়েছিল। সেই সময় একটি সভায় দিলীপ ঘোষ মন্তব্য করেন, শাড়ি পরে ভাঙা পা দেখাতে যাচ্ছেন কেন? বারমুডা পরলেই পারেন।
আবার জিনিসপত্রের দাম নিয়ে তৃণমূলের সমালোচনার জবাবেও মাত্রা ছাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে দিলীপের বিরুদ্ধে। পুরুলিয়ার একটি সভায় ভাষণে প্রশ্ন তোলেন আলু কী করে ১৫ টাকা থেকে ২৫ টাকা হয়ে গেল? আলু কি ইউক্রেন থেকে আসে? এরপর তাঁর সংযোজন, ছোটবেলায় আমরা কুকুরের পিছনে পেট্রল ঢেলে দিতাম। তৃণমূল নেতাদের ধরে পিছনে একটু পেট্রেল ঢেলে দিন। দেখুন তারা কেমন দৌড় মারবে।
বস্তুত, বিরোধীদের বিরুদ্ধে এমন আক্রমণাত্মক মেজাজ ও বেঁফাস মন্তব্যের জন্যই বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ এখনও বঙ্গ-বিজেপির অন্যতম মুখ, মনে করে রাজনৈতিক মহল এবং দলের একাংশ।
যদিও শুধু রাজনৈতিক বিরোধীদেরই নয়, অন্য ক্ষেত্রেও বেঁফাস মন্তব্য করে বিতর্কে জড়িয়েছেন। যেমন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি শ্লীলতাহানির ঘটনায় মন্তব্য করেছিলেন, "ওঁরা সব নিম্ন স্তরের বেহায়া মেয়ে। ওঁরা ওখানে যায় কেন? নিজেদের মান-সম্মান রক্ষার দায় তো ওদেরই। তার ভয় ডর না করে কেন ওঁরা গায়ে পড়ে যায় ওখানে? তার পর কিছু ঘটলে অন্যদের দোষ দেয়। ওঁরা অত্যন্ত অশালীন।" ওই মন্তব্যের জন্য যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে দিলীপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল করে পড়ুয়ারা। বেঁফাস মন্তব্যের জন্য একাধিক থানায় মামলাও হয়েছে বিজেপির এই বিতর্কিত নেতার বিরুদ্ধে।
তবে, সংসদের শব্দবিধি প্রসঙ্গে দিলীপ এদিন খানিক অবাক করা কথাও বলেছেন। তাঁর মতে, সংসদে বাতিল ঘোষিত শব্দ রাজনীতির অভিধান থেকে বাতিল হলেও আমার আপত্তি নেই। তা করা গেলে বাংলার দিদিমণির মতো কিছু মানুষের মুখে লাগাম পরানো যাবে। দিলীপের দাবি, আমাকে এই তালিকায় ফেলা যাবে না।
অর্জুন কাকে ভোট দেবেন? বিজেপিতে জিতে তৃণমূলে ফেরা সাংসদের রাইসিনা রহস্য