
শেষ আপডেট: 3 May 2023 11:12
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ‘কহো বজরংবালী’। দেখা হলেই বিনয় কাটিয়ারকে এই বলে সম্মোধন করতেন অটল বিহারী বাজপেয়ী। আর এই বজরংবালীদেরই ‘হনুমানের দল’ বলে সুযোগ পেলেই কটাক্ষ করতেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। ঘরোয়া আলোচনায় জ্যোতি বসু বলতেন, বাজেপেয়ী, আদবানীদের দেখে নয়, বিজেপিকে তিনি যে অসভ্য, বর্বর দল বলেন, তা ওই বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আর বজরং দলের (banning announcement of Bajrang dal) কার্যকলাপ দেখে (Modi slammed Congress)। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে কলকাতা সফরে আসা বাজপেয়ীকে একান্তে সে কথা জানিয়ে দেন জ্যোতিবাবু। রাজনৈতিক মতবিরোধ সত্ত্বেও দু’জনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল মধুর।
বিনয় কাটিয়ার কথায় কথায় একবার বলেছিলেন, ‘বাজপেয়ীজি যতবার ‘কহো বজরংবালী’ বলতেন ততবার গর্বে আমার বুক ভরে যেত। আসলে, বাজপেয়ীজি আমাকে উৎসাহ আর গুরুত্ব দিতেই হাল্কাচ্ছলে ওই কথা বলতেন।’
কাটিয়ারের এমন দাবি করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ, তিনি শুধু বজরং দলের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নন, এই সংগঠন তৈরির ভাবনাও তাঁর। আর সেই সংগঠনের নেতৃত্ব দেওয়ার সুবাদেই কাটিয়ার ছিলেন অযোধ্যার দীর্ঘদিনের সাংসদ, রাম মন্দির নির্মাণ আন্দোলনের অন্যতম মুখ এবং উত্তরপ্রদেশে বিজেপি শাখা প্রশাখা বিস্তারের প্রধান কান্ডারি। অন্যদিকে, পল্লবিত হয়েছে পদ্ম শিবিরও। ১৯৮৪-তে লোকসভায় দুটি আসন পাওয়া বিজেপির পাঁচ বছর পর একলাফে ৮৪ সিট প্রাপ্তির পিছনে বড় ভূমিকা ছিল বিশ্ব হিন্দু পরিষদ আর বজরং দলের ভূমিকা। ভোটের ময়দানে ওই দুই সংগঠনই দীর্ঘ সময় বিজেপির জন্য পাইলট কারের কাজ করেছে। সংগঠনহীন বিজেপির হয়ে জনমত তৈরির পাশাপাশি বুথে কর্মী, এমনকী প্রার্থীও জুগিয়েছে। বিজেপিতে, এমনকী মোদীর মন্ত্রিসভায় গেরুয়া বসনধারীদের কতিপয় সরাসরি আরএসএসের প্রচারক, বেশিরভাগেরাই বজরং দলের অভিভাবক বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ‘সেবক’।
সেই বজরং দলকে নিয়ে কংগ্রেসের ঘোষণায় তাই বেজায় চটেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং সক্রিয় রাজনীতি থেকে অনেকটাই দূরে সরে যাওয়া বিনয় কাটিয়ার। ৬৮ বছর বয়সি নেতা হুঙ্কার দিয়েছেন, বজরং দলকে নিষিদ্ধ করলে কংগ্রসকে নিশ্চিহ্ন করে ছাড়ব।
ওদিকে, কর্নাটক বিধানসভার ভোটে দ্বিতীয় দফার প্রচারে নেমে প্রধানমন্ত্রী মোদী অভিযোগ তুলেছেন, ‘কংগ্রেস ভগবান রামকে বহু বছর তালাবন্ধ করে রেখেছিল। এবার ভক্ত বজরংবলীকেও রেহাই দেবে না। হনুমান ভগবানকেও তারা তালা মেরে আটকে রাখতে চায়।’
আসলে মঙ্গলবার নির্বাচনী ইস্তাহারে কংগ্রেস জানিয়েছে কর্নাটকে ক্ষমতায় এলে দল হিন্দুত্ববাদী জঙ্গি সংগঠন বজরং দল এবং কট্টর ইসলামপন্থী সংস্থা পিএফআই-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করবে। এরপরই কংগ্রেসের বিরুদ্ধে রে রে করে নেমে পড়েছে গোটা হিন্দুত্ববাদী শিবির।
বজরংবলী আসলে হনুমান, ভারতের অসংখ্য মানুষ যে প্রাণীটিকে ভগবান মানে। আর হিন্দুদের আবেগ স্পর্শ করতেই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের যুব সংগঠনের নাম বজরং দল রাখা দরকার, প্রস্তাব দিয়েছিলেন কাটিয়ার।

১৯৮৪-তে জন্ম নেওয়া বজরং দলের প্রধান লক্ষ্য হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছিল ভারতীয় সংস্কৃতির বিকাশ, অযোধ্যায় বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণ এবং অহিন্দুদের অনাচারের বিরুদ্ধে লড়াই। বিজেপির জন্মের চার বছরের মাথায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের এই যুব শাখার জন্ম পদ্মশিবিরের ভোটের বাক্স ভরাতে এবং সরকারি ক্ষমতা দখলের পথ যে অনেকটা প্রশস্ত করেছিল তা হিন্দুত্ববাদী শিবিরের কারও অজানা নয়। মোদীও জানেন, গুজরাতে রেকর্ড সময় মুখ্যমন্ত্রী থাকা থেকে দু-দফায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পিছনে বজরং দলের পরোক্ষ ভূমিকার কথা তাঁকেও মনে রাখতে হয়। তার উপর কর্নাটকের ভোট মিটতেই লোকসভা ভোটের ঢাকে কাঠি পডবে। তার আগে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগড় এবং তেলেঙ্গানা বিধানসভার নির্বাচন তো আছেই। মেরুকরণে বজরং দল অন্যতম বলভরসা বিজেপির।
তাই আইন যাই বলুক, বজরং দলকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণায় প্রধানমন্ত্রী চুপ করে থাকেননি। আইন বাঁচাতে বজরং দল নামটি মুখে আনেননি বটে, বজরংবলীকে কংগ্রেস গৃহবন্দি করতে চায় বলে অভিযোগ তুলে আসলে হাত চিহ্নের পার্টির ইস্তাহারের ঘোষণাকেই নিশানা করেছেন মোদী, মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
শুধু নিষিদ্ধ ঘোষণাই নয়, গেরুয়া শিবিরের চটে যাওয়ার কারণ কংগ্রেস ইসলামিক সংগঠন পিএফআইয়ের সঙ্গে এক বন্ধনীতে রেখেছে হিন্দুত্ববাদী বজরং দলকে। যদিও এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার কথা নতুন নয়। ২০০৮ সালে তৎকালীন ইউপিএ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শিবরাজ পাতিল এই সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার পথে অগ্রসর হয়েছিলেন। রাজ্যগুলির কাছে বজরং দলের বিরুদ্ধে থাকা মামলার খতিয়ান চেয়ে পাঠান তিনি। কিন্তু কংগ্রেসের অভ্যন্তরে একদল হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে শিবরাজকে থামান।
যদিও দেশ জুড়ে অসংখ্য হিংসাত্মক ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগ আছে এই সংগঠনের বিরুদ্ধে। নাম জড়ায় গুজরাত দাঙ্গাতেও। এমনকী কর্নাটকের বর্তমান বিজেপি সরকারও বজরং দলের বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে। আরও বেশ কিছু রাজ্যে সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনায় নাম জড়িয়েছে বজরং দলের।
বজরং দল নিয়ে কংগ্রেসের ঘোষণাকে হাতিয়ার করে বিজেপি হিন্দু ভোটকে জোটবদ্ধ করতে বদ্ধপরিকর কর্নাটকে। যদিও কংগ্রেস এবার ভারসাম্য রক্ষা করে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। বজরং দলের মতোই দেশের একাধিক রাজ্যে নাশকতামূলক কাজকর্মে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে ইসলামিক সংগঠন পিএফআইয়ের বিরুদ্ধে। কংগ্রেস দুই সংগঠনকেই নিষিদ্ধ করার কথা জানিয়েছে। এখন দেখার কংগ্রেসের ঘোষণার কী প্রতিফলন ঘটে ভোটের বাক্সে।
কালীঘাট থেকে টাকা ভর্তি বাস এসকর্ট করেছে পুলিশ! শুভেন্দুর টুইট নিয়ে মামলা বিনীতের